প্রয়োজন কারখানাভিত্তিক শ্রমজীবী মহিলা হোস্টেল

মো. আকতারুল ইসলাম: রাত ৯টা কিংবা সাড়ে ৯টা হবে; তৈরি পোশাকশিল্পের রাজধানী খ্যাত সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় কারখানা থেকে ডিউটি করে মূল রাস্তায় এসে সাবিহা, স্মৃতি, মিথিসহ দাঁড়িয়ে আছেন ১০-১৫ জন গার্মেন্টসকর্মী। ওভারটাইম করে কাছেই যাদের বাসা তারা হেঁটেই রওনা দিয়েছেন। সাবিহা, স্মৃতিদের মতো যাদের বাসা একটু দূরে, তারা দাঁড়িয়ে আছে ভ্যান-রিকশার জন্য। সারা দিনের ডিউটি, তারপর আবার ওভারটাইম করে ক্লান্ত শরীর, পা জড়িয়ে আসে। কিন্তু উপায় তো নেই। এই রাতে ক্লান্ত শরীরে হেঁটে বাসায় যাওয়াও কষ্টকর আবার সময়ও বেশি লাগবে। তারপর রাতের বেলায় রাস্তা-ঘাটে নিরাপত্তার অজানা শঙ্কা তো থাকেই। সাবিহা, স্মৃতিদের বয়স ২২ থেকে ২৮-এর ঘরে। এমন খাটুনির পর সন্ধ্যায় বা রাতে বাসায় ফেরা লাখ লাখ নারী শ্রমিকের নিত্যদিনের ঘটনা। গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাজ শেষে বাসায় ফেরার চিত্র কি আশুলিয়া, কি সাভার, কি টঙ্গী, গাজীপুর, কি ফতুল্লা, কি বন্দর, নারায়ণগঞ্জ অথবা চট্টগ্রাম সবখানে একই রকম। সারা দেশে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের প্রায় ৭৫ শতাংশই নারী। নিম্ন আয়ের এসব লাখ লাখ নারী শ্রমিকের সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর রাতে ঘুমানোর জায়গাটা যদি একটু মানসম্মত করা যেত, তাহলে হয়তো তাদের কাজের গুণগতমান ও পরিমাণগত মান বাড়ানো যেত।
২০১৩ সালে মর্মান্তিক রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানার কর্মপরিবেশের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। সব গার্মেন্টস কারখানাই শ্রম মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের আওতায় এসেছে, পরিদর্শন ব্যবস্থা ডিজিটাল হয়েছে, প্রতিটি কারখানা কাঠামোগত নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ কিংবা অগ্নিনিরাপত্তা বা কমপ্লায়েন্সের আওতায় এসেছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরেই কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা কারখানার সংখ্যা ছয় হাজার ৯৮৫টি। গার্মেন্টস কর্মীদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের উন্নয়নে হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ, ক্ষমতায়ন, মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ তাদের এবং তাদের শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রায় পাঁচ হাজারের মতো কারখানাভিত্তিক ডে-কেয়ার সেন্টার নির্মিত হয়েছে। আধুনিক প্রতিটি কারখানায় চিকিৎসা সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ারদের সংগঠন অ্যালায়েন্সের কান্ট্রি ডিরেক্টর বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি বলেছেন, নিরাপদ কর্মপরিবেশে বাংলাদেশ হলো বিশ্বের রোল মডেল। বিশ্বের সেরা ১০টি গ্রিন ফ্যাক্টরির সাতটিই বাংলাদেশে। গার্মেন্টস শ্রমিককদের সর্বনিম্ন মজুরি ২০১০ সালের আগের এক হাজার ৬০০ থেকে বর্তমানে (২০১৮) আট হাজার টাকা। আজ যে একেবারে হেলপার হিসেবে কোনো কারখানায় কাজে যোগ দেবে সেও ওভারটাইমসহ ১০ থেকে ১২ হাজারের কম মজুরি পাবে না।
শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়নও ঘটেছে চোখে পড়ার মতো। এতকিছুর পরও একটি জায়গায় এসে কারও কিছু বলার নেই, তা হচ্ছে লাখ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিকের আবাসন সুবিধার উন্নয়নের বিষয়। এ বিষয়ে এই পর্যন্ত অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সব উদ্যোগ সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। সারা দেশে প্রায় ৩২ থেকে ৩৫ লাখ তৈরি পোশাককর্মী নারী এবং তাদের বয়সও ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এ বয়সের শুধু এই শ্রমিকগুলোই নয়, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতি লভ্যাংশের সুযোগের কথাও মাথায় রেখে সারা দেশের সব খাতের সব শ্রমিকের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। জনমিতির এ সুবর্ণ সুযোগের তরি এখন বাংলাদেশের ঘাটে নোঙর করেছে। ১৮ থেকে ৩৫ বছরের বিশাল এই কর্মক্ষম মানুষগুলোকে সুন্দর, সুস্থ, নিরাপদ থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান সম্ভব হলে, বিশেষ করে দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত, দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি গার্মেন্টসসহ সব খাত দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে। দেশ এগিয়ে যাবে ২০৪১ সালে উন্নত সমৃদ্ধ স্বপ্নের সোনার দেশের কাতারে। অন্য সব বিষয়ের সঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে এখন দৃষ্টি দেওয়া দরকার দেশের সার্বিক উন্নয়নের মূল খাত গার্মেন্টস শ্রমিকদের, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের আবাসনের দিকে।
আর এজন্য দ্রুত প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ। এরই অংশ হিসেবে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের নারী শ্রমিকদের আবাসনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব জমিতে নারায়ণগঞ্জের বন্দর এবং চট্টগ্রামের কালুরঘাটে প্রায় দুই হাজার নারী শ্রমিকের জন্য আধুনিক উন্নতমানের সুযোগ-সুবিধা এবং পাঁচ শয্যার হাসপাতালসহ নারায়ণগঞ্জে ৯ তলাবিশিষ্ট এবং কালুরঘাটে পাঁচ তলাবিশিষ্ট কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১০ কোটি টাকা। বলা হচ্ছে, এই হোস্টেল নির্মাণের লক্ষ্য হলো সামাজিক মানসম্মত আবাসিক পরিবেশ সুনিশ্চিত করা, সামাজিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে বসবাসরত নারী শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা, শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের আধুনিক উন্নত শ্রমকল্যাণ সুবিধা নিশ্চিত করা, বিদ্যমান শ্রমকল্যাণ কেন্দ্র থেকে অন্যান্য সেবার আধুনিক ও শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রতিটি শ্রমজীবী মহিলা হোস্টেলগুলো হবে দুই থেকে চার সিটের কক্ষবিশিষ্ট, যাতে প্রত্যেক শ্রমজীবী নারী নিজের স্বকীয়তা, নিরাপত্তা, সামাজিক অবস্থান ঠিক রেখে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে কর্মে নিজেদের নিয়োজিত রাখতে পারে। এজন্য সরকারের এ মহতী উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসা এবং সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
সরকারের এ উদ্যোগ শ্রমজীবী নারীদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাবে। কারখানার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সর্বোপরি এ উদ্যোগ তাদের অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে হবে বড় ধরনের অগ্রগতি। এখন প্রয়োজন কারখানাভিত্তিক শ্রমজীবী মহিলা হোস্টেল নির্মাণ করা। তবে কথা থেকে যায়, সরকার কি সারা দেশে শুধু গার্মেন্টস শিল্পেই যে ৩০-৩২ লাখ কর্মজীবী নারী রয়েছে, সবার জন্যই আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারবে কি না। বিষয়টি সরকারের একার পক্ষে কঠিন। সরকার হয়তো কারখানা মালিকদের বিভিন্ন রকমের সুবিধার নিশ্চয়তা দিতে পারে। মূল ভূমিকা পালন করতে হবে কারখানা মালিকদেরই। বিশাল বিশাল জায়গা নিয়ে বর্তমানে যে বড় বড় কমপ্লায়েন্স কারখানা, গ্রিন কারখানা গড়ে উঠছে, সেখানে নিজস্ব শ্রমজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ করে নিজ কম্পাউন্ডের মধ্যে রাখা। সরকারের পাশাপাশি কারখানা পর্যায়ে এ ব্যবস্থাটি করা গেলে কোনো শ্রমিককেই আর দিন-রাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কারখানায় আসতে হবে না। থাকতে হবে না আর তাদের স্যাঁতস্যাঁতে বস্তির খুপরি ঘরে। তারা পাবে থাকার ভালো পরিবেশ, বাড়বে উৎপাদন। ফলে দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি পোশাক শিল্প খাত সফলতার শিখরে পৌঁছবে। এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..