মত-বিশ্লেষণ

প্রসঙ্গ: এনসিসি ব্যাংকের এজিএম

অধ্যাপক কাজী মুহাম্মদ মাইন উদ্দীন: ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সেনা মালঞ্চ হল কক্ষে গত ৩০ জুলাই শেষ হয় এনসিসি ব্যাংকের এজিএম। ব্যাংক ২০১৮ সালে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য পাঁচ শতাংশ বোনাস ও পাঁচ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করেছে। সকাল ১১টায় এজিএম শুরু হয়ে ছয়টি অ্যাজেন্ডা পঠন ও চেয়ারম্যানের বক্তব্য প্রদানের মধ্যে এজিএম সীমাবদ্ধ থাকে। শেয়ারহোল্ডারদের কাউকে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এনসিসি ব্যাংক পুঁজিবাজারে ‘এ’ ক্যাটেগরিভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান।
ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন দুই হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ৮৮৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে ব্যাংকের মোট আয় দুই হাজার ২৪২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, টোটাল ব্যয় এক হাজার ৬২১ কোটি ১২ লাখ টাকা, কর-পূর্ববর্তী আয় ৩৪৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা আর কর-পরবর্তী মুনাফা ১৮১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এছাড়া ডিস্ট্রিবিউশন প্রফিট ১১২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দুই টাকা ছয় পয়সা। ব্যাংকটির শেয়ারসংখ্যা ৮৮ কোটি ৩২ লাখ ১৮ হাজার তিনটি। আর মোট শেয়ারহোল্ডার ৪৫ হাজার ৯২৪ জন। এর মধ্যে পরিচালনা বোর্ড সদস্যদের কাছে ২৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এই হিসাবে বোর্ডের কাছে ২৪ কোটি ৫৩ লাখ ৬১ হাজার ৪০১টি শেয়ার আছে। বাকি সমুদয় শেয়ার সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কাছে রয়েছে।
উপরোক্ত বর্ণনা অনুসারে এনসিসি ব্যাংকের সার্বিক অবস্থা সন্তোষজনক। ব্যাংকটি ২০০০ সালে পুঁজিবাজারে প্রবেশ করে। ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৮৫ সাল। এ সময় প্রতিষ্ঠানটি ছিল একটি ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি। তখন এর নাম ছিল ন্যাশনাল ক্রেডিট লিমিটেড (এনসিএল)। সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করায় বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমতি প্রদান করে। শুরুকালীন এর পরিশোধিত মূলধন ছিল ৩৯ কোটি টাকা। ক্রমান্বয়ে ব্যাংকটি বহুদূর এগিয়ে আসছে সততা, মেধাবী কর্মকর্তা নিয়োগ, অভিজ্ঞ ও সুদক্ষ নেতৃত্বের কারণে। কিন্তু চলতি বছরের ৩০ জুলাই এজিএম পর্যালোচনা করলে বেশ খানিকটা হতাশ হতে হয়। এই এজিএমে বেশ কিছু ত্রুটি লক্ষণীয়।
প্রথমত, এই অ্যানুয়াল জেনারেল মিটিং অ্যাজেন্ডা ছিল ছয়টি, কিন্তু কোনো অ্যাজেন্ডার ওপর আলোচনা হয়নি। কোম্পানি সেক্রেটারি মো. মনিরুল আলম এফসিএস কর্তৃক এজেন্ডাগুলো পঠিত হয় এবং হলরুমের সামনের দিকে আসন গ্রহণ করা কিছু ব্যক্তি ও মঞ্চের আশপাশে দণ্ডায়মান কিছু ব্যক্তি দু’হাত তুলে বসা থেকে দাঁড়িয়ে, দাঁড়ানো থেকে নড়েচড়ে ‘পাশ’, ‘পাশ’ বলে চিৎকার করতে থাকে। তাদের চেহারা ভীতির সঞ্চার করে। এখানে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের লুকোচুরির ভাব লক্ষণীয়। তা না হলে ব্যাংক কেন কাউকে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেয়নি।
দ্বিতীয়ত, সভা শুরুর কিছুটা আগে লক্ষ করা যায়, কিছু ব্যক্তি, যাদের কেউ কেউ হয়তো ব্যাংক কর্মকর্তা হবেন, অন্যরা হয়তো নন, তারা কোম্পানি সেক্রেটারির সঙ্গে ফটোসেশনে ব্যস্ত। কিন্তু সেক্রেটারি কি এত সস্তা বস্তুতে পরিণত হলেন, তিনি কি তার ব্যক্তিত্বকে এতই বিসর্জন দিলেন যে, অনেকের সঙ্গে তাকে ফটোসেশনে অংশগ্রহণ করতে হবে। এনসিসি ব্যাংকে প্রবেশ পদবিধারী একজন কর্মকর্তা বিশেষ বিশেষ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করে মানসম্মত ফলাফল অর্জনের পর ব্যাপক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার উত্তীর্ণ হয়ে ব্যাংকে যোগদান করেন। তাদের সংখ্যা বহু।
কিন্তু চাকরি চলাকালে বিশেষ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে তারা পদোন্নতিপ্রাপ্ত হন। শীর্ষ কয়েকটি পদের একটি হলো কোম্পানি সেক্রেটারি। সভায় উপস্থিত শেয়ারহোল্ডাররা, যারা তাকে চেনেন, তাকে মর্যাদাজনিত ভয় করা দরকার তাদের, কিন্তু তা লক্ষ করা যায়নি। মনে হলো সেক্রেটারি নিজেকে সবার মাঝে উদার করে দিলেন। এ ধরনের ব্যক্তিত্ব কোনো সংগঠনের নেতৃত্ব বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের হতে পারেন, কিন্তু কোনো পেশাজীবী তা ধারণ করলে এটা একেবারে বে-মানান।
তৃতীয়ত: নিয়ম হলো প্রতিটি অ্যাজেন্ডা পঠিত হবে, এর উপর আলোচনা হবে, এরপর পাশের জন্য ভোটাভুটি হবে। কিন্তু এখানে তা হয়নি। এজেন্ডা পঠিত হয়েছে, কিন্তু আলোচনা হয়নি। কর্মকর্তারা দ্রুত সভা শেষ করে দ্রুত হল কক্ষ ত্যাগ করেন। বার্ষিক সাধারণ সভায় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডকে রূপকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, এটা যেন পুলিশি গ্রেফতার এড়াতে চুপিসারে পালিয়ে যাওয়া।
চতুর্থত: বার্ষিক সাধারণ সভায় অ্যাজেন্ডা পাশের পদ্ধতি দেখলে মনে হয়, এটা হলো ‘পেইড এজেন্ট অ্যাক্টিভিটিস’ (চধরফ অমবহঃং অপঃরারঃরবং)। ব্যাংকের উন্নয়নের সহায়ক হলো অ্যাজেন্ডা পঠিত হবে, আলোচনা হবে এরপর পাস হবে। যদি কোনো অ্যাজেন্ডা পাস না হয়, তাহলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মাসিক, দ্বি-মাসিক অথবা ত্রৈ-মাসিক সভা আহ্বান করে সে অ্যাজেন্ডা পাস করিয়ে নিতে পারে। উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউ বলছেন, অ্যাজেন্ডার ওপর আলোচনা হতে হবে, আর কেউ তা বলছে না। মনে হয়, এই বুঝি উভয়পক্ষের মধ্যে মারামারি বেঁধেই গেল। সন্দেহের তীর ব্যাংকের দিকে। এরা পেইড এজেন্ট নিয়োগ করেছেন।
পঞ্চমত, মঞ্চের দুই ধারে কিছুটা সামনের দিকে অগ্রসর হলে দে-খা যায়, দাঁড়িয়ে আছে কয়েক জন বডিবিল্ডার। তাদের সাধারণত দেখা যায় বেসলিং খেলার মাঠে। কিন্তু এনসিসি ব্যাংকের এজিএমে কেন বডিবিল্ডার উপস্থিত হবেন, তার প্রকৃত ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দিতে পারে। তবে ধারণা করা হয়, বিনিয়োগকারীরা বড় মাত্রার লোকসান গুনায় ক্ষুব্ধ হয়ে মঞ্চে উপবিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালালে, তা থেকে রক্ষা করতে এই ব্যবস্থা; অথবা সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বডিবিল্ডারদের আনা হয়েছে।
আমাদের দেশে সুশিক্ষিত, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে। এনসিসি ব্যাংক তথা বিভিন্ন ব্যাংকের এজিএম মানেই হলো সুশীল সমাজব্যবস্থায় পরিচালিত সভা। তাই সুশীলদের যদি কোনো ঝুঁকি থাকে, তাহলে তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা না করে বডিবিল্ডার? আসল বিষয়টি হলো ওই যে মঞ্চকে যে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে, তার সৌন্দর্য সবকিছুকে হার মানিয়ে দিয়েছে। হয়তো ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা অনুধাবন করতে পারেনি।
ষষ্ঠত, বার্ষিক সাধারণ সভায় আগন্তুকদের কেউ কেউ কোম্পানি সেক্রেটারিকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করছেন বলে শুনেছি। কেউ বলেছেন, ‘…ভাই, ব্যাংক দেউলিয়া হলে আপনারও তো চাকরি চলে যাবে। এসব ছাড়–ন, বিনিয়োগকারীদের কথা ভাবুন।’ এ ধরনের বক্তব্য থেকে মনে হলো শেয়ারের দামের উত্থান-পতনে ব্যাংকের হাত রয়েছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে ব্যাখ্যা হলো বিনিয়োগকারীসহ ব্যাংক ব্যাপকভাবে লাভবান হবে এমন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির মধ্যে পতিত করা বড় অনৈতিক কাজ। যারা এ ধরনের সম্বোধন করে, তারা নাকি কর্তৃপক্ষের পরিশোধিত কর্মী। অনৈতিক কাজে তারা ‘পরিশোধিত’ হয় বলে বড় কর্মকর্তাদের তারা মর্যাদা দিয়ে কথা বলছে না।
বড় হতাশ লাগে যখন লক্ষ করি, এ ধরনের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত বিজ্ঞজনরা তাদের কোনো কাজে পেশিশক্তির ব্যবহার করছে। আর এই সুযোগে পেশিশক্তি তাদের অমর্যাদা করে যাচ্ছে। কোনো রাষ্ট্রের প্রত্যেকটা সেক্টরের উন্নয়ন হলো ওই রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন। উন্নয়নকে অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে বিবেচনা করলে তা পূর্ণাঙ্গ হবে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বর্ণনা করতে হবে কতগুলো মাপকাঠি নির্ণয় করে। যেমন, ওই প্রতিষ্ঠানের লোকবলের শিক্ষা, পদোন্নতির হার, তাদের কী পরিমাণ অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়, প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড মান, এই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের লাভের পরিমাণ, প্রতিষ্ঠানের আয় ও ব্যয় প্রভৃতি। কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে সংশোধিত হবে এমন দাবি রইল। আর বডিবিল্ডার বা পেইড অ্যাজেন্ট নিয়োগ করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছেন, এমন প্রমাণ তারা রাখবেন না।

শিক্ষক নেতা
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি

[email protected]

সর্বশেষ..