প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ডে ট্রেডারের ভূমিকায়!

 

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: লেনদেনে হঠাৎ ছন্দপতন দেখা দিয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই)। মাত্র চার কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন নেমে এসেছে অর্ধেকে। একই সঙ্গে কমতে শুরু করেছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর ও বাজার মূলধন। এ অবস্থার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দায়ী করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, স্থিতিশীল পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ না করে ‘ডে ট্রেডার’-এর ভূমিকা পালন করছেন। যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পুঁজিবাজারে বিদ্যমান।

ডিএসইতে গতকাল বৃহস্পতিবার লেনদেন হয়েছে ৬৩৬ কোটি টাকার শেয়ার। এর আগের কার্যদিবসে লেনদেন ছিল এক হাজার ৬৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে চার কার্যদিবস আগে লেনদেন হয়েছিল এক হাজার ৬৩ কোটি টাকা।  সেই হিসাবে গতকাল লেনদেন কমে গেছে অর্ধেকের বেশি। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, লেনদেনের গতি ভালো না থাকায় শঙ্কায় ছিলেন বিনিয়োগকারীরা।  আগামীতে বাজারে আরও বৈরী পরিবেশ তৈরি হতে পারে, এ ভয়ে কম দরে শেয়ার বিক্রি করে দেন অনেক বিনিয়োগকারী।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশের পুঁজিবাজারে সম্প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হয়েছেন। যার জের ধরে বেশকিছু দিন ধরে বাজারে স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন কোম্পানিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ এক থেকে চার শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পরিসংখ্যানে এমনটিই দেখা গেছে। সিংহভাগ কোম্পানির শেয়ার ধারণের দিক দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শতকরা অংশ বেড়েছে। তবে হঠাৎ করে বাজারে ছন্দপতনে তাদের আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে বিনিয়োগকারী কাছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শেয়ারের দর বাড়িয়ে বিক্রি করে দিয়ে এখন হাত গুটিয়ে বসে রয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি না থাকলে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক গতি হারায়। যে কারণে কমে যায় লেনদেন। কমতে থাকে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর এবং বাজার মূলধন। এখন যারা বাজারে লেনদেন করছেন তারা সাধারণ বিনিয়োগকারী।

এ প্রসঙ্গে ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক রকিবুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গতকালের বাজার চিত্র দেখে অবাক হয়েছি। হঠাৎ করে এভাবে লেনদেন কমে যাবে -এটা ধারণা করতে পারিনি।’

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রসঙ্গে টেনে তিনি বলেন, ‘তারা এখন ডে ট্রেডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এটা করলে বাজার নিজস্ব গতি হারাবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত কাজ হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এখন দেখছি তার উল্টো চিত্র। তাদের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশা করেন না কেউই।’

একই প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন ‘পুঁজিবাজারে সবাই লাভ করার জন্য আসে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মুনাফা পেলে শেয়ার বিক্রি করে দেবে এটা স্বাভাবিক। এ জন্য তাদের দায়ী করা ঠিক হবে না।’

এদিকে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে হবে। কিন্তু দেশে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ খুবই কম। তাই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অবদানও কম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও বাজারের তুলনায় তা এখনও কম। বিশ্বের বড় বড় পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ  আরও বেশি দেখা যায়। তাদের অভিমত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে সক্রিয় হলে এটি বাজারের জন্য ইতিবাচক। কারণ তারা বাজারের সার্বিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করে থাকেন। তারা জানান প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা খুবই দক্ষ। কখন বাজার বাড়বে আবার কখন পড়বে এটা তারা বুঝতে পারেন। তাই মুনাফা তুলে নেওয়ার সময় তারা তুলে নেবেন এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে হবে নাকি স্বল্পমেয়াদে হবে তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে  সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বেড়েছে ব্যাংকিং খাতে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৬ ব্যাংকের শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বেড়েছে।  বিনিয়োগ বেড়েছে, কমেছে ১২ ব্যাংকে। অপরদিকে ১০ ব্যাংকে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে, কমেছে সাত ব্যাংকে।