মত-বিশ্লেষণ

প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে শিশুদের রক্ষা করবে মাঠের খেলাধুলা

মাসুমা রুমা: বিকাল হলেই মাঠভর্তি শিশুদের কোলাহল চিরচেনা এই দৃশ্য যেন ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। শিশুরা এখন মাঠে যায় না, যদিও এর পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মা-বাবা সন্তানদের এখন আর আগের মতো সময় দিতে চান না। তারা উভয়েই কর্মব্যস্ত জীবনযাপন করেন। অনুতাপের বিষয়, মা-বাবার সব কর্মব্যস্ততা সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য হলেও বাস্তবতার চাপে সেই সন্তানের জন্যই তাদের কোনো সময় নেই। ফলে শিশুরা ক্রমেই একাকী হয়ে পড়ছে। এই সুযোগে প্রযুক্তি হয়ে যাচ্ছে তাদের পরম বন্ধু। শৈশবে শিশুদের ভালো-মন্দ বোধ যেহেতু থাকে না, তাই প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব তাদের ওপর ক্রমাগত পড়তে থাকলেও তারা তা অনুভব করতে পারে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মব্যস্ত মা-বাবার অসচেতনতাও এ জন্য দায়ী। প্রযুক্তি আসক্ত এখনকার শিশুরা ভুলে গেছে শৈশব কী, শৈশবের নির্মল আনন্দ কাকে বলে, প্রকৃতির শিক্ষাই বা কী। যদিও তাদের এমন আসক্তির পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাব। ঢাকা শহরসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোয় খেলার মাঠ যতটুকু আছে, সেটুকুকেই সজীব ও সতেজ রাখা জরুরি। প্রয়োজনে শিশুদের কল্যাণ ও বিকাশে প্রয়োজনীয় খেলার মাঠের জন্য অভিভাবকদের আন্দোলন করতে হবে। কারণ শিশুর সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, যা জাতিকে অন্ধকারে ধাবিত করে ক্রমেই।
বর্তমান শিশুদের সিংহভাগই প্রযুক্তি দ্বারা আসক্ত। তারা ফোন হাতে না দিলে খেতে চায় না। কম্পিউটারে গেমস খেলতে না দিলে কান্না করে। তারা অন্য শিশুদের সঙ্গে মেশার আগ্রহ প্রকাশ করে না। আমাদের বর্তমান সমাজিক অবস্থা ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। নিরাপত্তার অভাব ভীষণভাবে চারপাশকে যেন গ্রাস করে ফেলছে। আজকাল পত্রিকা খুললেই প্রকাশিত খবরগুলো রীতিমতো ভাবিয়ে তোলার মতো। সমাজের মানুষের সচেতনতা, নৈতিকতা চর্চার পাশাপাশি সরকারের যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন এবং এর কঠোর বাস্তবায়নই পারে কেবল শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ সমাজ থেকে সব অন্যায়-অনাচার দূর করতে।
যদি এমন একটি দৃশ্য কল্পনা করা যেত! প্রতিটি গ্রাম, শহরের প্রতিটি মহল্লায় শিশুদের খেলার মাঠ আছে। শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। বিকাল হলেই খেলার মাঠে শিশুদের আনাগোনা। তাদের হাসি-আনন্দে প্রতিটি খেলার মাঠ হয়ে উঠছে একেকটি শিশু-স্বর্গ। এক শিশু অন্য শিশুর সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশ ঘটছে। সব ভেদাভেদ ঘুচে যাচ্ছে মুহূর্তেই। শিশুদের ভেতর জানার আগ্রহ বাড়ছে। প্রকৃতির সঙ্গে গড়ে উঠছে সখ্য। ফরাসি দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী জঁ-জাক রুশোর শিক্ষানীতির ওপর লিখিত এমিল বইটিতে এমিল নামের একটি বালকের বেড়ে ওঠার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। রুশো তাকে শহরের বাইরে গ্রামাঞ্চলে নিয়ে যান, যে শহরে মানুষ শুধু কায়মনে খারাপ অভ্যাসগুলোই আয়ত্তে আনে। রুসো শিশুটিকে প্রকৃতির শিক্ষা দিতে সব ছেড়ে দূরে চলে গেছেন। তার মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্যই হলো নিষ্ঠাবান হিসেবে বাঁচতে শেখা, নিষ্ঠাবান হওয়া।
একটি শিশুর জন্ম থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক পর্যন্ত রুশোর শিক্ষানীতি হয়তো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, তবে আমরা চাইলেই কিছু বিষয় অনুসরণ করে শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশে সহায়তা করতে পারি। একটি নিরাপদ শৈশবের ভেতর দিয়ে নিশ্চিত করা যায় একেকটি শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। শিশুদের পরিপূর্ণ এবং সুস্থ বিকাশের লক্ষ্যে তাই তাদের হাতে প্রযুক্তি এমন এক সময়ে আশা দরকার যখন তারা নিজেরাই বুঝবে ভালো-মন্দের ফারাক, যদিও বর্তমানে সময়ের প্রেক্ষাপটে তা খুব কঠিন।
তবে এতকিছুর মধ্যেও আশার কথা হলো, বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই শিশুর মানসিক বিকাশে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ২০২১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিশুদের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এসব উদ্যোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাতীয় শিশু নীতি ২০১১, শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের সমন্বিত নীতি ২০১৩, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং নীতিমালা ২০১৬ (খসড়া), বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়টি উপলব্ধি করে সরকার বিভিন্নভাবে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করছে। স্কুল পর্যায়ে প্রতি বছর বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন যার বড় উদাহরণ। এছাড়া সারা দেশে খেলাধুলার
প্রসার ঘটাতে সরকার প্রতিটি জেলা, উপজেলা
পর্যায়ে স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছে। খেলাধুলার মাধ্যমে যাতে কোমলমতি শিশু তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটাতে পারে সেটাই সরকারের উদ্দেশ্য।
প্রযুক্তি নয়, খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর বিকাশ নিশ্চিত হোক এটা প্রতিটি সচেতন মানুষের প্রত্যাশা। আর এখনই উপযুক্ত সময় প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার। এক্ষেত্রে আমরা যত বেশি সময়ক্ষেপণ করব শিশুর শৈশব তত বেশি হুমকিতে পড়বে। সুতরাং শিশুর আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। খেলাধুলাই পারে শিশুদের প্রযুক্তির ছোবল থেকে রক্ষা করতে।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..