ফুটপাথে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে

সামিহা খাতুন:‘ফুটপাথ’ শব্দটি শুনলে আমাদের মস্তিষ্কে চলে আসে প্রধান সড়কের পাশাপাশি মানুষ চলাচলের জন্য তৈরি নির্দিষ্ট বাঁধানো পথ, যে পথ দিয়ে রাস্তাঘাটে খুব সহজেই মানুষ চলাচল করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটপাথগুলোর দিকে তাকালে লক্ষ করা যায় ভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশের শহরগুলোর অধিকাংশ রাস্তার ফুটপাথে লক্ষ করা যায় নানারকম বিকিকিনির স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকান। রাজধানীর ফুটপাথগুলো হলো চাঁদাবাজির হাটবাজার। অপরদিকে পুলিশ, প্রশাসন এবং কিছু রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনের অসাধু কর্মকর্তা বা কর্মীরা ফুটপাথের স্থায়ী-অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে তাদের ফুটপাথ বেদখলে নিতে সহায়তা করছেন। দেখা যায়, ফুটপাথে হকার এবং স্থায়ী ও অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই শহরের ও গ্রামের স্বল্প আয়ের মানুষ। এসব হকার ও স্থায়ী-অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে গ্রামের ভূমিহীন কৃষক, নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষ, অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত বেকার, যারা খুব অল্প কিছু মূলধন জোগাড় বা অল্প সুদে ঋণ গ্রহণ করে ব্যবসায় নেমেছে। অপরদিকে ফুটপাথের ব্যবসায় পুঁজি কম লাগে, একা পরিচালনা করা যায়, ভাড়া বা সিকিউরিটি মানি দিতে হয় না, তাই মানুষ তুলনামূলকভাবে ফুটপাথে ব্যবসা লাভজনক মনে করে এবং অবৈধভাবে পথচারীদের মাঝে অসুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে ফুটপাথে ব্যবসা শুরু করে। আর এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠছে নানারকম চাঁদাবাজ চক্র। তারা অর্থের বিনিময় হকার ও ক্ষুদ্র স্থায়ী-অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের ফুটপাথ দখল করে বসার সুযোগ করে দিচ্ছে।

সাহিত্যিক মারিও বার্গাস ইয়োসা একটি প্রবন্ধে বড় বড় নগরীর ফুটপাথ ও হকারদের সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপি বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বে সম্ভবত এমন কোনো নগরী নেই, যেখানে ফুটপাথে হকার নেই।’ তবে সেখানে যথেচ্ছ নয়, নগর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই তারা ফুটপাতে বসেন। একই সঙ্গে দোকানদারিও হয় এবং পথচারীও হাঁটে ও কেনাকাটা করে।

সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ফুটপাতে যেসব দরিদ্র শ্রেণির মানুষ ব্যবসা করে থাকে বা হকারের কাজ করে থাকে, তাদের নানারকম বিপদ-আপদের সম্মুখীন হতে হয়, সম্মুখীন হতে হয় নানারকম চাঁদাবাজ চক্রের। চক্রের সদস্যদের নিয়মিত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতে হয়। নিয়মিত এসব চাঁদাবাজকে অর্থ দিতে না পারলে হকার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ফুটপাথে বসতে দেয়া হয় না।

২০২০ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে মোট হকার তিন লাখ, যাদের গড়ে ১৯২ টাকা করে দৈনিক চাঁদা গুনতে হয়। সম্প্রতি একটি গবেষণায় উঠে এসেছে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাথ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে একটি চক্র। ফুটপাতে বসতে চাঁদা দিতে হয়, না দিলে দোকান ভেঙে দেয়া হয়; আবার পুলিশ দিয়ে হয়রানি করারও অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে চাঁদাবাজি এতই প্রকট রূপ ধারণ করেছে যে এক্ষেত্রে দুটি গ্রুপ কাজ করছে। একটি গ্রুপ ফুটপাথের অবৈধ দোকানগুলো থেকে ভাড়া আদায় করছে, আরেকটি গ্রুপ চাঁদার টাকা তুলছে। অবৈধ এ টাকার জোরেই ফুটপাত কখনোই পুরোপুরি হকারমুক্ত হয় না। ফুটপাত দখলে নেয়ায় রাজধানীর অনেক স্থানেই সংকুচিত হয়েছে মানুষের চলার পথ। বাড়ছে যানজট। কোথাও অবৈধ স্থাপনা ও বিভিন্ন মালামাল রেখে দেয়ায় বিড়ম্বনায় পড়েন পথচারীরা। অনেক সময় পথচারীদের ফুটপাথের পরিবর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হয়। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) হিসাবে, সারাদেশে দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের ৪৪ শতাংশ পথচারী এবং শুধু ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের মধ্যে পথচারীর সংখ্যা ৪৭ শতাংশ।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে বছরে দুই হাজার ১৬০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।

ফুটপাথে অবস্থানরত হকাররা জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্পর্কে জ্ঞান না রাখলেও জাতীয় অর্থনীতিতেও কোনো না কোনোভাবে এই অংশের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ফুটপাথে অবস্থিত হকারদের কল্যাণে রাজধানীর রাস্তার কোটি কোটি টাকার পচনশীল পণ্য ধ্বংস হওয়া থেকে বেঁচে যাচ্ছে। আমরা রাস্তায় চলাচলের সময় প্রায়ই লক্ষ করি বিভিন্ন বয়সের ছেলেমেয়েরা হকার পেশার মাধ্যমে নানারকম ফল বিক্রি করে, যেগুলো পচনশীল দ্রব্য। তারা যদি এসব পণ্য ফুটপাথে হকার অথবা ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে শহরে এনে বিক্রি না করত, তাহলে কৃষকের এসব পচনশীল দ্রব্য খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যেত। এর ফলে কৃষকও তার ন্যায্য মূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতো।

সরকার, প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে ফুটপাথের হকার ও স্থায়ী-অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের যদি শৃঙ্খরার মধ্যে আনা যায়, তাদের সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনা করা যায়, চাঁদাবাজ চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় এবং এসব চাঁদাবাজ চক্রের সদস্যদের যথাযথভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে জাতীয় অর্থনীতি, পথচারী ও দরিদ্র হকার শ্রেণির মানুষ সুফল পাবে।

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯০  জন  

সর্বশেষ..