দিনের খবর সারা বাংলা

ফসলের সঙ্গে মৌ-চাষে নতুন সম্ভাবনা সাতক্ষীরার অর্থনীতিতে

সৈয়দ মহিউদ্দীন হাশেমী, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরায় রবি মৌসুমে একই জমিতে সমন্বিত চাষ পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে সরষে ও মধু চাষ করে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। এ অঞ্চলে এখন দুই উপায়ে মধু উৎপাদিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। একটি হলো প্রাকৃতিকভাবে আহরিত মধু, আর অপরটি কৃষকপর্যায়ে চাষকৃত মধু। ফসলের পাশাপাশি মধু চাষ করে বাড়তি মুনাফা হওয়ায় আশা বাড়ছে কৃষকদের।

আবহমানকাল থেকে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশের নিজস্ব খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে মধু অন্যতম। দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে মধু গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হয়। কারণ মধু শর্করা জাতীয় খাদ্য হলেও বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন, এনজাইম ও খনিজ পদার্থ থাকে। এমনকি মধুকে সর্ব রোগের মহৌষধ বলা হয়। এতে প্রায় ৪৫টি খাদ্য উপাদান থাকে।

জানা গেছে, দেশে মধু উৎপাদনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে প্রায় ১৮ হাজার মৌ-চাষি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সারা দেশে মৌ-চাষের আওতায় জমির পরিমাণ প্রায় ৮৯ হাজার ৩৭ হেক্টর। এছাড়া বর্তমানে উৎপাদিত মধুর পরিমাণ প্রায় ৭০০-৮০০ মেট্রিক টন। সরষে ও মধু চাষ কৃষিকে বাণিজ্যকীকরণে ও বহুমুখীকরণে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উম্মোচন করেছে বলে এর সঙ্গে জড়িতরা বলছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে শস্য চক্র ও সময় বিবেচনা করে মধু উৎপাদন ৪০-৫০ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এ বছর সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সরষের চাষ হয়েছে। আর মধু আহরণের জন্য জেলায় এবার সরষের ক্ষেতের চারপাশে তিন হাজার মৌচাষি ১০ হাজারের বেশি মৌ-বক্স স্থাপন করেছেন। এবার মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার ৭০০ মেট্রিক টন।

কৃষকরা বলছেন, আগে ফলন নষ্ট হবে ভেবে তাদের আবাদি জমিতে মৌ-বাক্স বসাতে দিতেন না। অথচ মৌ-চাষের ফলে সরষের ফলন বাড়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। শুধু সরষেই নয়, মৌমাছি ফুলের পরাগায়ন ঘটিয়ে নানা ধরনের রবিশস্যের ফলন বাড়ায়। এর ফলে এখন কৃষকরা কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে আবাদি জমির পাশে মৌমাছির বাক্স স্থাপন করছেন।

তারান জানান, এখন মৌ-চাষের প্রতি বাক্স থেকে সপ্তাহে চার-পাঁচ কেজি মধু সংগ্রহ করা যায়। তবে অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে মধু সংগ্রহ বেশি হয়। ৩০টি বাক্সে ১২০ থেকে ১৫০ কেজি মধু সংগ্রহ করা যায়, যার বাজারমূল্য ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। সরষে ও মৌ সমন্বিত চাষের ফলে অনেকের কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সরষে উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে অল্প খরচে মৌ-চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন অনেক বেকার তরুণ।

সদর উপজেলার তালতলা মাগুরা এলাকার মৌ-চাষি মোশাররফ হোসেন ও মিলন সরদার বলেন, কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজেদের চেষ্টায় তারা মধুর চাষ শুরু করেছেন। তাদের সংগ্রহে ১৪০টি মৌমাছির বাক্স রয়েছে। এর মাধ্যমে তারা মৌসুমে সরষে, আম, কুল, লিচু ও কালো জিরার মধু সংগ্রহ করেন। এছাড়া মধু প্রক্রিয়াজাত করনের জন্য চীন থেকে মেশিন নিয়ে এসেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে  ভারতের  ডাবর কোম্পানি মধু সংগ্রহে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সরকারি সহযোগিতা পেলে আগামীতে বিদেশে রপ্তানি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। সরকারি উদ্যোগে চাষিদের প্রশিক্ষণ ও উৎপাদিত মধু বাজারজাত হলে যেমন আরও অধিক উৎপাদন সম্ভব হতো, তেমনি বাজারমূল্য আরও বেশি পেতাম।’ উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয় বলেও জানান তিনি।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, মৌ-চাষিদের মধু আহরণের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মধু সংরক্ষণের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও মধু সংগ্রহের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা জরুরি। এতে মৌ-চাষ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে তারা মনে করছেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..