Print Date & Time : 13 April 2021 Tuesday 6:30 pm

প্রাণিকুল রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে

প্রকাশ: January 20, 2021 সময়- 12:33 am

প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সংস্পর্শে এগিয়ে যাচ্ছে মানবসভ্যতা। প্রাচীন গুহাবাসী মানবসন্তান এখন জয় করছে অতল মহাসমুদ্র ও সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। পুরো ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র আজ মানবসভ্যতার পদধ্বনি শোনা যায়। চন্দ্র বিজয়ের পর মানুষ এখন নীল আকাশের লাল গ্রহ মঙ্গলেও স্থায়ী বাসিন্দা হতে স্বপ্ন বুনছে। এত সাফল্য, এত জয়গাথার পরও ভালো নেই প্রকৃতির বাসিন্দারা। ভালো নেই প্রকৃতি, ভালো নেই প্রকৃতির বিশাল বৃক্ষরাজি এবং নিরীহ প্রাণিকুল। শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই আমাদের একের পর এক প্রকৃতিবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ড জীবজগতের বাসিন্দাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিশুদ্ধ নেই ভূমণ্ডলের মৃত্তিকা, বায়ু, জল, অন্তরীক্ষ; সুস্থ নেই তাদের অধিবাসীরা। কিন্তু আদৌ কি এমনটি হওয়ার কথা ছিল? উত্তর অবশ্যই হবে, ‘না।’

অতিসম্প্রতি একটি ভিডিও ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। এতে দেখা যায়, খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদ্যাপনের সময় আতশবাজি-পটকাবাজির ঝলকানি আর শব্দে প্রকম্পিত হচ্ছিল ইউরোপের দেশ ইতালির রাজধানী রোমের আকাশ-বাতাস। মনে হচ্ছিল সভ্য দেশে যেন যুদ্ধের দামামা বাজছে। আতশবাজি আর পটকাবাজির এই বিকট শব্দে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে পুরো শহরের ঘুমিয়ে থাকা নিরীহ পাখিরাও। পাখিগুলো ভয়ে দিশাহারা হয়ে দিগি¦দিকজ্ঞানশূন্য হয়ে উড়তে থাকে। ফলে কয়েকশ পাখি তাৎক্ষণিকভাবে হƒদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কী দোষ ছিল নিরীহ পাখিগুলোর? স্রষ্টার সৃষ্টির সঙ্গে এত নির্মমতাই-বা কেন?

আমাদের দেশেও ঠিক একইভাবে খ্রিষ্টীয় ও বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করা হয়ে থাকে। আমরা কেউ খোঁজ রাখি না যে, এসব দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে দেশে রোমের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে থাকে কি না। কারণ বর্তমানে আমরা অনেকটা প্রকৃতিবিমুখী। দেশে ইচ্ছাকৃতভাবে পথের কুকুর-বিড়াল মেরে ফেলা হয়। মা কুকুর কিংবা বিড়ালের সামনেই তার ছোট বাচ্চাদের বিষপ্রয়োগ কিংবা পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আমাদের নদী-নালা, খাল-বিলে আগে যেমন শুশুক, ডলফিন ও ভোঁদড় দেখা যেত, এখন কিন্তু আর খুব একটা দেখা যায় না। এর প্রধান কারণ হলো তাদের প্রতি আমাদের অমানবিকতা; সৃষ্টির সেরা প্রাণী হয়েও আমরা প্রকৃতির বাসিন্দাদের প্রতি প্রচণ্ড অমানবিকতার পরিচয় দিচ্ছি। আমাদের গ্রামাঞ্চলে এমনকি শহরাঞ্চলেও অজ্ঞতাবশত বা অতিরিক্ত কৌতূহলী হয়ে গন্ধগোকুল, গুইসাপ, সাপ, বেজি, শেয়াল, বনবিড়াল, রাজশকুন, হাড়গিলা পাখি প্রভৃতি দেখলেই মেরে ফেলার প্রচলন রয়েছে। এখনও আমাদের দেশে বন্যপাখি শিকার এবং পাচার করা হয়ে থাকে। এতে অকালে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণী।

এই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা নিকট ভবিষ্যতে ব্যাপকভাবে স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলোর বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। তাদের মতে, ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির প্রথম ধাপ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এর ফলে ৩২ হাজারেরও বেশি প্রজাতির জীব মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে, এবং ২১০০ সাল নাগাদ আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী গণবিলুপ্তির দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করবে। অবশ্য অস্ট্রেলিয়া ও ক্যারিবীয় অঞ্চল এরই মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। প্রাণিকুলের বিলুপ্তির জন্য শুধু যে প্রাণীগুলোর জীবনই সংকটে পড়বে তা কিন্তু নয়, এর ফলে মানুষের জীবনও বহুবিধ সংকটে পড়বে।

প্রশ্ন হলো, এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী এবং প্রাণিকুল রক্ষায় আমাদের করণীয় বা কী? প্রাণিকুলের বিলুপ্তির সব কারণই কিন্তু প্রায় মানবসৃষ্ট। এজন্য তাদের রক্ষার দায়িত্বও আমাদের ওপরেই বর্তায়। বিশ্বের প্রতিটি দেশকে, বিশেষত শিল্পনির্ভর দেশগুলোকে গ্রিনহাউস গ্যাস রোধে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্রতিটি দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা এক্ষেত্রে অত্যন্ত জুরুরি। একইসঙ্গে কম জমিতে বেশি ফসল ফলানোর প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহারে প্রসার ঘটাতে হবে। এর ফলে একদিকে ধ্বংস হওয়া থেকে বনভূমি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি প্রকৃতিও বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে।

দেশের প্রাণিসম্পদ রক্ষায় যেসব ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে: এক. নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর ও যুগোপযোগী আইন করতে হবে এবং কঠোর শাস্তির প্রচলন করতে হবে। দুই. বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষার জন্য তাদের কৃত্রিম প্রজননের প্রসার ঘটাতে হবে। তিন. বন্যপ্রাণী ও বেওয়ারিশ প্রাণী রক্ষায় আইনের প্রয়োগ করতে হবে।

প্রাণী ও মানুষের ভারসাম্যের মধ্য দিয়েই এই পৃথিবী আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।

শেখ রফিকউজ্জামান

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়