পত্রিকা

প্রস্তুতি শেষেও ফের পেছাল ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন

মাসুম বিল্লাহ: উদ্যোগের শুরু ২০১২ সালে। বিদ্যমান মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইন আধুনিকায়ন শুরু হয়। ওই বছরেই জাতীয় সংসদে অনুমোদন হয় নতুন ভ্যাট আইন। এরপর ২০১৫ সালে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। এর পরের বছরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তা চলতি বছর থেকে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে এক বছর পেছানো হয়। বিদায়ী বছরটিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সব আয়োজন শেষে ব্যবসায়ীদের আপত্তিতে এ বছরও আইনটির বাস্তবায়ন দুই বছর পিছিয়ে যায়।

২০১৬ সালে বাজেট প্রণয়নের সময় নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন এক বছর পেছানোর ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। ওই সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ব্যবসায়ীরা নতুন আইন বাস্তবায়নে পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকায় তা ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকরের কথা বলা হয়েছিল। সেই মোতাবেক চলতি বছরের মার্চ থেকে নতুন আইনের উপযোগী অনলাইন ভ্যাট নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। এর আগেও দুবার আইনটির বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া হয়। এখন ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে আইনটি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কারের পদক্ষেপ আটকে গেল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এর প্রভাব পড়তে পারে অন্য সংস্কার কার্যক্রমে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর শেয়ার বিজকে বলেন, আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারকে আগে ঠিক করতে হবে তারা কী চায়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সেটা বাস্তবায়নে বেশি ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকলে কোনো সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন হবে না। আর উন্নত দেশে উন্নীত হতে হলে অবশ্যই সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ বিদ্যামান ১০-১১ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত দিয়ে উন্নত দেশে যাওয়া যাবে না। এটা কমপক্ষে ১৭-১৮ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। আর সেটা করতে হলে ভ্যাট আইনের পাশাপাশি আয়কর আইনসহ অন্যান্য আইন আধুনিকায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, ভারতেও রাজস্ব খাতে সংস্কারের বিষয়ে নানা বাধা এসেছে। কিন্তু সে দেশের সরকার পিছপা হয়নি। রাজস্ব বাড়াতে হলে সংস্কারের বিকল্প নেই। আর অতিমাত্রায় ছাড় দিয়ে কোনো সংস্কার বাস্তবায়ন হয় না।

বিদায়ী বছরের অনেকটা সময়জুড়েই নতুন ভ্যাট আইনটি আলোচনায় ছিল। এনবিআরের প্রাক্-বাজেট আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই ব্যবসায়ীরা নতুন আইনটির সমালোচনা শুরু করেন। সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের ছিল ঘোর আপত্তি। ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল ভ্যাট হার কমানো এবং একাধিক হারে ভ্যাট আরোপ করা। প্রথম দিকে ব্যবসায়ীরা নতুন আইনে প্যাকেজ ভ্যাট প্রথা বহাল রাখার দাবি করলেও শেষ দিকে এটি নিয়ে তেমন জোরালো দাবি করতে দেখা যায়নি।

তবে গত ৩০ এপ্রিল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সঙ্গে এনবিআরের পরামর্শক সভায় এনবিআর ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। উভয় পক্ষ ‘হুমকি’ ও ‘পাল্টা হুমকি’ দেয়। ব্যবসায়ীরা নতুন ভ্যাট আইনের বিরোধিতা করে আন্দোলনের হুমকি দেন। জবাবে অর্থমন্ত্রী আন্দোলন দমনের পাল্টা হুমকি দেন।

এমন নজিরবিহীন ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকার ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে অনড় থাকে। গত ১ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেট বক্তৃতায় ১ জুলাই থেকেই নতুন আইন বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। তিনি বাজেট বক্তৃতায় বলেন, নতুন আইনটি পুরোপুরি কার্যকর করতে রাজস্ব প্রশাসন প্রস্তুত। এরপর ব্যবসায়ীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় আরও উচ্চপর্যায়ে। শেষ পর্যন্ত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে ভ্যাট আইন দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।

এদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ঘোষিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্য রয়েছে, যা আগের অর্থবছরের লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি। কিন্তু আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ রাজস্ব আহরণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজেট ঘোষণার পরপরই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব কম আহরণ হবে। ফলে অন্য বছরের তুলনায় একটু আগেই বাজেট সংশোধন করা লাগতে পারে। তবে এনবিআরের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে বিদ্যমান আইনেই ভ্যাট আহরণে বেশ গতি এসেছে। চলতি অর্থবছরের অক্টোবর পর্যন্ত ভ্যাটের লক্ষ্য ছিল ২৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এ সময়ে আহরণ হয়েছে ২২ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..