প্রচ্ছদ শেষ পাতা

প্রমাণ মেলায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

১২ কোম্পানির শেয়ারে কারসাজি

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: পুঁজিবাজারে নিজেদের অর্থ নিরাপদে রাখতে কারসাজির প্রমাণ পাওয়া বিভিন্ন কোম্পানি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন বিনিয়োগকারীরা। গত সপ্তাহজুড়ে এসব কোম্পানিতে ক্রেতার খরা লক্ষ করা গেছে। প্রতিদিনই সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেনে ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতার সংখ্যা ছিল বেশি, যার জের ধরে প্রতিনিয়ত এসব কোম্পানির শেয়ারের দর কমছে। প্রতিদিনই দর হ্রাসের তালিকায় উঠে এসেছে এসব কোম্পানির নাম।
এরই ধারাবাহিকতায় সাপ্তাহিক দর হ্রাস পাওয়া কোম্পানির তালিকায় সম্প্রতি কারসাজির প্রমাণ পাওয়া পাঁচ প্রতিষ্ঠানের নাম দেখা গেছে। এগুলো হচ্ছে মুন্নু সিরামিক, মুন্নু জুট স্টাফলার্স, সায়হাম কটন, আলহাজ্ব টেক্সটাইল ও সায়হাম টেক্সটাইল। সপ্তাহের ব্যবধানে এসব কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে ১৬ থেকে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, সম্প্রতি শেয়ার নিয়ে কারসাজি হচ্ছে, এমন কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর কমেছে তালিকাভুক্ত মুন্নু সিরামিকের শেয়ারে। গত এক সপ্তাহে এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমেছে প্রায় ৩১ শতাংশ। এ সময়ের মধ্যে প্রতিটি শেয়ারদর ২০৯ টাকা থেকে ১৪৫ টাকায় নেমে এসেছে। সপ্তাহ শেষে এই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হয়েছে দর হ্রাসের শীর্ষ তালিকায়। এর পরের অবস্থানে থাকা আলহাজ্ব টেক্সটাইলের শেয়ারদর কমেছে ২৫ দশমিক ১১ শতাংশ। সপ্তাহের ব্যবধানে ৬৮ টাকা থেকে ৫১ টাকায় নেমেছে।
একইভাবে মুন্নু জুটের শেয়ারদর কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। আর সায়হাম কটনের শেয়ারদর কমেছে ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। এই তালিকায় থাকা অপর প্রতিষ্ঠান সায়হাম টেক্সটাইলের শেয়ারদর কমেছে ১৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জেএমআই সিরিঞ্জের শেয়ারদর ২৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, কে অ্যান্ড কিউয়ের ১৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ, জেমিনি সী ফুডের ১৬ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ, স্টাইলক্রাফটের ১৬ শতাংশ এবং ওয়াটা কেমিক্যালসের শেয়ারদর কমে ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১২ কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্ত কমিটি। ওই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কোম্পানিগুলো হচ্ছে মুন্নু সিরামিকস, মুন্নু জুট স্টাফলার্স, ভিএফএস থ্রেড ডায়িং, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, এসএস স্টিল, ইনটেক লি., সায়হাম টেক্সটাইলস, সায়হাম কটন মিলস, রূপালি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, আইসিবি ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক।
সম্প্রতি তদন্ত কমিটির তদন্তে ওই ১২টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে বিভিন্ন অনিয়মের খবর উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে আগেই মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রাপ্তির ভিত্তিতে লেনদেন, বাজার কারসাজি, সিরিজ অব ট্রেডিং, আচরণবিধি লঙ্ঘন, অতিরিক্ত ঋণ প্রদান, অটো ক্লাইন্ট ট্রেড, আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়ম, শর্ট সেলিং ও সার্কুলার ট্রেডিং। এসবের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও কর্মরত ব্যক্তিরা সিকিউরিটিজ আইন ও বিধিমালা পরিপালনে ব্যত্যয় ঘটিয়েছে, যার জের ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমতে শুরু করেছে।
বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা বলেন, যেসব কোম্পানির শেয়ার নিয়ে বিএসইসি কারসাজির প্রমাণ পেয়েছে এর বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারই অনেক আগে থেকে অতিমূল্যায়িত রয়েছে। এসব কোম্পানির শেয়ারদরের সঙ্গে আর্থিক অবস্থা কিংবা লভ্যাংশ দেওয়ার কোনো মিল নেই। তারা বলেন, কিছু অসাধুচক্র এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অতিমূল্যায়িত করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিপদে ফেলেছে। তাদের উচিত শাস্তি হওয়া দরকার।
এ প্রসঙ্গে ডিবিএ’র সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, বাজারের যে কোনো পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা জরুরি। কোনো শেয়ার অতিমূল্যায়িত হলে অবশ্যই তাদের ওই কোম্পানি থেকে সরে আসা উচিত। অন্যদিকে যারা কারসাজি করছে, প্রমাণ সাপেক্ষে তারও বিচার হওয়া দরকার।
একই প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেয়ার নিয়ে কারসাজির প্রমাণ পাওয়া একটি কোম্পানির সচিব বলেন, কোনো শেয়ারে কারসাজি পেলে সবাই ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন, এটা ঠিক নয়। যদি কোনো কারণে কোম্পানির কেউ জড়িত থাকে, সেটা ভিন্ন ইস্যু। শেয়ার নিয়ে কারসাজি করে পুঁজিবাজারের প্রত্যারক চক্র। এখানে কোম্পানির কোনো হাত থাকে না।

সর্বশেষ..