প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ডিভিডেন্ড জালিয়াতি:শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

নাজমুল ইসলাম ফারুক: ডিভিডেন্ড ঘোষণায় জালিয়াতির অভিযোগে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ফাইন্যান্সকে কারণ দর্শাও নোটিস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোম্পানির পক্ষ থেকে ২০১৬ সালের ডিভিডেন্ড ঘোষণায় প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ায় কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিবÑএ তিন কর্মকর্তাকে দায়ী করে সাত দিনের মধ্যে নোটিসের জবাব দিতে বলা হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে ফার্স্ট ফাইন্যান্সের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়, ফার্স্ট ফাইন্যান্স তাদের নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণীতে মেয়াদি আমানত ৫৫২ কোটি ৮৪ লাখ ৩১ হাজার টাকার বিপরীতে সুদ প্রদানযোগ্য খাতে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। কিন্তু অ্যাকাউন্টিংয়ের বেসিক মান অনুসরণ করা হলে এ খাতে রক্ষিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ আলোচ্য খাতে ২৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা ঘাটতি রয়েছে। রিটার্ন আর্নিং বাড়ানোর লক্ষ্যে এরূপ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ফার্স্ট ফাইন্যান্স ইন্টারন্যাশানাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (আইএএস) ও বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডের (বিএএস) আর্টিকেল ২৭ লঙ্ঘন করেছে। পাশাপাশি রিটার্ন আর্নিংস নেগেটিভ হওয়ার পরও পাঁচ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড প্রদান করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩-এর ১০ লঙ্ঘন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে নিয়ম ভঙ্গ করে কোম্পানিটি ১৯৯৩ সালের আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা, আইএএস, বিএএস হিসাব মান লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মাধ্যমে আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণœ করা হয়েছে। একই সঙ্গে করপোরেট সুশাসনও বাধাগ্রস্ত করেছে। আর এসব কারণে কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শোকজ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিরীক্ষিত ব্যালান্স শিট ও লাভ-ক্ষতির হিসাব বিবরণীতে রিটার্ন আর্নিং ও নিট মুনাফা যথাক্রমে ছয় কোটি ৩৬ লাখ ৪৮ হাজার টাকা এবং পাঁচ কোটি এক লাখ ২৪ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। কিন্তু অ্যানালাইসিস ফর প্রভিশন অব ইন্টারেস্ট এক্সপেন্সের সঙ্গে দেওয়া লাভ-ক্ষতির হিসাব বিবরণীতে আলোচিত খাতের প্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ যথাক্রমে দুই কোটি ৪৭ লাখ ২১ হাজার টাকা এবং পাঁচ কোটি ১৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটির রিটার্ন আর্নিং ঋণাত্মক।

চিঠিতে আরও বলা হয়, এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী নন পারফর্মিং লোন ১০ শতাংশ বা তার বেশি হলে ডিভিডেন্ড ঘোষণার পূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি নিতে হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির এ লোনের পরিমাণ ৩৩ শতাংশের বেশি তবুও ডিভিডেন্ড ঘোষণা করার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তি নেওয়া হয়নি, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘন। কোম্পানিটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রভিশন সংরক্ষণ করেনি। প্রভিশন সংরক্ষণ না করে জালিয়াতির মাধ্যমে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও মুনাফা বেশি দেখিয়েছে।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদ মুরাদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নোটিস পেয়েছি। শর্টফল থাকার পরও লভ্যাংশ ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে নোটিসের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হয়েছে। আমরা নোটিসের জবাব দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের প্রভিশন ঘাটতিজনিত বিষয়ে শর্ত জুড়ে দিয়েছে। শর্ত সাপেক্ষে পাঁচ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদানে অনাপত্তিপত্রও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ শতাংশ ডিভিডেন্ড প্রদানে অনাপত্তি দিলেও আগামী তিন বছরে ২৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা প্রভিশন সংরক্ষণের শর্ত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে গত ২ জুন থেকে বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডের আর্টিকেল ২৭-এর নির্দেশনানুযায়ী বেসিস অব অ্যাকাউন্টিং অনুসরণ করে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ৯ মে ‘ফার্স্ট ফাইন্যান্সের মুনাফা জালিয়াতি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক শেয়ার বিজ। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে- ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ৭০ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। এ প্রভিশন ঘাটতির বিপরীতে সঞ্চিতি না রেখে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা দেখিয়েছে। নানা ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে তথ্য গোপন করে তারা পাঁচ শতাংশ  বোনাস ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। কেবল শেয়ারের দর বৃদ্ধির জন্য কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ অত্যন্ত কৌশলে এটি করেছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষক আপত্তি জানিয়েছেন। এ প্রতিবেদনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে তদন্ত করে এবং তদন্তে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে। তারই ফলে ব্যাংকের শীর্ষ তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শাও নোটিস জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।