সারা বাংলা

প্লাস্টিক ফুলের দাপটে বিপাকে ফুলচাষি যশোরে আমদানি বন্ধের দাবি

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করা কৃত্রিম ফুলের দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছেন ফুলচাষিরা। প্লাস্টিকের ফুলে সারা দেশের বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। তাই অনেক ক্ষেত্রে দেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক ফুলের চাহিদা কমেছে। প্লাস্টিকের ফুলের সহজলভ্যতা ও বারবার ব্যবহারের সুবিধা এবং কাঁচা ফুল একবারের বেশি ব্যবহার করতে না পারার কারণে কৃত্রিম ফুলের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে দেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক ফুল। এদিকে উৎপাদিত ফুলের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে এক সময় ফুল চাষ করে সচ্ছল হওয়া চাষিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ক্রমাগত লোকসানে অনেক চাষি ফুল চাষ থেকে সরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির তথ্যমতে, ২০১০ সালে দেশে ফুলের বার্ষিক বাজারমূল্য ছিল ৫৫০ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে তা দাঁড়ায় ১৫০০ কোটি টাকায়। এক সময় বিদেশ থেকে কোটি টাকার কাঁচা ফুল আমদানি হতো। কিন্তু এখন সেই আমদানিনির্ভরতা কমে গেছে। বাণিজ্যিকভাবে ফুল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সম্ভাবনাময় সেক্টর হিসেবে বর্তমানে দেশের ২৫ জেলার ছয় হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুল উৎপাদন করা হচ্ছে। প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ফুল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে উৎপাদিত ফুলের আকার-আকৃতি দিয়ে তৈরি প্লাস্টিকের ফুল দেশে আমদানি করছেন কিছু ইভেন্ট ব্যবসায়ী। দেশের সম্ভাবনাময় এ খাতকে ধ্বংস করতে প্লাস্টিকের ফুল আমদানির চক্রান্ত করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে কথা হয় যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের ফুলচাষি হারুন-অর-রশিদের সঙ্গে। তিনি ১৯৮৬ সাল থেকে ফুল চাষের সঙ্গে জড়িত। ফুল চাষ করেই পাকা বাড়ি করেছেন, বিয়ে করেছেন। সন্তানদের লেখাপড়াসহ সব খরচ চলে চাষের ফুল বিক্রি করে। কয়েক বছর তিনি ফুলের উপযুক্ত দাম না পেয়ে ক্রমাগত ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এর একমাত্র কারণ প্লাস্টিকের ফুল।

একই কথা বললেন ফুল চাষে সচ্ছলতার মুখ দেখা ফুলচাষি হারুন-অর-রশিদ (৫৫)। দুঃখ করে তিনি বলেন, ‘এখন আমাগের সমস্যা দাঁড়ায় গেছে প্লাস্টিকির ফুল। ওর জন্যিই গত কয় বছর লস খাচ্ছি। ১৮ সালে লস খাইছি প্রায় দেড় লাখ টাকা। গত বছর লস খাইছি প্রায় এক লাখ টাকা। এবারও দুই বিঘেয় গ্লাডিওলাস আর রজনীগন্ধ্যা লাগাইছি। কি হবেনে তা আল্লাহ জানেন। তবে এইরাম চললি ফুল চাষ করব কি কইরে?’

এ অবস্থায় সম্ভাবনাময় সেক্টরটিকে রক্ষায় সারা দেশের ফুল উৎপাদক ও ফুল ব্যবসায়ীদের পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে প্লাস্টিকের ফুল আমদানি ও ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি।

এ ব্যাপারে কথা হয় যশোর শহরে প্রাকৃতিক ফুল বিক্রির দোকান ‘সজীব ফুল ঘরের’ মালিক মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠানের আলোচনা সভার টেবিল, বিয়েবাড়ি, বিয়ের গাড়ি সাজানোর কাজসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাঁচা ফুল ব্যবহার হতো। অথচ এখন এমন ধরনের বেশিরভাগ অনুষ্ঠানে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট

প্রতিষ্ঠানগুলো প্লাস্টিকের ফুল ব্যবহার করছে। এ কারণে মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠান বাড়লেও আমাদের ফুল বিক্রি বাড়েনি। বরং আগের তুলনায় কমেছে।

এ ব্যাপারে কথা হয় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান ‘কালারস’-এর পরিচালক সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনায় আমরা কাঁচা ফুল ও প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে সাজানোর কাজ করে থাকি। তবে প্লাস্টিকের ফুল ব্যবহার করলে খরচ কম হয়। কারণ, এই ফুল বারবার ব্যবহার করা যায়। কয়েকবার ব্যবহারের পর ময়লা হলে আবার ধুয়েও ব্যবহার করা যায়। এ কারণে আমরা প্লাস্টিকের ফুল ব্যবহার করি।’

এ ব্যাপারে যশোর শহরের চুড়িপট্টির প্লাস্টিকের ফুল বিক্রির দোকান ‘চেতনা হ্যান্ডিক্র্যাফটসে’ কর্মরত শামিম রেজা বললেন, ‘আমরা একদম আসল ফুলের মতো দেখতে গোলাপ, জারবেরা, গ্ল্যাডিওলাস, রজনীগন্ধ্যাসহ সব ধরনের ফুল বিক্রি করি। এ ফুল সহজে নষ্ট হয় না। এসব ফুল বেশিরভাগ চীন থেকে আমদানি হয়। দামও কম। এসব কারণে এই ফুল এখন যথেষ্ট পরিমাণে বিক্রি হয়।’

এদিকে প্লাস্টিকের ফুল আমদানি ও ব্যবহার বন্ধের দাবিতে সম্প্রতি যশোর প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সোসাইটির সভাপতি মো. আবদুর রহিম বলেন, প্রতিবছর ফুল উৎপাদন বাড়ছে। অথচ বাজার সম্প্রসারণে স্থবির অবস্থা। এর মূল কারণ বিদেশ থেকে আমদানি করা প্লাস্টিকের ফুল। কৃত্রিম এ ফুল দেশের ফুল সেক্টর ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ অবস্থায় অবিলম্বে প্লাস্টিকের ফুল আমদানি ও ব্যবহার বন্ধে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ দাবি করে তারা বলেন, প্লাস্টিকের ফুল বন্ধ না হলে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ ব্যাহত হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..