প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধার অপব্যবহার

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শীর্ষ গোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বন্ডেড প্রতিষ্ঠান তিনটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে তা চোরাপথে খোলাবাজারে বিক্রি করে আসছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর ওই তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। এজন্য পৃথক তিনটি মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো. সহিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, স্বনামধন্য প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে এনবিআরের নির্দেশে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ও শুল্ক গোয়েন্দা পৃথকভাবে কাজ করছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর বন্ডেড কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির তথ্যানুসন্ধান ৯ সদস্যের টিম গঠন করে। টিম তথ্যানুসন্ধান করে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয় কাঁচামাল চোরাপথে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিতে টিম গত ২৯ এপ্রিল সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে তিনটি প্রতিষ্ঠানে পৃথকভাবে অভিযান চালায়। টিম প্রথমে অলপ্লাস্ট বিডি লিমিটেড নামে গ্রুপের বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউজে অভিযান চালায়। শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান অলপ্লাস্ট বিডি লিমিটেড ২০১০ সালে থেকে শপিং ব্যাগ, ফ্যাশন্যাবল ব্যাগ, রোল ব্যাগ, স্ট্রিচ ফ্লিম, গার্মেন্ট পলি উৎপাদন ও বাজারজাত করে।
অভিযানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির বন্ড রেজিস্টার অনুযায়ী চার হাজার ১১ দশমিক ৩৭ মেট্রিক টন প্লাস্টিকের কাঁচামাল পিপি, এলডিপিই, এইচডিপিই ও প্রিন্টিং ইংক মজুদ থাকার কথা। কিন্তু সরেজমিনে দুই হাজার ৮৭৩ দশমিক ২৪ মেট্রিক টন কম পাওয়া যায়। শুল্ককরসহ কম পাওয়া কাঁচামালের মূল্য প্রায় ৪৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যাতে শুল্ককর প্রায় ১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
অপরদিকে একই দিন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ময়মনসিংহ এগ্রো লিমিটেডে অভিযান চালানো হয়। এতে বিভিন্ন ধরনের জুস ও সফ্ট ড্রিংক উৎপাদিত হয়। এতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড ওয়্যারহাউজে বন্ড রেজিস্টার অনুযায়ী ১৫০ দশমিক ১১ মেট্রিক টন পিট রেজিন, প্লাওয়ার ইত্যাদি মজুদ থাকার কথা। কিন্তু সরেজমিনে ৩০ দশমিক ৭৮ মেট্রিক টন পণ্য কম পাওয়া যায়। শুল্ককরসহ যার মূল্য প্রায় এক কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যাতে শুল্ককর প্রায় ৬৫ লাখ টাকা।
পাশাপাশি ময়মনসিংহ এগ্রো লিমিটেডের ইউনিট-৩-এ অভিযান চালায় গঠিত টিম। বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউজের বন্ড রেজিস্টার অনুযায়ী, এক হাজার ৭৯২ দশমিক ৩২ মেট্রিক টন ফ্লিম, এলডিপিই ইত্যাদি কাঁচামাল মজুদ থাকার কথা থাকলেও সরেজমিনে এক হাজার ১১৩ দশমিক ৯৮ মেট্রিক টন কম পাওয়া যায়, যার শুল্ককরসহ মূল্য প্রায় ১৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যাতে শুল্ককর প্রায় চার কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
ড. মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, তিনটি প্রতিষ্ঠানে মোট ৭৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকার চার হাজার ১৮ মেট্রিক টন কাঁচামাল পাওয়া যায়নি, যাতে শুল্ককর প্রায় ১৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। শুল্ককর ফাঁকি দিতে তিনটি প্রতিষ্ঠানই কাঁচামাল চোরাপথে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরও কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে কি না, তা আমরা খতিয়ে দেখছি। তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা করে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া তিনটি প্রতিষ্ঠানের বন্ডিং কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে অনুরোধ করা হয়েছে।
ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্র জানায়, অলপ্লাস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড ও ময়মনসিংহ এগ্রো লিমিটেড নামে দুটি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। গত বছর ১৮ অক্টোবর পৃথকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। অলপ্লাস্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের অভিযোগে বলা হয়, ২০০৯ সালে বন্ড লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটিতে ২০১৮ সালের ৯ জুলাই প্রিভেন্টিভ টিম পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে বন্ডেড ওয়্যারহাউজে বন্ড রেজিস্টার অনুযায়ী এলডিপিই, এলএলডিপিই, এইচডিপিই ১৩ হাজার ৩৭৯ দশমিক ৭৩ কেজি ও প্রিন্টিং ইন্ক, সলভেন্ট পাঁচ হাজার ৫১৯ দশমিক ২১ কেজি কাঁচামাল কম পাওয়া যায়। এসব কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ১৮ লাখ টাকা, যাতে শুল্ককর প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এছাড়া পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ১৬টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল বন্ড রেজিস্টারে ইন্টু বন্ড করা হয়নি এবং কাঁচামাল পরিদর্শনে পাওয়া যায়নি। কাঁচামাল ইন্টু বন্ড না করা মানে কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণ করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এসব কাঁচামালের মূল্য প্রায় পৌনে ১৭ কোটি টাকা, যাতে শুল্ককর প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। অপরদিকে ময়মনসিংহ এগ্রো লিমিটেডও একই দিন পরিদর্শন করা হয়। কারণ দর্শানোর নোটিসে বলা হয়, পরিদর্শনে বন্ডেড ওয়্যারহাউজে সাইট্রিক এসিড প্রায় ৩৭ হাজার ১৫৭ দশমিক ৪৩ কেজি, সুগার ৪৮ হাজার ২৮ দশমিক ২৪ কেজি ও সিএমসি চার হাজার ৮৫৮ দশমিক ৪৮ কেজি বেশি এবং ৩৮ হাজার ৯৫৭ দশমিক ৬৫ কেজি পেট রেজিন কম পাওয়া যায়। এসব কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণ করা হয়েছে। এর শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় সাড়ে ৮৭ লাখ টাকা, যাতে শুল্ককর ২৯ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি একটি বিল অব এন্ট্রির কাঁচামাল ইন্টু বন্ড না করে প্রায় এক কোটি আট লাখ টাকার পণ্য অপসারণ করেছে, যাতে শুল্ককর প্রায় সাড়ে ৬১ লাখ টাকা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..