প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

প্রস্তাব নেই, তবু গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সুপারিশ

গণশুনানিতে বিইআরসির কারিগরি কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক: চলতি অর্থবছর রেকর্ড পরিমাণ লোকসান দিতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এজন্য বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি অনেক বেড়ে যাচ্ছে। তাই লোকসান তথা ভর্তুকির বোঝা কমাতে পাইকারি (বাল্ক) বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে পিডিবি। তবে মুনাফায় থাকায় গ্রাহক পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির কোনো প্রস্তাব করেনি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পনিগুলো।

যদিও গ্রাহক পর্যায়ে না বাড়ালে বিদ্যুতের বাল্ক মূল্য বৃদ্ধি কার্যকর সম্ভব নয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি কমিটি। এজন্য বাল্কের পাশাপাশি গ্রাহক পর্যায়েও আনুপাতিক হারে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে এ সুপারিশ করে বিইআরসির কারিগরি কমিটি। রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

শুনানিতে বিদ্যুতের বাল্ক মূল্য প্রতি ইউনিটে তিন টাকা ৩৯ পয়সা বা ৬৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে পিডিবি। এক্ষেত্রে যুক্তি দেয়া হয়, ফার্নেস অয়েলের দাম ১২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে ১৬ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। আর আমদানিকৃত কয়লার দাম ১৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি করায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে দুই হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। একইভাবে ডিজেলের দাম ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে ৭১৮ কোটি টাকা।

এদিকে কয়লার ওপর সরকার পাঁচ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছে। এতে ব্যয় বাড়ছে ৩৩ কোটি টাকা। ফার্নেস অয়েলের ওপর সাড়ে ২৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এ খাতে ব্যয় বাড়ছে ছয় হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। এছাড়া বাল্ক বিদ্যুৎ বিতরণের ওপর উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে ছয় শতাংশ। এতে অতিরিক্ত কেটে নেয়া হচ্ছে দুই হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। আর গ্যাস স্বল্পতার কারণে তরল জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২৪ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ব্যয় বেড়ে গেছে।

যদিও পিডিবির প্রস্তাবের বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করে ইউনিটপ্রতি দুই টাকা ৯৯ পয়সা বা ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ বাল্ক মূল্য বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বিইআরসির কারিগরি টিম। পাশাপাশি বাল্ক মূল্য বৃদ্ধির অনুপাতে গ্রাহক পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া পিডিবি ডিমান্ড চার্জ আরোপের প্রস্তাব করলেও কারিগরি কমিটি তা বিবেচনায় নেয়নি।

বিপিডিবির পাইকারি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে খরচ বেড়ে গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছর বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল পাঁচ টাকা ৫৮ পয়সা। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় টাকা ৩০ পয়সা। চলতি অর্থবছর মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে তা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাত টাকা ৪১ পয়সা। আর ২০২২ সালে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে সাত টাকা ৯৪ পয়সা। এছাড়া আগামী অর্থবছর গড় উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে দাঁড়াবে ৯ টাকা ১৯ পয়সা।

শুনানিতে আরও জানানো হয়, বর্তমানে ছয়টি বিতরণকারী সংস্থা/কোম্পানি সবাই মুনাফায় রয়েছে। এর মধ্যে পিডিবি বাল্কে লোকসানে থাকলেও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রিতে মুনাফায় রয়েছে। গত অর্থবছর সংস্থাটি পাঁচ টাকা ৮৯ পয়সায় বাল্ক বিদ্যুৎ কিনে সাত টাকা ২২ পয়সায় গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। আর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড চার টাকা ৩৭ পয়সায় বিদ্যুৎ কিনে তা ছয় টাকা ৬৬ পয়সায় বিক্রি করেছে।

একইভাবে ডিপিডিসি ছয় টাকা ৪১ পয়সায় বিদ্যুৎ কিনে তা আট টাকা চার পয়সায় বিক্রি করেছে। ডেসকো ছয় টাকা ৪৫ পয়সায় বিদ্যুৎ কিনে তা সাত টাকা ৯৯ পয়সায় বিক্রি করেছে। আর নেসকো পাঁচ টাকা সাত পয়সায় বিদ্যুৎ কিনে তা সাত টাকা ১৭ পয়সায় বিক্রি করেছে। এছাড়া ওজোপাডিকো পাঁচ টাকা ৩৮ পয়সায় বিদ্যুৎ কিনে তা সাত টাকা ১৯ পয়সায় বিক্রি করেছে।

যদিও শুনানিতে পিডিবির প্রস্তাব ও বিইআরসির কারিগরি কমিটির মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে বাংলাদেশ কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামুসল আলম। তিনি বলেন, বিদ্যুৎকে সেবা খাতের পরিবর্তে বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করা হয়েছে। এ খাতে শুল্ক-কর, ভ্যাট আরোপ করে লুণ্ঠনের একটি খাতে রূপান্তর করা হয়েছে। আর এ খাতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে এলেও কারিগরি কমিটি ও পিডিবি কেউ তা বিবেচনা না করে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। অথচ ভর্তুকি বহাল রাখা হলে ও শুল্ক-কর তুলে নেয়া হলে মূল্যহার বৃদ্ধির কোনো প্রয়োজনই পড়ে না।

বিইআরসির চেয়ারম্যান ছাড়াও অন্য কমিশনাররা শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।