দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ফিশ ফিড ঘোষণায় শূকরজাত পণ্য এনেও খালাসে চাপ

রহমত রহমান: দীর্ঘদিন ধরে শূকরের মাংস, বর্জ্য ও হাড়যুক্ত মিট অ্যান্ড বোন মিল (এমবিএম) ফিশ ফিড হিসেবে আমদানি হচ্ছে। এসব খাদ্যে মুরগি ও মাছ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। সেই মুরগি আর মাছ খেয়ে ঝুঁকিতে পড়ছে মানবস্বাস্থ্য। ফিশ ফিডে শুল্ককর নেই। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমদানি নিষিদ্ধ ও ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা থাকা এমবিএম দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ২০১৯ সালে প্রায় শতাধিক কন্টেইনার আটক করেছে। ফলে চট্টগ্রাম কাস্টমস দিয়ে ফিশ ফিডের নামে এই মানবস্বাস্থ্য-বিধ্বংসী পণ্য আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায়

যদিও অসাধু আমদানিকারকরা বসে নেই। চট্টগ্রাম ছেড়ে এবার অন্য কাস্টম হাউস দিয়ে আমদানির চেষ্টা করছে। এর মধ্যে মিশাম এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে একটি আমদানিকারকের শূকরবর্জ্যযুক্ত মৎস্য খাদ্যের চালান আটক করেছে রাজধানীর অদূরে পানগাঁও কাস্টম হাউস। দুটি আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবে নমুনার রাসায়নিক পরীক্ষায় খাদ্যে এমবিএম পাওয়া গেছে। তবে আটক করে বেকায়দায় পড়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। এমবিএম থাকার পরও আমদানিকারক চালানটি ছাড় করাতে নানাভাবে তদবির করছেন। ব্যর্থ হয়ে এনবিআরসহ নানা জায়গায় কর্মকর্তাদের নামে দেওয়া হচ্ছে অভিযোগ। নমুনায় এমবিএম পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি ও শুনানি নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মকাণ্ড এনবিআরকে অবহিত করেছে পানগাঁও কাস্টমস। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্রমতে, একই প্রতিষ্ঠানের একই ক্যাটেগরির তিনটি চালান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস আটক করেছে, যা এক বছরের বেশি সময় ধরে আটকে আছে। তিন চালানেও ফিশ ফিড ঘোষণায় এমবিএম আমদানি করা হয়েছে। নমুনা সরকারি কয়েকটি ল্যাবে পরীক্ষায় এমবিএম পাওয়ায় আমদানিকারককে এক বছর আগে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান কোনো জবাবে দেয়নি। এ আমদানিকারক চট্টগ্রাম কাস্টমস দিয়ে সুবিধা করতে না পেরে পানগাঁও কাস্টমস দিয়ে আমদানির চেষ্টা করে শেষমেষ ব্যর্থ হয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠানটি এমবিএম আমদানির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। 

সূত্র জানায়, সিরাজগঞ্জের প্রতিষ্ঠান মিশাম এগ্রো ভিয়েতনাম থেকে ‘ফিশ ফিড’ ঘোষণায় ২০১৯ সালের ১১ মে এক লাখ ৫১ হাজার ২০০ কেজি ওজনের একটি পণ্য চালান পানগাঁও বন্দর দিয়ে আমদানি করে। পণ্য চালানটি খালাসের জন্য মর্নিং স্টার ইন্টারন্যাশনাল নামে সিঅ্যান্ডএফের মাধ্যমে একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। সিঅ্যান্ডএফ ও আমদানিকারকের সহযোগিতায় জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ওই বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর কাস্টমস কর্মকর্তারা চালানটি কায়িক পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পণ্য চালানটি ফিশ ফিড কি না, বা তাতে কোনো ক্ষতিকর উপাদান আছে কি না, তা রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে এবং পণ্যগুলো বাল্ক আকারে থাকায় পরীক্ষার সময় ওজন নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে খালাসকালে ওজন নিশ্চিত সাপেক্ষে শুল্কায়ন ও ছাড়যোগ্য মর্মে বিবেচিত হবে।’ প্রতিবেদনের মন্তব্য এবং ফিশ ফিড ঘোষণায় আমদানি করা বলে আমদানি নীতি ২০১৫-২০১৮-এর অনুচ্ছেদ ১৭(৪)-এর শর্ত অনুযায়ী চালানটিতে থাকা ‘উপাদান’ নিশ্চিত হতে রাসায়নিক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী চালানটিতে ফিশ ফিডের নমুনায় লেড, ক্রোমিয়াম ও মেলামাইনের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়। কমিশনের রিপোর্টে নমুনায় লেড ও ক্রোমিয়াম নেই বলে উল্লেখ করা হয়।

নমুনায় ফক্সিমেট কম্পোজিশন (পুষ্টিমান) কত, ক্লোরোমফেনিকল, অ্যান্টিবায়োটিক, শূকরের বর্জ্য ও হাড়যুক্ত (বোভাইন ও প্রসিন) মিট অ্যান্ড বোন মিল (এমবিএম) নিশ্চিত করতে নমুনা সাভারের মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। এ ল্যাবরেটরি থেকে ৫ নভেম্বর জানানো হয়, নমুনায় ক্লোরামফেনিকল নেই, তবে এমবিএম রয়েছে। আরও নিশ্চিত হতে নমুনা সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। এ ল্যাবরেটরি থেকে ৩ নভেম্বর জানানো হয়, ফিশ ফিডের নমুনায় এমবিএম রয়েছে। এছাড়া নমুনা আইসিডিডিআর’বিতে পাঠানো হলেও ফলাফল পাওয়া যায়নি।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মানের দুটি ল্যাবে রাসায়নিক পরীক্ষা এমবিএম পাওয়ায় নড়েচড়ে বসে কাস্টমস। এর মধ্যে পণ্য ছাড় করাতে আমদানিকারক বিভিন্ন জায়গায় তদবির শুরু করেন। পানগাঁও কাস্টমস দুটি ল্যাবের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে মতামত দিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য অধিদপ্তরকে চিঠি দেয়। মৎস্য ও পশু খাদ্য খালাসের লক্ষ্যে বিদ্যমান আইন ও বিধির আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে মতামত দেওয়া হয়।

পানগাঁও কাস্টমসে দাখিল করা বিল অব এন্ট্রি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পণ্য চালানটির এলসির একটি অংশ চট্টগ্রামে আটক, অপর অংশটি পানগাঁওয়ে। চালানটি চট্টগ্রামে খালাসযোগ্য। কিন্তু প্রোফরমা ইনভয়েস ও এলসিতে সংশোধনী না এনেই চট্টগ্রামের পরিবর্তে পানগাঁও দিয়ে খালাসের চেষ্টা করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের চিঠি অনুযায়ী চালানটি আমদানিকারকের আবেদন মোতাবেক চট্টগ্রাম দিয়ে ছাড় করার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই এ কাস্টম হাউসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দৈনিক শেয়ার বিজ পত্রিকায় ৫ জুলাই মিশাম এগ্রোর প্রিন্ট নিউজ কপি

এনবিআর সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটি মিথ্যা ঘোষণায় নিষিদ্ধ এমবিএম আমদানি করায় ১০ জুন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কারণ দর্শানোর নোটিস এবং ব্যক্তিগত শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুম মিয়া শুনানিতে হাজির হয়ে কমিশনার ইসমাইল হোসেন সিরাজীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি দুটি ল্যাবের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে অন্য ল্যাবে নমুনা পরীক্ষার দাবি করেছেন।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুম মিয়া এমবিএম আমদানির বিষয়টি অস্বীকার করে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি তো এনেছি ফিশ ফিড। এমবিএম কি না, তা তো পরীক্ষাই বলবে।’ দুটি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষায় এমবিএম পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি যেখানে সচরাচর পরীক্ষা হয়, সেখানে পরীক্ষা করেন।’ তিনি বলেন, এটা আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য নয়। কাস্টমস জোর করে বলছে। কিন্তু আইনে তো তা বলে না। পরীক্ষা পদ্ধতিই ভুল। পরীক্ষা হয়নি, এমন দাবি করছেন কি নাÑএর জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ। ফিশ ফিডে তো এমবিএম থাকতেই পারে।’

একই অভিযোগে চট্টগ্রামে তিনটি চালান আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে অনেক পণ্য আমরা নিয়ে এসেছি। চট্টগ্রামে কী হয়েছে, তা আমি অবগত নই।’ সেখানকার কারণ দর্শানোর নোটিশের বিষয় তিনি অস্বীকার করেন। তদবির, কর্মকর্তাদের নামে এনবিআরকে চিঠি দেওয়া ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এনবিআরকে আমি একটা চিঠি দিয়েছিÑকেন আমার পণ্য ৯ মাস আটকে রাখল। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়, পানগাঁও কাস্টমসের বিরুদ্ধে।’

এ বিষয়ে পানগাঁও কাস্টম হাউস কমিশনার ইসমাইল হোসেন সিরাজী শেয়ার বিজকে বলেন, কাস্টমস আইন, আমদানি নীতি ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে। রাসায়নিক পরীক্ষায় শূকরজাত দ্রব্য পাওয়া গেছে। আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখার চেষ্টা করেছি। আইনের বাইরে তো আমরা কিছু করতে পারি না। এর পরও আমদানিকারক অন্যায়ভাবে আমাদের চাপ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, একই আমদানিকারকের তিনটি চালান চট্টগ্রামে আটক। তাতে শূকরজাত দ্রব্য পাওয়া গেছে। একই এলসির একটি অংশের চালান চট্টগ্রামে আটক, অপর অংশ আমরা আটক করেছি। এরপরও শুনানিতে আমদানিকারক রি-টেস্ট চেয়েছেন। বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..