দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক অনেক দ্রুত সেবা দিতে সক্ষম

মাসুমা সিদ্দিকা: সারা বিশ্বের প্রায় সর্বত্র এখন চলছে ‘ফোর-জি’ নেটওয়ার্কের রাজত্ব। এই ‘ফোর-জি’ নেটওয়ার্কের ফলে আমাদের জীবন যেমন অনেক গতিশীল হয়েছে, তেমনই হয়েছে আরামপ্রদ। কিন্তু মানুষ বরাবরই আরও নতুন কিছু, আরও ভালো কিছু করার নেশায় মত্ত থাকে, আর সেই উদ্ভাবনী নেশার ফলেই এখন চলে এসেছে ‘ফাইভ-জি’ নেটওয়ার্ক।  মানবসভ্যতার আধুনিক ইতিহাসে তিনটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবÑ১৭৮৪ সালের বাষ্পীয় ইঞ্জিন, ১৮৭০ সালের বিদ্যুৎ আবিষ্কার ও ১৯৬৯ সালের ইন্টারনেট আবিষ্কার অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে মানুষকে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এখন এই ফাইভ-জি নেটওয়ার্ককে অনেকে চতুর্থ বিপ্লব বলছেন। ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক নিঃসন্দেহে যেমন সবকিছু অনেক দ্রুত করবে, তেমনি এর কিছু খারাপ দিকও আছে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। 

পঞ্চম প্রজন্মের ওয়ারলেস সিস্টেম বা সংক্ষেপে ফাইভ-জি হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির ওয়ারলেস নেটওয়ার্ক, যার গতি প্রতি সেকেন্ডে ১০ গিগাবাইটও হতে পারে। ফাইভ-জি ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষকে অনেক বেশি কার্যকর সেবা দিতে সক্ষম, যা বর্তমানের তুলনায় অনেক গুণ দ্রুত। দ্রুত এই সংযোগের ফলে চালকহীন গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে,  শিল্প ক্ষেত্রেও বিপুল তথ্যের আদান-প্রদান সহজতর হবে, লাইভ ম্যাপ ও ট্রাফিক তথ্য জানা যাবে এবং দূরবর্তী চিকিৎসাসেবায় এই নেটওয়ার্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মোবাইল ফোনে যারা গেমস খেলেন, তারা আরও বেশি সুবিধা পাবেন। তারা অনেক তাড়াতাড়ি গেমস ডাউনলোড ও আপলোড করতে পারবেন এবং খেলতেও পারবেন অনেক স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আবার মোবাইল ফোনে ভিডিও কলে কথা বলার সময় ছবি দেখা আরও স্পষ্ট হবে। এছাড়া শরীরে লাগানো ফিটনেস ডিভাইসগুলো নিখুঁতভাবে সংকেত দিতে পারবে। ড্রোনের মাধ্যমে দুর্গম গবেষণা ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে অনায়াসেই। তাই সবকিছু মিলিয়ে তারবিহীন এই ইন্টারনেট সেবা বর্তমানের ফোর-জির তুলনায় অনেকাংশেই উন্নত ও আলাদা হবে।

ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। পৃথিবীর কিছু দেশে এরই মধ্যে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক চালু হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন ও সুইজারল্যান্ড। মোবাইল ফোন প্রযুক্তিতে যে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন ব্যবহার করা হয়, সেটির কারণে বিশেষ কয়েক ধরনের ক্যানসার হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার যৌথভাবে সব ধরনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশনকে শ্রেণিবিন্যাস করে বলেছে, এর মাধ্যমে ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে। (বিবিসি বাংলা, ১৬ জুলাই ২০১৯)।

স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে কিছু দেশে মানুষ বিক্ষোভ এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নাশকতাও করছেন। যেমনÑঅস্ট্রেলিয়ার মুলুমবিমবি শহরে একদল পরিবেশবাদী টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি টেলস্ট্রাকে এই ফাইভ-জি ব্যবহার করতে দিতে চায় না বলে বিক্ষোভ করে যাচ্ছে। তাদের কিছু মানুষ আবার মোবাইল টাওয়ারের পাশে অবস্থান নিয়েছেন এবং পালাক্রমে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পাহারা দিচ্ছেন, যেন কিছুতেই টাওয়ারে ফাইভ-জি সংযোগ দেওয়া না হয়। তারা মনে করছেন, এই ফাইভ-জি ব্যবহার মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। যুক্তরাষ্ট্রের ও ইউরোপের কিছু শহরে সম্ভাব্য ফাইভ-জি স্থাপনার ওপরে ছোটখাটো নাশকতামূলক হামলাও হয়েছে। অনেক প্রযুক্তিবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক বিষয়টির ক্ষেত্রে  শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে এর পেছনে শত্রু রাষ্ট্রের দুরভিসন্ধিমূলক প্রোপাগাণ্ডাকে দায়ী করছেন, যার পেছনের উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন পশ্চিমা রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষকে ব্যাহত করা। 

এ বিষয়ে আরেকটি উদ্বেগ ও বিরোধ রয়েছে চীনের প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়েকে নিয়ে। হুয়াওয়ের ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র কিছু রাষ্ট্র, যেমন যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার সরকার মনে করে, চীনের কাছে তাদের গোপনীয় তথ্য পাচার হতে পারে এবং হুয়াওয়ের ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে চীন তাদের ওপর কর্তৃত্ব করবে। ভবিষ্যৎ পৃথিবী নিয়ন্ত্রিত হতে যাচ্ছে ডেটা বা তথ্যের ভিত্তিতে। আর এই ডেটাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার কাঠামোগত কৌশল নিহিত আছে এই ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের ওপর। আর তাই যার কাছে যত বেশি ডেটা বা তথ্য থাকবে, তারাই পৃথিবী শাসন করবে এবং এই ব্যাপারে যে শক্তিশালী দেশগুলো কর্তৃত্ব করে আসছে, তারা তো অন্য কাউকে কর্তৃত্ব করতে দিতে চাইবে না। আর তাই যুক্তরাষ্ট্র চীনের এই হুয়াওয়ের ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহারে চরম সংবেদনশীল। তারা চায় নিজেরাই একটা নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফাইভ-জি ব্যবহার করতে। তথ্য পাচার ছাড়াও এই দেশগুলোর নেতারা মনে করেন, যদি তাদের দেশের সঙ্গে চীনের কোনো ব্যাপক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়, তবে চীন হুয়াওয়েকে বাধ্য করবে চীনের সরকারকে অনেক সংবেদনশীল তথ্য সরবরাহ করতে। তাই এরকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে তারা চীনা কোম্পানির  ওপর নির্ভরশীল থাকতে রাজি নয়। 

বাংলাদেশেও ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি মনে করেন দেশে শিক্ষা, শিল্প, ব্যবসা ও কৃষিসহ সব ক্ষেত্রে সাহায্য করবে এই ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক। ২০১৯ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) আয়োজিত এক সেমিনারে বলা হয়, ২০২১ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে ফাইভ-জি চালু করা হবে। বেসরকারি মোবাইল অপারেটর রবি এরই মধ্যে এই সেবা দেওয়ার ব্যাপারে একটি পরীক্ষাও সম্পন্ন করেছে। বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে এই ফাইভ-জির হাত ধরে, আমাদেরও এটা থেকে পিছিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। আর সেজন্য আমাদের নতুন তরঙ্গ কেনাসহ যথেষ্ট বিনিয়োগ দরকার। বিনিয়োগ যথেষ্ট পরিমাণ না হলে গ্রাহকসেবা বাড়বে না এই ফাইভ-জি নেটওয়ার্কে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের জাতির নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষÑএই তিনটি বিষয় মাথায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে বাংলাদেশে এই ফাইভ-জি চালু করার জন্য আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন দরকার। দেশে ২০২৩ সালের মধ্যে ফাইভ-জি চালু করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে ইন্টারনেট প্রযুক্তি নিয়ে যারা কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞদের মনে যথেষ্ট সংশয় আছে। কারণ ২০০১ সালে যেখানে সারা বিশ্বে থ্রি-জি সেবা চালু হয়, সেখানে বাংলাদেশে হয় ২০১২ সালে। ২০০৬ সালে চালু হওয়া ফোর-জি সেবা আমরা পাই ১২ বছর পর ২০১৮ সালে এবং সেটি পুরো দেশে এখনও সার্বিকভাবে কার্যকর করা সম্ভবপর হয়নি। তাই এই উন্নত ফাইভ-জি ইন্টারনেট আমরা খুব শিগগির যে পাব, এমনটা আশা করা দুরাশাই।

রন্ধনশিল্পী ও ফ্রিল্যান্স লেখক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..