দুরে কোথাও

পড়ন্ত বিকালে বুড়িগঙ্গায়…

ভ্রমণপিয়াসি তিন তরুণের পরিচয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্কা নামের লাল বাসে। একই বাসে প্রতিদিন যাতায়াতের কারণে একটা সময়ে তিনজনের মাঝে বন্ধুত্ব হয়। তারা একে অপরকে বুঝতে শেখেন। কোনো বিষয় নিয়ে পরিকল্পনাও করেন একসঙ্গে। তাদের মধ্যে দীন ইসলাম পড়ালেখা করছেন দর্শন বিভাগে, চতুর্থ বর্ষে। তিনি জবি ডিবেটিং সোসাইটির প্রচার সম্পাদক ও বিতার্কিক হিসেবে পরিচিত। খাইরুল আনামও চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। খাইরুল বন্ধুদের কাছে কোচিং মাস্টার হিসেবে পরিচিত। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলার কোচিং সেন্টারে নিয়মিত কোচিং করান। আর আমি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে একই বর্ষে পড়ালেখা করছি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখালেখির পাশাপাশি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার ক্লাবের এক্সিকিউটিভ মেম্বার।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে তিনজনের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মিলে যাই আমরা বন্ধুত্বের বন্ধনে। গড়ে ওঠে ভালোবাসার প্রাচীর। অধিকাংশ সময়েই একই ফ্রেমে থাকি আমরা। কোথাও ঘুরতে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার কিংবা সেমিনার রুমে বসে গ্রুপ স্টাডি, চায়ের কাপে ঝড় তোলা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া, কিংবা ঢাকার বিভিন্ন মনোরম পরিবেশ ও ঐতিহ্যবাহী জায়গায় ভ্রমণ করা পছন্দের তালিকায় যুক্ত হতে থাকে।
খাইরুল বলেন, কয়েক দিন আগে বর্ষামুখর এক শুক্রবারে গ্রন্থাগারে পড়ার জন্য আমরা তিনজন এসেছিলাম। সেদিন কারোরই পড়াশোনার দিকে খেয়াল ছিল না। হুট করে ইচ্ছে জাগল, শেষ বিকালটা ক্যাম্পাস ছেড়ে দূরে কোথাও প্রাকৃতিক বাতাস ও নদীর ঢেউয়ের তালে নৌকায় দোল খাওয়ার। দীন ইসলামের মাথায় হঠাৎ এ পরিকল্পনাটা এলো যে, বুড়িগঙ্গায় ঘুরতে যাব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সদরঘাট। বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা নদী। দীন ইসলামের ইচ্ছে জাগল বুড়িগঙ্গায় নৌকার মাঝি বৈঠা বাইবে আর আমরা ঢেউয়ের তালে তালে পানি ছুঁব। শেষ বিকালে মনের তৃষ্ণা মেটাব। মনে প্রশান্তি আসবে। বিকালটা আরও সুন্দর কাটবে, স্মরণীয় হয়ে রইবে। আমরা তার কথায় সায় দিই। তিনজনে মিলে বুড়িগঙ্গায় ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করি।
জবি ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় গেট (ওয়াসি গেট নামে পরিচিত) দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য বুড়িগঙ্গায় নৌকাভ্রমণ। বর্ষার এ বুড়িগঙ্গা আর কয়েক দিন পরে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ সময়টাতেই লোকজনের ভিড় তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, কারণ এ সময়টাতে বুড়িগঙ্গা তার যৌবন ফিরে পায়।
ক্যাম্পাস থেকে বের হলেই মূল রাস্তা, যা বুড়িগঙ্গায় গিয়ে ঠেকেছে। পায়ে হাঁটার দূরত্ব কম। তাই তিন বন্ধু হেঁটেই রওয়ানা দিই। ফুটপাত ধরে চলতে চলতে নানা ধরনের মানুষের দেখা মেলে। অনেকের উদ্দেশ্য লঞ্চ টার্মিনাল। আশপাশে তাকানোর ফুরসত তাদের নেই বললেই চলে। সে জনস্রোতে মিশে আমরাও ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে চলি।
বুড়িগঙ্গা যেন তার হারানো যৌবন ফিরে পেয়েছে! নবরূপে হাজির হয়েছে সেদিন। বছরের পুরোটা সময় খুব ব্যস্ত থাকে সদরঘাটের এ টার্মিনাল, আজও এর ব্যতিক্রম নয়। বুড়িগঙ্গা যেন তার নামের সঙ্গে বড্ড বেমানান আজ!
বর্ষার আগেই আমরা এসেছি এখানে। তখনকার অনুভূতি আর সেদিনের অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা, মনোমুগ্ধকর। দেরি না করে সদরঘাট থেকে দাঁড় বাওয়া নৌকায় সওয়ার হলাম আমরা। মাঝি ঘাট ছাড়লেন। বর্ষায় নদীর রূপ অনেকটাই পাল্টে যায় অল্প সময়ের জন্য। আর এ সময়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আসেন বিকালবেলায় বুড়িগঙ্গায় ঘুরতে, বিকালের বুড়িগঙ্গা উপভোগ করতে।
দাঁড়ের টানে নৌকা এগিয়ে চলছে আর ঢেউয়ের তালে দুলছে। লঞ্চ টার্মিনাল ছেড়ে চলে যাচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। ঢেউ এসে নৌকায় লাগছে আর দুলছে ছোট্ট বোট।
বুড়িগঙ্গার ওপারেই কেরানিগঞ্জ। নদী পার হতে আমাদের বেশি সময় লাগেনি। নৌকা থেকে নামতে হলো আমাদের। পা রাখলাম কেরানিগঞ্জে। কংক্রিটের বাঁধাই করা অসংখ্য ভবন চোখে পড়ে। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদী। আমরা রাস্তা ধরে হেঁটে চলি কিছু দূর।
নদীর পাড় দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তায় বসেছে নানা রকমের খাবারের দোকানÑফুচকা,
বেলপুড়ি, হালিম, চায়ের দোকান প্রভৃতি। সবখানে গিজগিজ করছে মানুষ। এখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফেরার পথ ধরি।
ফেরার পথটুকু বেশি আনন্দময় ছিল। এবার সূর্য তার গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছে। এবার ও যথারীতি নৌকায় উঠে বসলাম। মনে হঠাৎ প্রশ্ন জাগেÑবুড়িগঙ্গার পানি এত স্বচ্ছ? কদিন আগেও দুর্গন্ধে মানুষ এর কাছে আসত না।
আর এখন! এ বর্ষায় মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসছেন এখানে। কংক্রিটের এ শহরে মানুষের বিনোদনের জায়গার বড় অভাব। তাই বর্ষার এ সময়টুকু এখানেই কাটাতে আসেন দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে। দলবেঁধে, বন্ধুদের সঙ্গে, কেউবা পরিবারের সঙ্গে আবার কেউ বা প্রেমিক-প্রেমিকা নিয়ে যুগলবন্দি হয়ে আসেন বুড়িগঙ্গার স্পর্শ পেতে।
আমরা তিনজন সিদ্ধান্ত নিলাম সূর্যাস্ত পর্যন্ত বুড়িগঙ্গায় নৌকায় থাকব। যে কথা সেই কাজ। আমাদের মতো অনেকেই নৌকায় বসে আড্ডা দিচ্ছেন। ছবি তুলছেন কেউ কেউ। হাত দিয়ে স্বচ্ছ ও নির্মল বুড়িগঙ্গার পানি কেউ ছুঁয়ে নিচ্ছেন। কেউবা মুখ ধুয়ে নিচ্ছেন। প্রেমিক-প্রেমিকারা নৌকায় বসে বিভিন্ন স্টাইলে ছবি তুলছেন।
আমরাও ছবি তোলার লোভটা সামলাতে পারলাম না। তিন বন্ধু মিলে ইচ্ছেমতো মনের খুশিতে নানা স্টাইলে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় নিজেদের বন্দি করি। সঙ্গে বুড়িগঙ্গার নয়নাভিরাম রূপও।
আমাদের মাঝি দাঁড় বেয়ে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত নৌকা নিয়ে যান। ততক্ষণে সূর্য ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমাকাশে। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। পড়ন্ত বিকালের শান্ত নদী, নৌকা চলছে অল্প স্রোতের তালে সদরঘাট টার্মিনালের দিকে। এ যেন যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে নিজেদের ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত।
পানির ছলছল শব্দ শুনতে শুনতে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পৌঁছাই। এরপর আমরা টার্মিনালের ইয়ার্ড বরাবর হেঁটে উঠে আসি মূল সড়কে। ক্যাম্পাস পর্যন্ত আসতে আসতে অনেক কথা হয় বুড়িগঙ্গা নিয়ে, আজকের এ স্মৃতি নিয়ে।
হয়তো একদিন আমরা তিন বন্ধু জীবিকার প্রয়োজনে দেশের তিন প্রান্তে চলে যাব, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ব, কিংবা নিজ পরিবারকে নিয়ে। তখন হয়তো চোখের সামনে ভেসে উঠবে আমাদের শেষ বিকালের বুড়িগঙ্গায় ভ্রমণের এ দিনটি। স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রবে স্মৃতিতে। হদয়ের মাঝে গেঁথে থাকবে। তখন হয়তো মনের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে, প্রিয় বন্ধুর মুখ চোখে ভাসবে।
দীন ইসলাম বলেন, আমাদের এ বন্ধন সবসময় একই ফ্রেমে থাকবেÑদূরে কোথাও গেলেও, আলাদা হলেও। চেষ্টা করব স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার। অবসরে এভাবে কোথাও বের হব। ভ্রমণ করব একসঙ্গে। একই বন্ধনে মিলিত হব বারবার।
কথা বলতে বলতে ক্যাম্পাসে এসে তিনজনে নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা করি।

আমজাদ হোসেন ফাহীম

সর্বশেষ..