কৃষি কৃষ্টি

প্রযুক্তিচর্চার বিকাশে অধিক মাছ চাষের সম্ভাবনা

মাছ চাষের সম্ভাবনা ও সমস্যা নিয়ে আজকের আয়োজন

বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পুকুর উন্নয়ন ও আইন সংশোধন, মৎস্য সংরক্ষণ ও প্রতিপালন আইনের সংশোধন, এর বাস্তবায়ন, গবেষণা প্রভৃতি আশা জাগানিয়া বিষয়। মাছ জাতীয় সম্পদ এ উপলব্ধি প্রাকৃতিক পরিবেশে মাছের ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যায় উৎসাহ বাড়াচ্ছে এবং পোনা অবমুক্ত করে বৈজ্ঞানিক শর্ত পালনে উদ্বুদ্ধ করছে। বদ্ধ ও চাষযোগ্য জলাশয় থেকে অধিক হারে মাছ উৎপাদনে প্রযুক্তিচর্চার বিকাশ ঘটছে। এ সবকিছুই মৎস্য চাষ সম্ভাবনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উৎপাদন সম্ভাবনা নিয়ে আরও কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো:

#     জলাশয়ের বিস্তৃতি, উপযোগিতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর মাছের উৎপাদন নির্ভর করে। বাংলাদেশে নদ-নদী, প্লাবনভূমি, বিল, হ্রদ প্রভৃতি জলাশয় প্রাকৃতিক মাছের অফুরন্ত বৈচিত্র্যের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখেছে। এছাড়া পুকুর-দিঘি, বাঁওড়, ডোবা-নালা প্রভৃতিতেও মাছ উৎপাদনের বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চল ও বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক অর্থনৈতিক এলাকায়ও মাছ চাষ করা যায়

#     জীববৈচিত্র্যে জলজসম্পদকে সমৃদ্ধ করেছে মাছ। মিঠাপানিতে রয়েছে ২৬০টির বেশি স্থানীয় মাছ। সামুদ্রিক মাছের প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৫০০। এছাড়া উভয় বৈশিষ্ট্যের পানিতে রয়েছে চিংড়ি, কচ্ছপ, শামুক-ঝিনুকসহ মূল্যবান মৎস্যসম্পদ। মৎস্য ও মৎস্যসম্পদের যুগপৎ ব্যবস্থাপনা, চাষ ও উন্নয়নের মাধ্যমে জলজসম্পদের অফুরন্ত সম্ভাবনা অর্থবহ করা যায়

#     বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জলাশয় ও নানা প্রজাতির মৎস্য গবেষণার ধারাবাহিকতায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সম্প্রসারণ-সম্ভাবনাকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। ইলিশ মাছের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, খাঁচা অথবা পেন পদ্ধতির মাছ চাষ, পোনা অবমুক্তকরণ, অভয়াশ্রম প্রভৃতি গবেষণা ও কার্যক্রম উম্মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য বৃদ্ধির সম্ভাবনার পথ সুগম করেছে। এছাড়া মাছ, হাঁস ও মুরগির সমন্বিত মিশ্র চাষ, ধান ও মাছের চাষ, রাজপুঁটি ও তেলাপিয়ার চাষ প্রভৃতি বদ্ধ জলাশয়ের সদ্ব্যবহার ও অধিক মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনাকে আরও বেগবান করেছে

#     উম্মুক্ত জলাশয় অথবা বিল ব্যবস্থাপনা এখন সরকারি নিয়ন্ত্রণে করা হচ্ছে। অতীতে উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় জলাশয়ের মৌসুমভিত্তিক ইজারা প্রথা প্রচলিত ছিল। এ প্রথায় বিত্তবান ও সুবিধাভোগীরাই লাভবান হতেন। এতে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা ওই সম্পদ থেকে বঞ্চিত থাকতেন। ফলে সম্পদের ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে অব্যবস্থাপনাই প্রাধান্য পেয়েছে, উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তবে বর্তমানে উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া নেওয়ায় দরিদ্র মৎস্যজীবীদের দীর্ঘমেয়াদি ইজারা বন্দোবস্ত দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের প্রশিক্ষিত করা, সঞ্চয় বৃদ্ধি, মাছ উৎপাদনে সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনায় আন্তরিকতা চোখে পড়ছে। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করছে এসব উদ্যোগ

#     মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারি প্রচেষ্টার সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের ফলে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মৎস্য চাষ ও ব্যবস্থাপনায় অংশ নিচ্ছে।

ক্ষুদ্র মাছচাষিদের সমস্যা

এক বা একাধিক পুকুরে মাছ চাষ করেন এমন মাছচাষিকে ক্ষুদ্র মাছচাষি বলা হয়ে থাকে। তাদের উৎপাদিত মাছই সামগ্রিক চাষকৃত মাছের সিংহভাগ পূরণ করে থাকে।

ক্ষুদ্র চাষিদের অনেকে ইজারা বা বর্গা ভিত্তিতে মালিকের পুকুরে মাছ চাষ করেন। এমন চুক্তিভিত্তিতে মালিকপক্ষ ক্ষতির দায় নেয় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর দায় ক্ষুদ্র চাষিদেরই। ফলে অনেক সময় এমন চাষিরা পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। আবার উৎপাদন ভালো হলে অথবা কয়েক বছরের চাষ কার্যক্রমে পুকুর পূর্ণ উৎপাদনশীলতায় পৌঁছালে অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে চাষিকে পুকুরের দখল থেকে বিতাড়িত করে।

ক্ষুদ্র চাষিদের পুঁজি কম বলে মাছ চাষের উপকরণের জন্য সহজ শর্তে ঋণ লাভের সুযোগও কম। তাছাড়া ব্যাংকের নানা নিয়মের জটিলতার কারণে সেখানেও যেতে চান না চাষিরা। এসব কারণে তারা উৎপাদন ও আয়ের দিক থেকে অনেক সময় ক্ষতির সম্মুখীন হন। এছাড়া দেশে ছোট-বড় অনেক হ্যাচারি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় হ্যাচারি উৎপাদক ছোট চাষিরা প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। ক্ষুদ্র উৎপাদকের পুঁজি ও আয়োজন তুলনামূলক কম হওয়ায় তারা হ্যাচারির পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন না। বড় ও ক্ষুদ্র হ্যাচারির উৎপাদকের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ায় ক্ষুদ্র উৎপাদকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

ক্ষুদ্র চাষিদের উৎপাদিত মাছ বিক্রিতে বাজারজাতকরণেও সমস্যায় পড়তে হয়। হাটবাজারে তারা সরাসরি মাছ বিক্রির সুযোগ পান না। হাটবাজার ইজারা প্রথা থাকায় উৎপাদিত মাছ ইজারাদারদের কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। পুকুর-দিঘির মালিকরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পুকুরে মাছ চাষে আগ্রহী হন না। চাষের নিয়ম অনুযায়ী চর্চা করেন না। এ ধরনের নানা সমস্যার কারণে মাছ উৎপাদন বাড়ছে না, সম্পদের অপচয় হচ্ছে। ক্ষুদ্র চাষিদের এসব সমস্যা সমাধানে সরকার নানা উদ্যোগ নিতে পারে এবং মাছের উৎপাদন বাড়াতে পারে।

জলাশয়, পুকুর দিঘিকেন্দ্রিক সমস্যা

মাছের উৎপাদন বাড়ানো বা চাষের অনেক সমস্যা রয়েছে। সমস্যাগুলোর কিছু মানুষের সৃষ্টি ও কিছু প্রাকৃতিক। এর মধ্যে জলাশয় ও পুকুর-দিঘিকেন্দ্রিক সমস্যা সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন

জলাশয়কেন্দ্র্রিক সমস্যা

প্রাকৃতিক জলাশয়কেন্দ্রিক সমস্যা মূলত নদ-নদীসহ অন্য উম্মুক্তক্ত উৎসকে বোঝায়

#     পলিপ্রবাহ ও পলি জমাটের ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়

#     নদীতে কোনো কারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, অল্প সময়ের জন্য ঘের তৈরি করা, কোনো স্থায়ী বাঁধের সাহায্যে মাছ ধরার পদ্ধতি অবলম্বন করে মাছের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো প্রভৃতি সমস্যার কারণে মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়, মাছের উৎপাদন কমে যায়

#     বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, সেচ বাঁধ বা নদী অভ্যন্তরে অন্য যান্ত্রিক বা প্রকৌশল অবকাঠামো গঠন, স্থাপন প্রভৃতি নদীর গতির পরিবর্তন ঘটায়। ফলে মাছের ভ্রমণ, প্রজনন ক্ষেত্র ও স্বভাবে পরিবর্তন আসে। উৎপাদন ব্যাহত হয়

#     নদীর প্রবাহ পরিবর্তনের ফলে স্রোতের গতি শ্লথ হয়ে মাছের ভ্রমণ ও প্রজননে বিঘ্ন ঘটে। ফলে মাছের উৎপাদন ব্যাহত হয়

#     নদ-নদী বা উম্মুক্ত উৎস থেকে অমৌসুমে (অফ সিজন) মাছ শিকার ও আহরণের ফলে উৎপাদন কমে যায়

#     জলাশয় থেকে ছোট কিংবা ডিমওয়ালা মাছ ধরার ওপর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও এর কোনো কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যায় না। এতে শুধু উৎপাদনের ওপরই প্রভাব পড়ে না, প্রজাতিও বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকে

#     কল-কারখানার অব্যবহƒত পদার্থ ও বর্জ্য পানিতে মিশে মাছের বাস অনুপযোগী করে তোলে। এছাড়া রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মাছের ডিম ও পোনার ক্ষতি হয়

#     কৃষিকাজের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত সেচের ফলে নদীর পানিধারণ স্তর কমে মাছের বিচরণ ক্ষেত্রের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়।

পুকুর-দিঘিকেন্দ্রিক সমস্যা

প্রাকৃতিক জলাশয়কেন্দ্রিক সমস্যাগুলোর মতো পুকুর-দিঘিতেও মাছ চাষের কিছু সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে

#     মাছ চাষের জ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাব। ফলে মাছচাষ হলেও উৎপাদন আশানুরূপ হয় না

#     মাছ চাষের উপকরণ যেমন পোনা, সার, ওষুধ, মাছ ধরার সরঞ্জাম, পুঁজি প্রভৃতির ঘাটতি রয়েছে

#     সরকারি খাস ও পতিত পুকুর-দিঘির সদ্ব্যবহারে ঘাটতি রয়েছে।

মানবসৃষ্ট সমস্যা

মাছের উৎপাদন হ্রাসের জন্য শুধু প্রাকৃতিক জলাশয় ও পুকুর-দিঘিকেন্দ্রিক সমস্যাই দায়ী নয়। মানবসৃষ্ট কিছু সমস্যার জন্যও মাছের উৎপাদন হ্রাস বা ব্যাহত হচ্ছে।

মানবসৃষ্ট সমস্যার মধ্যে প্রথমে ডিমওয়ালা মাছ ও মাছের পোনার কথায় আসা যাক। প্রায় সারা বছরই পোনা মাছ বা ডিমওয়ালা মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করেন অনেক ব্যবসায়ী। তাছাড়া জলাশয় সেচে মাছ ধরাও মানুষের সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এভাবে মাছ ধরার কারণে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

মাছ শিকারের নানা পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে নদীতে বাঁধ দেওয়া, ডালপালা স্তূপ করে মাছের যাওয়ার পথ বন্ধ করা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ আকারের জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করা হয়। এসব পদ্ধতি অবলম্বনের ফলে মাছের পোনা ও প্রজনন উপযোগী মাছ ধ্বংস হচ্ছে। এসব কারণে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

শুধু তা-ই নয়, মানুষ একক বা যৌথভাবে কিছু সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে মাছ চাষ বা উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। যেমন, ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরে পুকুরে বিষ দেওয়া বা মাছ চুরি করে নেওয়া প্রভৃতি সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এ কারণে অনেকেই মাছ চাষ করতে আগ্রহী নন; এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..