প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ফণীতে ক্ষতিগ্রস্ত ৬৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ৩৫ জেলার প্রায় ৬৩ হাজার ৬৩ হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক। এসব ফসলের মধ্যে ধান, ভুট্টা, সবজি, পাট ও পান রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য ৩৮ কোটি ৫৪ লাখ দুই হাজার ৫০০ টাকা বলে জানান মন্ত্রী। গতকাল সচিবালয়ে ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। এদিকে ঘূর্ণিঝড় ফণীতে ২৪৩ স্থানে ৮৯ দশমিক ১২ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৩১। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সংগৃহীত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী এ ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে। ফসলের এই ক্ষতিতে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে জনিয়েছেন তিনি। কৃষিমন্ত্রী বলেন, আক্রান্ত ফসলি জমির মধ্যে বোরো ধান ৫৫ হাজার ৬০৯ হেক্টর, সবজি তিন হাজার ৬৬০ হেক্টর, ভুট্টা ৬৭৭ হেক্টর, পাট দুই হাজার ৩৮২ হেক্টর ও ৭৩৫ হেক্টর পান রয়েছে।
আক্রান্ত ৩৫ জেলা হচ্ছে: নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, গাইবান্ধা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, বরিশাল, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর।
ক্ষতির ধরন ও শতকরা হার তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, অধিকাংশ বোরো ধান হার্ড ডাফ ও পরিপক্ব অবস্থায় বাতাসে হেলে পড়েছে। যার দুই শতাংশ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। সবজির ক্ষেত্রে মাচা ভেঙে ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া বাতাসের কারণে শাকসবজি ক্ষতি হয়েছে, যার ৯ শতাংশ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, অধিকাংশ ভুট্টা মোচা অবস্থায় বাতাসে হেলে পড়েছে, এর ১৫ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। দমকা বাতাসে পাট হেলে বা ভেঙে পড়েছে, যা শতকরা হারে পাঁচ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া দমকা বাতাসে পানবরজ ভেঙে পড়েছে, যার এক শতাংশ ক্ষতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী।
ঘূর্ণিঝড় ফণী আসার আগে ও চলাকালীন কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধীন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম তুলে ধরেন আব্দুর রাজ্জাক। ফণী চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অঞ্চল, জেলা, উপজেলা ও ব্লক পর্যায় থেকে আক্রান্ত ফসলি জমির তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সময়ে যাতে আটকে যাওয়া পানি জমি থেকে দ্রুত নেমে যায়, সে জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। শতকরা ৮০ ভাগ পরিপক্ব অবস্থায় আছেÑএমন ধান কেটে ফেলা ও হেলে পড়া ধান দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আউশ ক্ষেতে গ্যাপ পূরণের জন্য ঘন গোছা থেকে চারা উত্তোলন করে ফাঁকা জায়গায় রোপণ, পানবরজের বেড়া নির্মাণ এবং লতা কাঠিতে তুলে দেওয়া, সবজি ক্ষেতে জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সবজি ক্ষেতের চালা বা মাচা মেরামতের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে সবজি বিষ কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নষ্ট হওয়া গাছের গোড়ায় নতুন চারা লাগিয়ে শূন্যস্থান পূরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে পরামর্শগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ তুলে ধরে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় বীজ, সার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হবে। পরবর্তী খরিপ ২০১৯-২০ মৌসুমে রোপা আমন ধানের বীজ বা চারা উৎপাদন ও বীজ বিতরণ কর্মসূচি গ্রহণ করার পরিকল্পনা আছে।
তিনি আরও বলেন, রবি ২০১৯-২০ মৌসুমে বিনামূল্যে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, সরষে, চীনাবাদাম, মুগ চাষের জন্য বীজ ও সার বিতরণের জন্য পুনর্বাসন কর্মসূচি নেওয়া হবে। এছাড়া শীতকালীন সবজি চাষের জন্য পারিবারিক পুষ্টির অংশ হিসেবে বিনামূল্যে বিভিন্ন সবজি বীজ বিতরণ কর্মসূচি নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ঘূর্ণিঝড় ফণী ভারতের ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে গত ৪ মে সকালে কিছুটা দুর্বল অবস্থায় খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ঢাকা-ফরিদপুর অঞ্চল পেরিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ এটি লঘুচাপে পরিণত হয়।
ফণী ধেয়ে আসার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ মে সকাল থেকে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে সাত নম্বর ও চট্টগ্রাম বন্দরে ছয় নম্বর বিপদসংকেত এবং কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে চার নম্বর স্থানীয় হুশিয়ারি সংকেত জারি করা হয়।
এদিকে গতকাল এক প্রতিবেদনে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, বরিশাল জোনের ছয় জেলার ২৩ স্থানে ১২ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার বাঁধ, খুলনা জোনের ছয় জেলায় ১৪৬ স্থানে ৫৪ দশমিক ৭০২ কিলোমিটার, ফরিদপুর জোনের একটি জেলার সাত স্থানে শূন্য দশমিক ৪৯২ কিলোমিটার, কুমিল্লা জোনের তিন জেলার ১৮ স্থানে দুই দশমিক শূন্য ৯ কিলোমিটার বাঁধ, চট্টগ্রাম জোনের তিন জেলার ৪৯ স্থানে ১৯ দশমিক ৭৭৭ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জোনে দুটি করে রেগুলেটরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারা দেশে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ নির্মাণের জন্য ২৫১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল জোনের জন্য ৯৯ কোটি ৮২ লাখ, খুলনার জন্য ৫৫ কোটি পাঁচ লাখ, কুমিল্লার জন্য ১৬ কোটি ৪২ লাখ, চট্টগ্রামের জন্য ৭৫ কোটি ৮০ লাখ, ফরিদপুরের জন্য চার কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..