দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ফার্মেসি ও অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে নেই

করোনায় চিকিৎসক ও রোগীর দূরত্ব সৃষ্টি

আয়নাল হোসেন: করোনায় স্বস্তিতে নেই ফার্মেসি ও অস্ত্রোপচার-সংশ্লিষ্ট পণ্য ব্যবসায়ীরা। করোনাভাইরাসের কারণে চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়া এবং মানুষের আয় কমে যাওয়ায় সার্জিক্যাল ও ফার্মেসিতে বিক্রি অর্ধেকে নেমে গেছে। সার্জিক্যাল ও ফার্মেসি মালিক ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

পক্ষান্তরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও শহরের পাড়া-মহল্লার ফার্মেসিতে কিছু ওষুধ ও সার্জিক্যাল আইটেম অস্বাভাবিক দামে বিক্রি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে করোনাভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। এর পর থেকে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়াও চিকিৎসকদের প্রাইভেট চেম্বার পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। এতে জরুরি কয়েকটি ওষুধ ও সার্জিক্যাল কয়েকটি পণ্য ছাড়া অন্যান্য ব্যবসায় ধস নামে। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোয় রোগীর অপারেশন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ফলে এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা চরম সংকটে পড়েন। এ সময় মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হ্যান্ডস গ্লাভস ও পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুপমেন্ট (পিপিই) ব্যবসা তুঙ্গে ওঠে। এ সময় ফার্মেসি ও সার্জিক্যাল মালিকরাও নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কভিড-১৯-সংশ্লিষ্ট পণ্য রাখা শুরু করেন। এ সময় কয়েকটি ওষুধ ভালো বিক্রি হয়েছে। এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা কয়েকগুণ বেশি দামে তা রোগীর কাছে বিক্রি করেছেন। তবে রোগীর ব্যবস্থাপত্র কমে যাওয়ায় এবং মানুষের আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় ওষুধ কেনা অনেকটা কমে যায়। এখন রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। ফার্মেসি ও সার্জিক্যাল ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের সার্জিক্যাল পণ্য বেশিরভাগ আমদানি হয় চীন থেকে। গত বছর চীনে করোনাভাইরাস দেখা দেওয়ায় চীনা নাগরিকরা বাংলাদেশ থেকে মাস্ক কেনা শুরু করেন। আর এতে রাতারাতি বেড়ে যায় মাস্কের মূল্য। মাত্র পাঁচ টাকার সার্জিক্যাল মাস্ক বিক্রি হয় ৪০-৫০ টাকায় পর্যন্ত। আর ২৫-৩০ টাকার মূল্যের ফিল্টার মাস্ক বিক্রি হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। তখন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর পাঁচ টাকার সার্জিক্যাল মাস্কটির মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। এ সময় চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, পিপিই ও গ্লাভস ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দামও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। এ সময় কয়েকটি ওষুধের দামও রাতারাতি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সার্জিক্যাল-সংশ্লিষ্ট না হলেও অনেকেই মাস্ক ও গ্লাভস আমদানি শুরু করেন। বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির কারণে এখন সার্জিক্যাল মাস্ক দুই টাকায় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোকাল হেলথ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে গত বছর বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে ১২ হাজার ৯৭২টি এবং ছোট ১৩ হাজার ১৭৩টি। আর চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে দুই হাজার ৪১৪টি এবং ছোট অস্ত্রোপচার চার হাজার ৪৫৫টি। গত বছর বহির্বিভাগে রোগী এসেছিলেন আট লাখ ৭৩৬ জন এবং চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত তিন লাখ সাত হাজার ২২৩ জন। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত বছর অস্ত্রোপচার হয়েছে বড় ১০ হাজার ৮১২টি এবং ছোট ১৪ হাজার ৬৬৩টি। আর চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত অস্ত্রোপচার হয়েছে বড় চার হাজার ২৬৮টি এবং ছোট ছয় হাজার ৩৮৪টি। গত বছর বহির্বিভাগে রোগী এসেছিলেন চার লাখ ৬৮ হাজার ৭৫০ জন এবং চলতি বছর আগষ্ট পর্যন্ত এক লাখ ৪১ হাজার ৪৯৭ জন। অন্যান্য হাসপাতালের চিত্রও প্রায় একই ধরনের।

এদিকে রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ড ও বাবুবাজার এলাকার একমাত্র মডেল ফার্মেসি আলিফ-লাম-মিম। ওই প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর তাদের ব্যবসা অর্ধেকে নেমে গেছে। এলাকার ওষুধ ব্যবসায়ী খলিল আহমেদ জানান, করোনাভাইরাসের আগে তার দোকানে বিক্রি হতো দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। বর্তমানে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকাও বিক্রি করা যাচ্ছে না। অনেক দিনই বিক্রি ছাড়া দোকান চালু রাখতে হয়েছে।

সার্জিক্যাল পণ্য আমদানিকারক মিটফোর্ড এলাকার আবুল হোসেন জানান, কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর হাসপাতালে সার্জারি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। আর এতে সার্জারিসংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রেতাদের ব্যবসা ৭০ শতাংশ কমে যায়। তবে এখন কিছু কিছু সার্জারি রোগী ভর্তি করানো হচ্ছে। তাদের ব্যবসা কিছুটা উন্নতির দিকে যাচ্ছে।  

এই এলাকার ওষুধ ব্যবসায়ী কবির হোসেন জানান, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খুবই খারাপ। বর্তমানে প্রাইভেট চেম্বারগুলোয় রোগীর সংখ্যা কমে গেছে। পুরনো প্রেসক্রিপশন থাকলেও মানুষের আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় অনেকেই ওষুধ কম ব্যবহার করছেন। এতে তাদের বেচা-বিক্রি অর্ধেকে নেমেছে।

একই এলাকার হাসপাতালের নিচতলায় অবস্থিত মেসার্স এমএস ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী আবুল হোসেন সেন্টু জানান, করোনাভাইরাস দেশে শনাক্ত হওয়ার পর ছয় মাস ওষুধ ব্যবসা খুবই খারাপ ছিল। বর্তমানে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এটাকে ধরে রাখা গেলে সমস্যা হবে না।

বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাবেক পরিচালক জাকির হোসেন রনি শেয়ার বিজকে বলেন, করোনাভাইরাসে সবচেয়ে ভালো আছেন সার্জিক্যাল ব্যবসায়ীরা। মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হ্যান্ডস গ্লাভস ও পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) ব্যবসা ভালো গেছে। ওষুধ কোম্পানিগুলোরও অবস্থা ভালো গেছে। কিন্তু ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা (যারা শুধু ওষুধ) ভালো নেই। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দোকান চালু রাখতে গিয়ে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৫ জনের মতো ফার্মেসি মালিক মারা গেছেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..