সম্পাদকীয়

প্রাথমিকে সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে চাই সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক বলেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে দুটি সমাপনী পরীক্ষা বিশ্বের কোথাও আছে বলে তার জানা নেই। দৈনিক শেয়ার বিজের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব শ্যামল কান্তি ঘোষ বলেন, একটি শিশুকে তার উপযোগী শিক্ষার চেয়ে বেশি চাপিয়ে দেওয়া হলে সেটি তার উপকারের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ঢাবি ভাইস চ্যান্সেলর ও সচিবের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুরা কতটা পরীক্ষা-চাপের মধ্যে রয়েছে!

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষা নিয়ে যে কত রকম ‘পরীক্ষা’ হচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। বছর দুয়েক ধরেই শোনা যাচ্ছে, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়া হবে। একবার তো পঞ্চম শ্রেণির বদলে শুধু অষ্টম শ্রেণিতে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা হবে, এমন ঘোষণাও দেওয়া হলো। পরে তড়িঘড়ি সে ঘোষণা বাতিলও করা হলো। এদিকে অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা কে গ্রহণ করবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, নাকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সে সিদ্ধান্তও ঝুলে আছে দীর্ঘদিন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম পর্যন্ত শ্রেণিগুলো তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি এখনও। সুতরাং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত দায়দায়িত্ব নিতে নারাজ তারা। সবকিছু মিলিয়ে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা আসলে কোন শ্রেণি সম্পন্ন হওয়ার পর গ্রহণ করা উচিত, তা সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে রয়েছে এবং এরই মধ্যে প্রচলিত নিয়মে পঞ্চম শ্রেণির পর সমাপনী পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

অথচ এ পরীক্ষাটি হওয়ারই কথা ছিল না। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর মূল প্রতিবেদন যারা প্রণয়ন করেছেন, তারা প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে এ ধরনের প্রস্তাব রাখেননি। প্রতিবেদনটি যখন আমলাদের হাত হয়ে জাতীয় সংসদে পাস হয়, তখন এতে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার অংশটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কিসের ভিত্তিতে কাজটি করা হলো, তা জানা নেই। যারা শিক্ষানীতির মূল প্রতিবেদন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে যশস্বী এবং সে কারণেই শিক্ষানীতি প্রণয়নের মতো গুরুদায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে নিশ্চয়ই তারা সেটি ওই প্রতিবেদনে যুক্ত করতেন। তাদের এড়িয়ে যারা এটি যুক্ত করেছেন, তারা এর অসারতা কি উপলব্ধি করতে পারছেন?

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যে পরিমাণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, এমনটি আর কোনো সময়ে হয়নি। আমরা চাইবো, বাড়তি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে সুচিন্তিতভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হোক। শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার আগে সেটি যথাযথ কি না, তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদ ও পেশাগতভাবে যারা শিক্ষা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, তাদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। নইলে একসময় তা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, যার আলামত এখনই কিছুটা দৃশ্যমান।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..