প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বগুড়ায় চাদর-কম্বল তৈরিতে ব্যস্ত কয়েক হাজার তাঁতি

আলমগীর হোসেন, বগুড়া: উত্তরবঙ্গের বগুড়ার শাওইলপল্লিতে তাঁতশিল্পে ব্যস্ত সময় পার করছে কয়েক হাজার মানুষ। এ অঞ্চলের তাঁতিগোষ্ঠী আজও ধরে রেখেছে তাঁত-সংস্কৃতি। আদমদীঘি উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের ছোট একটি গ্রাম শাওইল। এ গ্রামে অনেক আগে থেকেই তাঁতিদের বাস। তারা উলের (উলেন) সুতা দিয়ে শীতের চাদর ও কম্বল তৈরি করে থাকে। সময়ের ব্যবধানে দুপচাঁচিয়া থেকে সান্তাহার পর্যন্ত বিস্তৃতি ঘটেছে এ শিল্পের।

এ শিল্পকে কেন্দ্র করে এলাকায় গড়ে উঠেছে হাট। এলাকার মানুষ এর নাম দিয়েছে ‘চাদর-কম্বলের হাটের গ্রাম’। ভোররাত ৪টা থেকে এ হাট চলে সকাল ১০টা পর্যন্ত। আর হাট বসে রবি ও বুধবার। হাটকে ঘিরে প্রায় ২৫টি গ্রামে গড়ে উঠেছে তাঁতপল্লি। তারাই কম্বলকেন্দ্রিক এ শিল্পের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। যখন শাওইলের হাট বসে তখন মনে হয় যেন মেলা বসেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীদের পদচারণে মুখরিত গ্রামের পথঘাট।

এ হাটকে ঘিরে চলে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীদের চাদর-কম্বল আর সুতা কেনার প্রতিযোগিতা। হাটকে ঘিরে শত শত ট্রাক, বেবিট্যাক্সি, রিকশা-ভ্যানের উপস্থিতি। তাঁতের খটখট শব্দে আর সুতার বুননে মিশে আছে শাওইলসহ আশপাশের গ্রামের মানুষের স্বপ্ন। কারও রয়েছে নিজের তাঁত, আবার কেউ শ্রম দিচ্ছে অন্যের তাঁতে। প্রযুক্তি দাপট তারপরেও এ আদি শিল্প শাওইল গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের মানুষের আকড়ে ধরে আছে। কেউ সুতা ছাড়াচ্ছে আবার কেউ বা চরকা নিয়ে বসে সুতা নলি বা সূচিতে উঠাচ্ছে কেউ বা সুতা ববিন করছে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় ও ঘরে বসানো তাঁতযন্ত্র। কোনোটা চাকাওয়ালা, আবার কোনোটা একেবারেই বাঁশ দিয়ে হাতের তৈরি।

শাওইল ছাড়াও দত্তবাড়িয়া, মঙ্গলপুর, দেলিঞ্জা, পুশিন্দা, দেওড়া, দত্তবাড়ীয়া, বিনাহালী, কেশরতাসহ আশপাশের প্রায় ২৫ গ্রামের চিত্র একই রকম। শাওইল গ্রামের চারে পাশে তাঁতিদের  অধিকাংশ মানুষের মূল পেশায় তাঁতশিল্পকে ঘিরে। আশপাশের ২৫ গ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি তাঁতি পরিবার আছে। আর এ শিল্পকে ঘিরে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম চলে। কেউ বংশপরম্পরায় আবার কেউ বা নতুন করে। শীত শুরুর আগেই শাওইলসহ আশপাশের তাঁতিরা শুরু করে কম্বল তৈরি, সুতা বোনা ও সুতার তৈরি বড় চাদর কম্বল, বিছানার চাদর থেকে শুরু করে লেডিস চাদর-কম্বল, লুঙ্গি, গামছা, তোয়ালেসহ নানা ধরনের শীতবস্ত্র ও পোশাক।

শাওইল হাট ও বাজার কমিটির সভাপতি জইম উদ্দীন ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন জানান, শাওইল হাটে শুরুতে পাঁচটি দোকান থাকলেও এখন শাওইলের দোকান রয়েছে ছোট-বড় মিলে প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০টি।

দিনে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা মজুরিতে নিয়োজিত এসব কর্মচারীর অধিকাংশ আশপাশের গ্রামের দরিদ্র নারী। শাওইলের চাদর আর কম্বল এর গ্রামকে ঘিরে হাজারো সম্ভাবনা থাকলেও তা সম্ভাবনার খাত হিসেবে কেউ দেখছে না।

এ গ্রামে কোনো ব্যাংকের শাখা নেই। লেনদেনের জন্য আসতে হয় আদমদীঘি অথবা মুরইলে।

শ্রমিক মজিনা ও আয়েশা বেগম জানান, ঠিকমতো কাজ করলে দিনে ১৮ থেকে ২০টি কম্বল তৈরি করা যায়। একইভাবে চাদর ১৮ থেকে ২০টি, তোয়ালে ১০৫ থেকে ১২০টি ও গামছা ১০ থেকে ১৫টি তৈরি করা সম্ভব।

বিক্রেতা আজিজার রহমান ও মোজাম্মেল হোসেন জানান, রকমভেদে প্রতিটি কম্বল ২৫০ থেকে ৭০০ টাকা, তোয়ালে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা, চাদর ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা, গামছা চারটি ১৪০ থেকে ২৫০ টাকায়  বাজারে বিক্রি হচ্ছে।