দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ফারমার্স ব্যাংক:বাবুল চিশতীসহ আটজনের বিরুদ্ধে নতুন মামলা হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: ফারমার্স ব্যাংকে (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক) জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকটির নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতীর বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল নতুন করে ওই মামলার অনুমোদন দেয় সংস্থাটি। ফারমার্স ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনায় দুদকের পক্ষ থেকে এর আগেও পাঁচটি মামলা করা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, অনুমোদন হওয়া মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ৮৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা হচ্ছে, সুদসহ যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকায়। মামলায় ওই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হচ্ছে। ওই মামলায় ফারমার্স ব্যাংকের নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী, তার ভাই মাজেদুল হক ওরফে শামীম চিশতী, ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম এম শামীম, শাবাবা অ্যাপারেলসের মালিক মো. আবদুল ওয়াদুদ ওরফে কামরুল, এডিএম ডায়িং অ্যান্ড ওয়াশিংয়ের মালিক রাশেদ আলী, তনুজ করপোরেশনের মালিক মো. মেফতাহ ফেরদৌস, মোহাম্মদ আলী ট্রান্সপোর্টের মালিক মো. গোলাম সারোয়ার ও ক্যানাম প্রোডাক্টসের মালিক ইসমাইল হাওলাদারকে আসামি করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাহবুবুল হক চিশতীর ভাই মাজেদুল হক চিশতী তার কর্মচারী আবদুল ওয়াদুদকে মালিক সাজিয়ে শাবাবা অ্যাপারেলস নামে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। প্রতিষ্ঠানটি ফারমার্স ব্যাংক থেকে ১৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা ফান্ডেড ঋণ সুবিধা নেয়। এছাড়া ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপকের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নন-ফান্ডেড ১৫ কোটি টাকা সুবিধার পরিবর্তে ৩৯ কোটি ৯ লাখ টাকার ঋণসুবিধা দেওয়া হয়, যা সর্বশেষ সুদ ও আসল মিলিয়ে ৪৫ কোটি পাঁচ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাংকটির সাবেক এমডি কোনো ব্যবস্থা নেননি। আর ব্যাংকের প্রভাবশালী পরিচালক মাহবুবুল হক চিশতী তার ভাইয়ের মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছেন। একইভাবে মাজেদুল হক চিশতী আরেক কর্মচারী রাশেদ আলীকে মালিক দেখিয়ে এডিএম ডায়িং নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এর মাধ্যমে ১৭ কোটি টাকা ঋণসুবিধার পরিবর্তে ৫৫ কোটি পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নেন।

জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মাজেদুল হক চিশতীকে তাগাদা দিলে তিনি পরিশোধের অঙ্গীকার করেন, কিন্তু আর ঋণ পরে পরিশোধ করেননি। মাহবুবুল হক চিশতী অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকিং নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে নিজের ভাইকে অর্থ আত্মসাতে সহায়তা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে ফারমার্সের নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতীর স্ত্রী ও ছেলের পাঁচটি ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে দুদক। মাহবুবুল হক চিশতীর ছেলে রাশেদুল হক চিশতীর মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের বনানী শাখায় আরসিএল প্লাস্টিকস, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বকশীগঞ্জ শাখায় বকশীগঞ্জ জুট স্পিনার্স, ডাচ্?-বাংলা ব্যাংকের পল্লবী শাখায় আরসিএল প্লাস্টিকস ও যমুনা ব্যাংকের গুলশান শাখায় ফিউশন ফুটওয়্যারসের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। এর বাইরে রাশেদুল হক চিশতী ও তার মা রোজী চিশতীর যমুনা ব্যাংকের মহাখালী শাখায় বকশীগঞ্জ জুট স্পিনার্সের একটি এবং বকশীগঞ্জ জুট স্পিনার্সের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সাইফুল ইসলাম মাতব্বরের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বকশীগঞ্জ শাখার হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে।

এর আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ ইমরুল কায়েশের আদালতে এ বিষয়ে আবেদন করেন দুদকের উপ-পরিচালক সামছুল আলম। আবেদনে ‘ফারমার্স ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ব্যাংকিং নিয়ম লঙ্ঘন করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে। সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোতে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব হিসাব থেকে টাকা বেরিয়ে গেলে অনুসন্ধান কাজ ব্যাহত হবে,’ তাই এসব হিসাব ফ্রিজ করা জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক মোট ছয়টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার আদেশ দেন।

২০১৭ সাল থেকে ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির অনুসন্ধান চলছে। এর আগে পাঁচটি মামলা করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল করা একটি মামলায় অভিযোগপত্রও দিয়েছে সংস্থাটি। ওই অভিযোগপত্রে মাহবুবুল হক চিশতী (বাবুল চিশতী), মাহবুবুল হক চিশতীর স্ত্রী রোজী চিশতী, ছেলে রাশেদুল হক চিশতী, ফারমার্স ব্যাংকের চাকরিচ্যুত এসভিপি জিয়া উদ্দিন আহমেদ ও চাকরিচ্যুত ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মাসুদুর রহমান খানকে আসামি করা হয়েছে। অনুসন্ধানকালে ফারমার্স ব্যাংকের ঋণের নথিপত্র ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং মাহবুবুল হক চিশতী গ্রাহকের ঋণের ভাগ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে দুজনের নৈতিক স্খলন ঘটেছে ও তারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১২ সালে অনুমোদন পাওয়া ফারমার্স ব্যাংক যাত্রা শুরুর পরই নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। জালিয়াতির তথ্য ফাঁসের পর আস্থা সংকটের মুখে আমানতকারীদের টাকা তোলার চাপ বেড়ে যায়। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও মাহবুবুল হক চিশতী পদ ছাড়তে বাধ্য হন। এর পর থেকে জালিয়াতির ঘটনায় মাহবুবুল হক চিশতীসহ সংশ্লিষ্টরা অনুসন্ধান-মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন।

সর্বশেষ..