দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

প্রিমিয়ামের বলি জাহিন টেক্সের শেয়ারধারীরা

পুঁজিবাজারে স্মরণকালের ভয়াবহ ধসের পর ২০১১ সালে পুনর্গঠন করা হয় বিএসইসি। বাজার ভালো হবে এ প্রত্যাশায় কমিশনকে নতুন করে সাজানো হয়েছিল; কিন্তু উল্টো এ সময় দুর্বল কোম্পানিগুলো বেশি তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে রকম কিছু কোম্পানি নিয়ে শেয়ার বিজের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ দ্বিতীয় পর্ব

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: বর্তমান কমিশনের আমলে কিছু কোম্পানি অধিক প্রিমিয়াম নিয়ে তালিকাভুক্ত হয়। পরবর্তীকালে এর বেশিরভাগ কোম্পানির আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি মুনাফায় ধস নামে। বস্ত্র খাতের জাহিনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ তেমন একটি কোম্পানি। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন শেয়ারধারীরা।

প্রতি শেয়ারে ১৫ টাকা প্রিমিয়াম নিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানি জাহিনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ। অভিহিত মূল্য ১০ টাকার সঙ্গে ১৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ মোট ২৫ টাকা দরে বিক্রি হয় এ শেয়ার। অর্থ উত্তোলনের সময় প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা দেয় ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ঋণ পরিশোধের জন্য বাজারে আসছে। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পাশাপাশি শেয়ারদর নেমে এসেছে চার টাকার কমে।

৯ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বাড়েনি। অন্যদিকে এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। দেখা গেছে, আইপিও-পূর্ব ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর জাহিনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা বর্তমানে ১৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০১১ সালে পুঁজিবাজার থেকে ৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করে জাহিনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ। ওই সময় ভালো মুনাফা ও সম্পদ দেখিয়ে উচ্চদরে শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে এই টাকা উত্তোলন করা হয়। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমতে কমতে কোম্পানিটি লোকসানে পতিত হয়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথমার্ধের ব্যবসায় শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) তিন দশমিক শূন্য পাঁচ টাকা এবং ৪৬ দশমিক শূন্য এক টাকা শেয়ারপ্রতি সম্পদ (এনএভিপিএস) দেখিয়ে এই দরে শেয়ার ইস্যু করা হয়। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। প্রতিষ্ঠানটিকে পুঁজিবাজারে আনার জন্য ইস্যু ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে এএএ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস।

এদিকে সর্বশেষ তিন প্রান্তিকেও পিছিয়ে রয়েছে কোম্পানিটি। এ সময়ে কোম্পানির বিক্রি কমে গেছে তিনগুণের বেশি। ২০১৮-১৯ আর্থিক বছরের প্রথম ৯ মাসে মোট বিক্রি হয়েছে ২১ কোটি ৮২ লাখ টাকার পণ্য, আগের বছর একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৬৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

একই সময়ে সব খরচ মিটিয়ে কোম্পানির লোকসান গুনতে হয়েছে ১১ কোটি ২২ লাখ টাকা। আগের আর্থিক বছরের এই সময়ে যেখানে চার কোটি ৬৬ লাখ টাকা মুনাফা ছিল। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয়ের অবস্থাও শোচনীয়। ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরের তিন প্রান্তিক মিলে এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৫৭ পয়সা। সেখানে এ বছর (২০১৮-১৯) তিন প্রান্তিক মিলে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে এক টাকা ৩৭ পয়সা। বছর শেষে সে লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই টাকা ২৪ পয়সায়। শেয়ারপ্রতি সম্পদ নেমে এসেছে ২২ টাকা ৪৯ পয়সায়। অর্থাৎ কোম্পানির আর্থিক ভিত্তির সব সূচকের নি¤œমুখী প্রবণতা রয়েছে।

বিষয়টি জানতে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানের সচিব মো. লিয়াকত আলী বখতিয়ার শেয়ার বিজকে বলেন, বিভিন্ন কারণে আমাদের কিছু পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে, যে কারণে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাও আগের মতো নেই। এটা শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানের বেলায় নয়, যে কোনো প্রতিষ্ঠানের বেলায় একই ঘটনা ঘটতে পারে। কারও ব্যবসা সব সময় এক রকম থাকে না। তবে বিশ্বাস করি আমাদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

এদিকে তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির আর্থিক অবস্থা নাজুক হওয়ার কারণে ধারাবাহিকভাবে কমছে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৬ সালে কোম্পানির মুনাফা হয় ৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। পরের বছর তা নেমে আসে পাঁচ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। ২০১৮ সালে এসে মুনাফা আরও কমে যায়। এ বছর মুনাফা কমে দাঁড়ায় চার কোটি ৮৭ লাখ টাকায়। একই সময়ে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয়ও ধারাবাহিকভাবে কমতে দেখা গেছে। ২০১৬ সালে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল এক টাকা ৩৪ পয়সা। পরের বছর তা নেমে আসে ৭৩ পয়সায়। ২০১৮ সালে তা আরও কমে হয় ৬০ পয়সা। একইভাবে এই সময়ের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানের শেয়ারপ্রতি সম্পদ (এনএভিপিএস) ২৮ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে ২৪ টাকা ৯১ পয়সায় নেমে এসেছে। পরের বছর তা নেমে এসেছে ২২ টাকা ৪৯ পয়সায়। এদিকে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, ২০১৯) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানেও শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪৩ পয়সা।

কোম্পানিটির মুনাফা না বাড়লেও গত কয়েক বছর নিয়মিত বোনাস শেয়ার দিয়ে পরিশোধিত মূলধন দ্বিগুণ করা হয়েছে, যা ইপিএসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। কোম্পানিটির আইপিও-পূর্ব ২৫ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন এখন ৮১ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। 

এ ধরনের কোম্পানির তালিকাভুক্তি প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা কোম্পানির কাগজপত্র দেখে সবকিছু সঠিক মনে হলে তবেই এর অনুমোদন দিই। পরবর্তীকালে কোম্পানিটি কেমন হবে, তা আমাদের জানা থাকে না। তাই এটা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন না করাই ভালো।

নিয়ম অনুযায়ী, আগে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিকেই প্রিমিয়াম দেওয়া হতো। সে কারণে উচ্চ দরে এই কোম্পানির শেয়ার কেনেন অনেক বিনিয়োগকারী। তাদের ভাবনা ছিল ইস্যু দরের নিচে নামবে না শেয়ারটি। কিন্তু বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি হচ্ছে তিন টাকা ৫০ পয়সায়। ফলে যারা উচ্চ দরে শেয়ার কিনেছিলেন, বর্তমানে তারা এর মাশুল গুনছেন।

গত এক বছরের মধ্যে বস্ত্র খাতের এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সর্বোচ্চ ১৩ টাকা দরে কেনাবেচা হয়। তালিকাভুক্তির পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির বোনাস শেয়ার দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ২০১০ সালে ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দিয়ে ‘এ’ ক্যাটেগরিতে থাকে কোম্পানিটি। পরের বছর তিন শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ‘বি’ ক্যাটেগরিতে নেমে আসে।

এই প্রতিষ্ঠানের মোট শেয়ারের মধ্যে ৩৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে পরিচালকদের কাছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ২২ দশমিক ৮৭ শতাংশ শেয়ার।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..