প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ফি কমিয়ে বন্ডের মুনাফা বাড়ানোর সুপারিশ

শেখ শাফায়াত হোসেন:বন্ড মার্কেটে গতি এনে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ এবং বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য বন্ড থেকে মুনাফা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ফি ও চার্জ কমিয়ে বন্ড ইস্যু ও লেনদেনের খরচ কমানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বন্ডের মুনাফা এক শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

বর্তমানে প্রাইমারি মার্কেটে বন্ড ইস্যু ও সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনেদেনে ইস্যুয়ার এবং বিনিয়োগকারীদের উচ্চ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের খরচ ও শুল্কের কারণে বন্ড ইস্যু এবং কেনাবেচার খরচ বাড়ছে। ইস্যুর ক্ষেত্রে রয়েছে আবেদন ফি, অনুমোদন ফি, ইস্যু ব্যবস্থাপনা ফি, আন্ডাররাইটিং (অবলেখন) ফি, ট্রাস্টি ফি, ট্রাস্ট চুক্তি নিবন্ধন ফি ও ক্রেডিট রেটিং ফি প্রভৃতি খরচের বড় খাত। তাছাড়া বন্ড কেনাবেচায় গণপ্রস্তাব-সম্পর্কিত ডিম্যাট ফি, বার্ষিক ডিপজিটরি বা লিস্টিং ফি, লেনদেন ফি ও নতুন ইস্যু ফি-সহ বেশকিছু ব্যয়ের খাত রয়েছে। এসব চার্জ ও ফি মিলিয়ে ইস্যুকৃত বন্ডের প্রায় ছয় শতাংশ খরচ পড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি উদাহরণ দিয়ে বলছে, যদি কোনো ইস্যুয়ার ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করতে চায়, তাহলে তার খরচ পড়ে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। লেনদেনের ওপর শুল্ক ও কর রয়েছে। কুপন কর ও লভ্যাংশ প্রাপ্তির ওপর অর্জিত কর রয়েছে। এই খরচ বন্ড ইস্যু ও কেনাবেচাকে নিরুৎসাহিত করে। তাছাড়া ইস্যুর খরচ বন্ডের প্রকৃত সুদের এক শতাংশ কমিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বন্ড কেনাবেচায় লেনদেনের অঙ্ক অনেক বড়। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শেয়ার বা ইক্যুয়িটি ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে যে ধরনের শুল্ককর আদায় করে, বন্ডের কেনাবেচায় একই ধরনের শুল্ককর আরোপ করা হয়েছে। এতে বন্ডের ক্ষেত্রে করের ওই হার অনেক বেশি। পুঁজিবাজারে সরকারি সিকিউরিটিজ কেনাবেচার ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই অগ্রিম আয়কর বাবদ শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ কর দিতে হয়, যা বাতিল করা দরকার বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।  

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে প্রণীত ‘বাংলাদেশের বন্ড মার্কেট উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। বন্ডের খরচ কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ, বন্ড ইস্যু ও কেনাবেচার খরচ কমিয়ে বন্ড ইস্যু উৎসাহিত করা যায়। তাছাড়া সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি সিস্টেম চার্জও কমানো দরকার বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, পাবলিক ইস্যুর আবেদন ফি ৫০ হাজার টাকা (অফেরতযোগ্য) ও প্রাইভেট ইস্যুর আবেদন ফি ১০ হাজার টাকা। পাবলিক ইস্যুর অনুমোদন ফি শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ এবং প্রাইভেট ইস্যুর ক্ষেত্রে এই ফি মোট অভিহিত মূল্যের শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ।

পাবলিক ইস্যুর ক্ষেত্রে ইস্যু ম্যানেজমেন্ট ফি সর্বোচ্চ দুই শতাংশ। পাবলিক ইস্যুর অঙ্কের ৩৫ শতাংশের জন্য এক শতাংশ আন্ডাররাইটিং ফি দিতে হয়। পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় ইস্যুর ক্ষেত্রেই বার্ষিক ট্রাস্টি ফি স্থিতির শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। ট্রাস্ট চুক্তি নিবন্ধন ফি বাবদ দুই শতাংশ স্টাম্প ডিউটি। এছাড়া আরজেএসসির রেজিস্ট্রেশন ফি ও চুক্তির ওপর নির্ভর করে ক্রেডিট রেটিং ফিও দিতে হয়।

ডিপোজিটোরি ও ট্রেডিং রিলেটেড ফির মধ্যে রয়েছে ডিম্যাট ফি শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য ৭৫ শতাংশ, বার্ষিক ডিপোজিটোরি বা লিস্টিং ফি পাঁচ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত, লেনদেন ফি ১০০ টাকা, নতুন ইস্যু ও আইপিও ফি শূন্য দশমিক শূন্য ১৫ শতাংশ। এছাড়া শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ লেনদেন কর, ১০ শতাংশ কুপন কর ও ১০ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইন করও রয়েছে।

এক্ষেত্রে ইস্যুয়ারের করভার কমাতে স্ট্যাম্প ডিউটি প্রত্যাহার এবং করপোরেট কর কমানো বা একটি কর অবকাশ সুবিধা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করেছে কর্ম-কমিটি।

এছাড়া বিনিয়োগকারীদের করভার কমাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অভিন্ন করহার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। করপোরেট বন্ডের আয়কে উৎসে করের বাইরে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে বলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সুপারিশ জানিয়েছে।

কর্ম-কমিটির চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. খুরশিদ আলম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা এই প্রতিবেদনে বন্ড মার্কেট উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছি। এর মধ্যে বন্ড ইস্যু ও কেনাবেচার খরচ একটি বড় প্রতিবন্ধকতা বলে কর্ম-কমিটির সদস্যদের মনে হয়েছে। আমরা এই খরচ কমানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিএসইসি, এনবিআরসহ সব পক্ষের কাছে সুপারিশগুলো তুলে ধরেছি।’ 

সর্বশেষ..