প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে

বাংলাদেশে হিজড়াদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। রাস্তায় বের হলেই এদের অপকর্মগুলো চোখে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত পার পায় না তাদের হাত থেকে। দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থান ব্রিজ মোড়,  বাসস্ট্যান্ডে পথচারীদের আটকিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে আদায় করা হয় টাকা। টাকা না দিলে চলে অশালীন অঙ্গভঙ্গি আর অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ। অনেকে আত্মসম্মানের ভয়ে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়। চলার পথে বা পাবলিক বাসে তৃতীয় লিঙ্গের কাউকে দেখলে অনেকে আঁতকে ওঠেন। কেউ ভয় পান। কেউবা আবার বিরক্তি প্রকাশ করেন। ঝামেলা এড়াতে অনেকে তাঁদের চটজলদি টাকা দিয়ে কেটে পড়েন। টাকা দেয়া-না দেয়া নিয়ে তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনের সঙ্গে কারও কারও রীতিমতো ঝগড়াবিবাদও লেগে যায়। এখন হিজড়াদের এই চাঁদাবাজি বা অসভ্য আচরণের জন্য শুধু হিজড়াদের দায়ী করাটাও যৌক্তিক নয়। পৃথক লিঙ্গীয় পরিচয়ের কারণে হিজড়ারা মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। পরিবারের কাছে তারা কোনো সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজ পরিবার তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাছাড়া পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি পারিবারিক সম্পত্তির ওপর তাদের কোনো অংশীদারিত্ব দেয়া হয় না। সাধারণত সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ধারণ বা সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারার ক্ষেত্রে দেশে ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন অনুসরণ করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে দেশের প্রধান দুটি ধর্মের কোনোটাতেই হিজড়াদের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা তাদের বঞ্চিত করছে। যার ফলে বাধ্য হয়েই হিজড়ারা এমন পথ বেছে নিচ্ছে। সরকার বিভিন্ন সময় যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে এসব তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে সরকার, এনজিওসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছে, আলোচনা করা হয়েছে। কীভাবে হিজড়াদের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করা যায়, তা নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্ত এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

আপনি বাংলাদেশের পার্শ^বর্তী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পারবেন, তারা কীভাবে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে কাজ করছে। ইতিবাচক উদাহরণের ক্ষেত্রে নাম আসে ভারতের কেরালার। বছর তিন আগে এখানে ‘সহজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেখানে শৈশবে লেখাপড়ার সুযোগ পাননি এমন তৃতীয় লিঙ্গের বয়স্ক মানুষ লেখাপড়া শিখছেন। পাশাপাশি তাদের কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। ট্রান্সজেন্ডার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড আছে কলকাতায়। কলকাতা নগর পুলিশের স্বেচ্ছাসেবক ফোর্সে নিয়োগ দেয়ার আদেশও রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে। মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য বোর্ড গঠন করে চালু করা হয়েছে হেল্পলাইন। তাছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারি চাকরিতে এ তৃতীয় লিঙ্গভুক্তদের আলাদা কোটারও ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা রয়েছে ভারতের শীর্ষ আদালতের পক্ষ থেকে। বাদ যায় না পাকিস্তানও। হিজড়া বা ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা বোর্ড আছে সেখানেও। তাহলে বাংলাদেশে কেন পারছে না।  প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দিলে এসব তৃতীয় লিঙ্গের মানুষই আমাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে।

প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য। তৃতীয় লিঙ্গের এই জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন। প্রয়োজনে তৃতীয় লিঙ্গের এসব জনগোষ্ঠীকে মূল ধারায় আনতে সরকারিভাবে পদক্ষেপ নিন। এতে একদিকে সাধারণ মানুষ যেমন রেহাই পাবে, তারা ফিরে পাবে সুস্থ-সুন্দর স্বাভাবিক জীবন।

ইমরান হোসাইন

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯১১৯  জন  

সর্বশেষ..