মত-বিশ্লেষণ

ফ্রিল্যান্সিং পেশার চ্যালেঞ্জ ও এর বাধাসমূহ

মো. জিল্লুর রহমান: সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। তথ্য-প্রযুক্তির অগ্রগতির এ সময়ে ‘ফ্রিল্যান্সিং’ শব্দটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। এটি বর্তমান সময়ে পত্রপত্রিকা, টিভি-ইলেট্রনিক মিডিয়া ও লোকমুখে খুব আলোচিত একটি শব্দ হলেও অনেকের এ সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই, যাদের আছে তাদের ধারণাও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এ কারণে সমাজের অনেকেই ফ্রিল্যান্স করা পেশাজীবীদের নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করেন। অনেকেই ধারণা করেন, অযথা ঘরে বসে কম্পিউটার টিপে সময় নষ্ট করার আরেক নাম ফ্রিল্যান্সিং। অনেক তরুণ ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং করে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে নিজের পড়ালেখা ও পরিবারের খরচ জোগান দেয়। অথচ সামাজিকভাবে তাকে পরিচয় নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতে হয়। শুধু পরিবার বা আত্মীয়স্বজন নয়, ব্যাংকে হিসাব খোলা থেকে শুরু করে পাসপোর্ট করার মতো সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজের পরিচয় নিয়ে তাকে ঝক্কি-ঝামেলায় পড়তে হয়।

ফ্রিল্যান্সিং শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে মুক্তপেশা। অর্থাৎ গৎবাঁধা নিয়মের বাইরে নিজের ইচ্ছামতো সময়ে এবং পছন্দের ধরন অনুযায়ী কাজ করার নাম ফ্রিল্যান্সিং। অন্যভাবে বলা যায়, নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের অধীনে না থেকে মুক্তভাবে কাজ করাকে ফ্রিল্যান্সিং বলে। এ ধরনের পেশাজীবীকে বলা হয় ফ্রিল্যান্সার বা মুক্ত পেশাজীবী। ফ্রিল্যান্সিং বা ফ্রিল্যান্সার শব্দগুলো আমাদের কাছে সাম্প্রতিক হলেও এ ধরনের পেশার সঙ্গে অনেকে অনেক আগ থেকেই কমবেশি পরিচিত। ঠিকাদার ও পত্রপত্রিকার কলাম লেখক, স্থানীয় সাংবাদিক এবং বাসা বা ভবনের ইলেকট্রিক মিস্ত্রি নির্দিষ্ট একটি পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকে না। একই সাংবাদিক অনেক সংবাদপত্রের সঙ্গে কাজ করে, একই ইলেকট্রিক মিস্ত্রি অনেক কাজে যুক্ত থাকে, কিংবা কোনো কাজ ১৫-২০ মিনিটে শেষ করে, আবার কোনো কাজ মাসব্যাপী চলতে পারে।

চাকরিজীবীদের মতো তারা বেতনভুক্ত নয়। কাজ ও চুক্তির ওপর নির্ভর করে আয়ের পরিমাণ কম বা অনেক বেশি হতে পারে, তবে স্বাধীনতা আছেÑইচ্ছামতো ঘরে বসে বিশ্বের যে কোনো দেশ থেকে আয় করার সুযোগও আছে। এজন্য স্বাধীনমনা মানুষের আয়ের জন্য এটি একটি সুবিধাজনক পন্থা। সুতরাং ফ্রিল্যান্সিং বলতে আমরা সেই কাজগুলোকে বুঝি যেগুলো কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে করা হয় এবং কাজগুলো হয় বিদেশিদের জন্য (মূলত পশ্চিমা ও ইউরোপের দেশগুলো) এবং প্রাপ্তিটা হয় মার্কিন ডলার বা ব্রিটিশ পাউন্ড বা ইউরোতে।

উন্নত দেশগুলোয় (যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপ) মজুরি অত্যন্ত বেশি। কোনো কোম্পানির যদি ওয়েবসাইট তৈরি করার প্রয়োজন হয় এবং এজন্য যদি একজন ওয়েব ডিজাইনার নিয়োগ করতে হয়, তাহলে বিপুল পরিমাণ টাকা গুনতে হয়। সে কাজটিই অন্য কোনো উন্নয়নশীল দেশের (যে দেশের মজুরি অনেক সস্তা) ওয়েব ডিজাইনার দিয়ে করিয়ে নিলে তুলনামূলকভাবে কম টাকায় করানো যায়। তাই ওইসব দেশের মানুষ আমাদের মতো দেশ থেকে কম খরচে করিয়ে নেন, তাতে করে দুই পক্ষেরই লাভ। বর্তমান ইন্টারনেট ব্যবস্থায় খুব সহজে এ কাজ করা সম্ভব।

আমরা সাধারণত দুই ধরনের পেশার সঙ্গে পরিচিতÑচাকরি ও ব্যবসা। চাকরিতে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তিবদ্ধ থাকতে হয়; মাস শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন পাওয়া যায় এবং এতে আপাতভাবে কোনো বিনিয়োগের দরকার পড়ে না। অন্যদিকে ব্যবসায় একাধিক ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বা লেনদেনে সম্পৃক্ত থাকতে হয়, আয় কয়েক মিনিট বা কয়েক মাসেও হতে পারে। ব্যবসায়ে আয়ের পরিমাণও নির্দিষ্ট নয় এবং বিনিয়োগের জন্য কম-বেশি টাকা বা স্থাবর সম্পদের প্রয়োজন হয়। তবে ফ্রিল্যান্সিং চাকরি ও ব্যবসায়ের চেয়ে একটু আলাদা। চাকরিতে যেমন কোনো বিষয়ে শিক্ষিত ও দক্ষ হতে হয়, ফ্রিল্যান্সিংয়েও তা-ই। তবে এক্ষেত্রে ব্যবসার মতো এখানে তেমন বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। মোটামুটি একটা কম্পিউটার আর ইন্টারনেট সংযোগ হলেই শুরু করা যায়। ফ্রিল্যান্সিংয়ে মূল বিনিয়োগ দক্ষতা, শ্রম ও সময়। এগুলোর ওপর নির্ভর করে আয়ের পরিমাণ কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ফ্রিল্যান্সিংয়ে আয় নির্ভর করে সম্পূর্ণভাবে দক্ষতা, শ্রম ও সময়ের ওপর। কাজ না করলে কোনো আয় নেই। পক্ষান্তরে মূল্যবান কোনো বিষয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলে আয় খুব বেশি হবে। এই আয়ের সীমা দক্ষতার ওপর নির্ভর করে।

ফ্রিল্যান্সাররা অনলাইনে তাদের কাজের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়ে আসেন। রেমিট্যান্স আহরণের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন দেশের লাখো তরুণ। বেকারত্ব দূরীকরণ এবং নিজের ও সমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখলেও তাদের সামাজিক পরিচয় নিয়ে খুবই দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন। ব্লগ সাইটগুলোয় কিংবা ট্রেনিং সেন্টারগুলোর পোস্টারে দেখা যায়, কম্পিউটারের পর্দা থেকে ডলার উড়ে আসছে, যেন ধরার লোক নেই, কিংবা পায়ের ওপর পা তুলে কেউ ডলার গুনছেন। এগুলো এ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত প্রচারণা। তবে যারা এ পেশায় খুব দক্ষ, তাদের ক্ষেত্রে এটি শতভাগ সত্য ও বাস্তব।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের শতাধিক খাত রয়েছে। বহুল আলোচিত ও চাহিদাসম্পন্ন খাতগুলো হলো ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল ডেভেলপমেন্ট, প্রোগ্রামিং ও সফটওয়্যার, নেটওয়ার্কিং, লেখালেখি, সাপোর্ট (সেবা বা পণ্যের সঙ্গে জড়িত সহযোগিতা), বিক্রয় ও বিপণন (মার্কেটিং), ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি খুচরো করে বললে প্রায় ৬০-৭০টি বিষয়ে ফ্রিল্যান্সিং করা যায়। বাড়িতে, মেসে, নিজের ঘরে, ক্যাম্পাসে, যানবাহনেÑযেখানে ইচ্ছা বা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয়, সেখানে বসে কাজ করা যায়।

ফ্রিল্যান্সিং কাজের বিখ্যাত সব সাইট হচ্ছেÑআপওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সার, ফাইভার, গুরু, নাইনটিনাইন ডিজাইনস, পিপল পার আওয়ার প্রভৃতি এবং পেপল ও পাইয়নিয়র হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং সাইটে লেনদেনের আন্তর্জাতিক সব মাধ্যম।

আমাদের দেশের ফ্রিল্যান্সিংয়ে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। প্রথমত, ফ্রিল্যান্সিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বাংলাদেশের অধিকাংশ ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড আন্তর্জাতিক মানের নয়। পেপল, পাইয়িনিয়র প্রভৃতি সাইটে হিসাব খুলতে গেলে আমাদের দেশের উপরোক্ত কার্ডগুলো গ্রহণ করা হয় না। ফলে এসব সাইটে হিসাব খোলা যায় না এবং অনেক ফ্রিল্যান্সিং সাইটে রেজিস্ট্রেশনই করা যায় না।

দ্বিতীয়ত, ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে তরুণরা ফ্রিল্যান্সিং সাইটে কাক্সিক্ষত কাজ পায় না, বা কাজ পেলেও দক্ষতার সঙ্গে কাজটি শেষ করে ডেলিভারি দিতে পারে না। ইংরেজিতে কথা বলা ও লেখালেখির দক্ষতা ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে ইংরেজির দুর্বলতা কাটানোর জন্য যদি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হতো, তবে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আরও অনেকে যুক্ত হতে পারত।

তৃতীয়ত, ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য প্রশিক্ষণ দরকার। কিন্তু বেসরকারি উদ্যোগে কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠলেও সেগুলো বাজারচাহিদার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। তাছাড়া এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধিকাংশ রাজধানীকেন্দ্রিক। দক্ষ ফ্রিল্যান্সার তৈরির জন্য সরকারি উদ্যোগে সারা দেশে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার।

চতুর্থত, ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য সারা দেশে উচ্চগতির নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা দরকার। সরকার থ্রিজি ও ফোরজির ইন্টারনেট সেবার কথা বললেও অনেক স্থানে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পর্যাপ্ত নয়, ফলে প্রত্যন্ত এলাকার অনেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত হতে পারছে না।

পঞ্চমত, ফ্রিল্যান্সিং আমাদের দেশে পেশা হিসেবে স্বীকৃত নয়, ফলে অনেকে এ পেশায় আসতে হীনম্মন্যতায় ভোগে।

আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় ক্ষেত্র। বিশ্বে এখন বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা প্রতিবছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স অর্জন করছে।

বাংলাদেশে প্রায় ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। এ ফ্রিল্যান্সারদের কথা ভেবে তাদের উন্নয়নে এবং দেশের তরুণদের এ মুক্তপেশায় উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ফ্রিল্যান্সারদের সহায়তা করার জন্য প্ল্যাটফর্ম করেছে। তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সারকে পরিচয়পত্র দিতে কাজ শুরু করছে সরকার। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি ‘ফ্রি কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে এবং সে কার্ডের নাম হবে ফ্রি কার্ড। ফ্রিল্যান্সারদের এ পরিচয়পত্র বা ফ্রি কার্ডে ব্যক্তিগত তথ্য, মোবাইল নম্বরসহ বিশেষ কোড থাকবে। সরকার তথ্য-প্রযুক্তিতে রপ্তানি আয় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং একটা বড় ক্ষেত্র হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং। বর্তমান পুরো পৃথিবীতে এ মুহূর্তে এক দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কেট আইটি ফ্রিল্যান্সারদের দখলে।

সারা বিশ্বেই ফ্রিল্যান্সিং একটি আউটসোর্সিংয়ের মুক্তমনা পেশা হিসাবে স্বীকৃত এবং এ খাতে বাংলাদেশেরও উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে লাখ লাখ বেকার তরুণ-তরুণী এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন এবং কাক্সিক্ষত অর্থ উপার্জন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। উপরোক্ত বাধাগুলো দূর করতে পারলে দেশে লাখ লাখ বেকার যুবকের যেমন কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে, ঠিক তেমনিভাবে অনেক বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জিত হবে। এক্ষেত্রে দরকার সরকারি উদ্যোগ, সঠিক পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন।

ব্যাংকার ও ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..