প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বঙ্গবন্ধু-আমাদের স্বাধীনতা ও ৫০ পেরিয়ে আজকের এ দেশ

. শামসুল আলম:বাঙালি জাতির মুক্তিদাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আদর্শিক ভিত্তি স্থাপন করেন। পরিকল্পিত উন্নয়নের ভিত্তিতে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে তিনি দেশের প্রতিথযশা চিন্তাবিদদের নিয়ে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই বাংলা এক সময় শৌর্যে বীর্যে প্রসিদ্ধ ছিল। একসময়ের সমৃদ্ধ ভূমি এই বাংলা কৃষি উৎপাদন, সিল্ক, তুলা ও মসলিন কাপড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। বঙ্গবন্ধু তার সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য সমৃদ্ধশালী জাতি গঠন করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য সোনার মানুষ দরকার। বাংলাদেশ নিপীড়ন, নিষ্পেষণ, লুণ্ঠনে জর্জরিত। সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে এবং সুখী ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গঠনে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জনগণকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। 

বাংলাদেশ জন্মের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অবকাঠামো ছিল বিপর্যস্ত, চারদিকে হাহাকার। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের তৎকালীন ডেপুটি চেয়ারম্যান প্রফেসর নুরুল ইসলামের ভাষায়Ñ‘বাংলাদেশ অনুন্নত অবকাঠামো, স্থির কৃষি, দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যাযুক্ত ভঙ্গুর ও দুর্বল অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছে। ঔপনিবেশিক নিষ্পেষণ ও হারানো সুযোগের কারণে উদ্যম ও উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়েছে।’ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি বলতে কিছুই ছিল না। প্রতিটি গ্রাম ছিল বিচ্ছিন্ন, বৃহত্তর অর্থনীতির সঙ্গে প্রায় সংযোগবিহীন। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮৪ শতাংশ দরিদ্র ছিল এবং সেসময়ে শুধু আফ্রিকার দরিদ্রতম দেশ বুরকিনা ফাসোর চেয়ে এগিয়ে ছিল। সে সময়ে বঙ্গবন্ধু দ্রুত দেশ গঠনের তাগিদ অনুভব করেন। এর ফলে স্বাধীনতার দেড় বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্ভব হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে সোনার বাংলা গড়ে তুলতে, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই প্রণীত হয় বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮)। বঙ্গবন্ধু প্রথম পঞ্চবার্ষিকী (১৯৭৩-১৯৭৭) পরিকল্পনায় বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন তথা গ্রামীণ প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব অবহেলিত সমাজসেবা কার্যক্রমকে স্বাধীন দেশের উপযোগী, গতিশীল এবং প্রাণবন্ত করে তোলেন।

অবকাঠামো পুনর্গঠনের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিকল্পনায় কৃষি ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিতে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের সামনে তখন প্রধান করণীয় ছিল ছিন্নমূল বিপর্যস্ত কোটি মানুষের পুনর্বাসন আর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন। সেসময়ে সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল সামগ্রিকভভাবে কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকরণ, কৃষক ও সম্প্রসারণ জনবলের দক্ষতাবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষায়িত সেবা প্রদান, রপ্তানি উপযোগী কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ ও চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদ পদ্ধতি প্রচলনসহ কৃষি কার্যক্রম বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন করা। বঙ্গবন্ধু অনুভর করেছেন সোনার বাংলা রূপায়ণে কৃষি উন্নয়নের বিকল্প নেই। কৃষি সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য তিনি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (বিনা), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং বিএডিসি, হর্টিকালচার বোর্ড, সিড সার্টিফিকেশন এজেন্সি প্রভৃতি পুনর্গঠন করেন। তিনি শুধু একটি স্বাধীন দেশের সূচনা করেননি, সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনে রেখে গেছেন অর্থনৈতিক দর্শন। স্বাধীনতার তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ হানাদার বাহিনীর ধংসযজ্ঞ থেকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। কৃষি বিপ্লবসহ কৃষি খাতে সংস্কার ছাড়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রী মহল জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর দেশের গতিপথ পরিবর্তন হয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে ধারা বঙ্গবন্ধুর হাতে সূচিত হয় তা থমকে যায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক গতিধারা মন্থর হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০Ñএ ১৪ বছর সময়ে বাংলাদেশ এক অন্ধকার যুগে পড়ে ছিল। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য এক হারানো সুযোগ।

২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপান্তর পূর্ণ মাত্রায় গতি লাভ করে। ২০০২ থেকে ২০১০Ñএই সময়ে কোনো পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল না। বরং দাতা সংস্থার চাপিয়ে দেয়া দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্র ছিল। এসব কৌশলপত্রে প্রবৃদ্ধির কোনো হার নির্দিষ্ট ছিল না। দারিদ্র্য নিরসন কৌশল পত্রে জনগণ বা সরকারের কতটুকু অংশীদারিত্ব ছিল সেটা বিবেচ্য বিষয়। এটি বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫(গ) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে। এই সময়ের পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক সংরক্ষণবাদের বিপরীতে তিনি এক প্রজš§ সময়ে জাতির পিতার স্বপ্ন সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র গঠনে মনোনিবেশ করেন। রূপকল্প ২০২১-এর  মাধ্যমে তিনি নয়া জাতীয় পরিকল্পনার যুগের সূচনা করেন। এই রূপকল্প ২০২১-এর মাধ্যমেই তিনি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল দর্শন ছিল গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সরকারি সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে জনগণের জীবনমানের উন্নয়নের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, শিল্পের প্রসার এবং তার ফলে বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্য মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা।

গত শতাব্দীর আশির দশকের কাঠামোগত সমন্বয়, নব্বই দশকের ওয়াশিংটন কনসেনশাস, এই শতাব্দীর ২০০৮-০৯ অর্থনৈতিক মন্দা ও নব্য অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিকল্পিত অর্থনীতি ও মানব পুঁজি উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। এটা জাতীয় পরিকল্পনার নতুন প্রেক্ষাপট। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ফিরে আসে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার দিনবদলের সনদ রূপকল্প ২০২১ নামে পরিচিতি লাভ করে। রূপকল্প ২০২১কে বাস্তবে রূপ দিতে প্রণয়ন করা হয় বাংলাদেশের প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১। দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় ঘটে ‘প্যারাডাইম সিফট’। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-এর মূল লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা। দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে রূপকল্প এর অভীষ্ট অর্জন সহায়ক হয়েছে। অন্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিলÑ২০১০ সালের পর যত দ্রুত সম্ভব প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করে ২০১৪ সালের পর নিরক্ষরতা দূরীকরণ; ২০১৩ সালের পর যত দ্রুত সম্ভব স্নাতক পর্যায়ে বিনা বেতনে শিক্ষা সুবিধা দান এবং বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে পর্যাপ্ত দক্ষতাসহ শিক্ষিত মানুষের দেশে পরিণত করা। ২০২১-এর মধ্যে দারিদ্র্য রেখার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা জনসংখ্যার ১৩.৫ শতাংশে নামিয়ে এনে দারিদ্র্য বহুলাংশে নিরসন করা। প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা দুটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়Ñষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। এই দুটি পরিকল্পনাই ছিল লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কৌশলগত পরিকল্পনা। এই দুটি পরিকল্পনাই বাজেট ও বার্ষিক কর্মসূচির সঙ্গে সুন্দর সমন্বয় ঘটানো হয়। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি সাধিত হয়। এর কারণ হলোÑপরিকল্পনা একটি ভবিষ্যৎমুখী প্রক্ষেপণ। আগামী ৫ বছরে অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন হবে তার একটি কৌশল চিত্র ও কর্মসূচি তুলে ধরা হয়। এই সময়ের মধ্যে সব খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন স্থির করা হয়। সে অনুযায়ী বাজেট এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। সে কারণে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সব মন্ত্রণালয়/বিভাগের মতামত একত্র করে তা সমন্বয় করা হয়। এটি বেশ কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ। এর ফলে পরিকল্পনা ও বাজেটের মধ্য সমন্বয় হচ্ছে, যা আগে ছিল না। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ হতে অর্থ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামো তৈরি করা হয়। কোনো প্রকল্প নিতে হলে সে প্রকল্পটির সঙ্গে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সরাসরি যোগসূত্র আছে কিনা, তা যাচাই করা হয় এবং কোনো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাহায্য করবে তা উল্লেখ করতে হয়। বলতেই হবে, মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট প্রচেষ্টা এবং সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও ব্যবহারের ফলে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। ২০২১-এর দ্বারপ্রান্তে রূপকল্প ২০২১-এর অনেকগুলো লক্ষ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে বা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ২০২১ সালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার মেগাওয়াট অথচ এখন তা ২৫ হাজার মেগাওয়াট। প্রত্যাশিত গড় আয় এখন লক্ষ্যমাত্রা ৭০-এর বিপরীতে ৭২.৮ এবং ২০১৫ অর্থবছরে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন।

এই দশকের পূর্বে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে আটকে ছিল। এটাকে কেউ কেউ ৬ শতাংশের ফাঁদ বলে উল্লেখ করেছিলেন। একসময় মনে হয়েছিল, এই ফাঁদ হতে বের হওয়া বেশ কঠিন হবে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ সময়ে বাংলাদেশ ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এই সময়ে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য মাইলফলক অর্জন করে। বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নি¤œ আয়ের দেশ হতে নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়। বাংলাদেশ ২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা ২০১৫ সালেই অর্জন করতে সমর্থ হয়। বলাবাহুল্য সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কারণে আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খেতাবে ভূষিত হন এবং পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশের মতো অনন্য অর্জন বিশ্বের খুব কম দেশই পেরেছে। তারই ধারাবাহিকতায় টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিক সময়ে বাংলাদেশের ৮ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সব যোগ্যতা অর্জন করে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো সব মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম হয়। ২০২৪ সালেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে পারত কিন্তু কভিডের আকস্মিক অভিঘাতের কারণে যে ধকল অর্থনীতিতে গেছে তার জন্য অন্যদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে আরও দুই বছর উত্তরণ পেছানোর প্রস্তাব রাখা হয়। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার একটি অনন্য দিক হলো, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্যবর্তী ও শেষ এর মূল্যায়ন। এই মূল্যায়ন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এর ফলে ভুল ত্রুটি (ঈড়ঁৎংব ঈড়ৎৎবপঃরড়হ) শোধরানোর সুযোগ থাকে এবং পরবর্তী পরিকল্পনায় শিক্ষণীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ফলাফল সব মন্ত্রণালয়/বিভাগের কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হতে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ পরিকল্পনা দলিলের ওপর ধারাবাহিকভাবে মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কৌশলের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে, যা আগের পরিকল্পনাগুলোতে দেখা যায়নি। ফলে সরকারি কর্মকর্তারা পরিকল্পনা দলিল সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করে। এর মাধ্যমে পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করা হয়। নিচে বিভিন্ন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এবং অর্জন তুলে ধরা হলো।

সারণি ১:  পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এবং অর্জন

সূত্র: অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা

এমডিজি’তে (২০০১-২০১৫) সাফল্য অর্জন বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করেছে। এমডিজিতে পুরস্কার অর্জনের মধ্য রয়েছেÑ২০১০ সালে জাতিসংঘ পুরস্কার (শিশু মৃত্যুহার কমানো), ২০১১ সালে স্বাস্থ্য খাতে অসাধারণ অর্জনের জন্য সাউথ সাউথ পুরস্কার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক ২০১৩ সালে দারিদ্র্য ও অপুষ্টি দূরীকরণের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে ডিপ্লোমা পুরস্কার, একই বছর খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সাউথ সাউথ পুরস্কার, ২০১৫ সালে তিনি পান আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার, একই বছর জাতিসংঘ পরিবেশ পুরস্কার। গত দশকে অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছেÑইউএন উইমেন কর্তৃক প্রদত্ত ২০১৬ সালে প্লানেট ৫০: ৫০ চ্যাম্পিয়ন ও পরিবর্তনের এজেন্ট পুরস্কার, নারী নেতৃত্বের সাফল্যের কারণে ২০১৮ সালে গ্লোবাল সামিট অব উইমেন প্রদত্ত গ্লোবাল উইমেন লিডারশিপ পুরস্কার, ২০১৮ সালে  ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ও স্পেশাল ডিস্টিংশন অ্যাওয়ার্ড ফর লিডারশিপ’, ২০১৯ সালে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের ‘ভ্যাকসিন হিরো’  ও জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ কর্তৃক চ্যাম্পিয়ন ফর স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়ুথ, ২০২০ সালে ‘স্বচ্ছ ও জবাবদিহি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিকাশ’ বিভাগে বাংলাদেশ মর্যাদাপূর্ণ ‘ইউনাইটেড নেশনস পাবলিক সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি। এসডিজিতে যে বাংলাদেশ এগিয়ে যাছে তারই প্রতিফলন দেখা গেছে জাতিসংঘ সমর্থিত সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলুশন নেটওয়ার্ক কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীকে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’ প্রদান। গত বছর নিউইয়র্কে টেকসই উন্নয়নবিষয়ক নবম বার্ষিক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে এটি প্রদান করা হয়।

জিডিপি’র আকার ২০০৯ সাল থেকে এক দশকে অদ্যাবধি বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তিনগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অতীতে আর কোনো দশকেই মাথাপিছু আয় বাড়েনি, যা সর্বশেষ দশকে বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি (২.৪৬ গুণ)। এটি ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে আরও স্পষ্ট হবে। স্বাধীনতার সময় মাথাপিছু জিডিপি’র বিচারে পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি ধনী ছিল, আর বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি ধনী। পরপর দুই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি এখন ভারতের মাথাপিছু জিডিপিকে ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিগত দশকটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। নি¤েœর চিত্রটি থেকে সেটি আরও পরিষ্কার হবে। বিগত দশকে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল বাংলাদেশের জন্য স্মরণকালের সর্বোচ্চ (৬.৭৬ শতাংশ)।

চিত্র ১: দশকভেদে গ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু জাতীয় আয়

সূত্র: বিশ্ব ব্যাংক

বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো প্রতি দশকে গড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক শতাংশ বা তার বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে মাথাপিছু আয়ও পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে। তবে গত দশকে মাথাপিছু গড় আয় আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে (১৪২৩.৬ ইউএস ডলার গড়ে) যা বিগত কোনো দশকে সম্ভব হয়নি। গত দশকে আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে তুলনীয় দেশগুলোর বিবেচনায় একমাত্র চীনই (৭.৭ শতাংশ) বাংলাদেশ (৬.৮ শতাংশ) থেকে গড় প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে এগিয়ে ছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসী আয়। তৈরি পোশাক শিল্প রপ্তানিতে বিশ্বে চীনের পরই বাংলাদেশের স্থান। প্রবাসী আয় ২০১০ সালে ১১ বিলিয়ন ডলার থেকে সর্বশেষ বছরে ১৮.২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। করোনার সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, অর্থনীতিবিদদের প্রক্ষেপণ ভুল প্রমাণ করে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সারণি-২: আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে গত এক দশকের প্রবৃদ্ধির হার

সূত্র: বিশ্ব ব্যাংক

আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশে পরিণত হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে ২০২০ সালে ১৯৪ দেশের মধ্যে মাত্র ১৬টি দেশের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বা তার বেশি হবে। অন্যদিকে ১৬৭ দেশের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হবে। বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে, তা বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ থেকে বুঝা যায়। হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের প্রক্ষেপণ বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ২৬ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। আর সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের (সিইবিআর) হিসাব মতে, ২০৩৫ সালেই বাংলাদেশ ২৫ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের মতে, বাংলাদেশ ২০৫০ সালে ১২তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতে, স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন, বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। দেশের শক্তিমত্তা ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে একক মূল্যের সমতায় জিডিপির আকার ৩০তম এবং চলতি ডলার মূল্যে অবস্থান ৩৯তম। বাংলাদেশ এখন এশিয়ার একটি সফলতার গল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকে বাংলাদেশকে ‘এশিয়ান টাইগার’ নামেও অভিহিত করছে। বাংলাদেশ এখন চাল উৎপাদনে চতুর্থ, স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়। আজ আমরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ং সম্পূর্ণ। আমরা চাল স্বাধীনতার পর থেকে সাড়ে তিন গুণের বেশি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি। এটা সত্য যে, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতি সত্ত্বেও সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। অতীতের গৌরব ও অর্জন ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। আমাদের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। আমাদের ১৫-২৯ বছর বয়সীদের এখনও ২৯.৮ শতাংশ শিক্ষা, কাজে ও প্রশিক্ষণে যুক্ত নেই। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে হবে। ভবিষ্যতে উন্নত দেশ হতে হলে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের বিকল্প নেই। রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি। অনলাইন শ্রমবাজারে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশ বিশ্বে জনসংখ্যায় অষ্টম বৃহত্তম। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে আমাদের ব্যবসায় পরিবেশ উন্নয়নে আরও মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে। সে কারণে রপ্তানি পণ্যের ভেতরে ও বাইরে বহুমুখীকরণে নজর দিতে হবে। মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে প্রতিযোগ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমাদের অবকাঠামো খাতে আগামী ১০ বছরে আর বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। রূপান্তরধর্মী মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নয়নের নতুন যুগের সূচনা হবে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টালেন আগামী ২০২৩-এর মধ্যে শেষ হবে। এদিক দিয়ে ২০২৩ সাল হবে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। এই প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির এক শতাংশের বেশি বৃদ্ধি করতে পারে। এর ফলে ২০২৩ বা পরবর্তী বছরগুলোতে দুই অঙ্কের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে। তবে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আমাদের বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের পাশাপাশি নিজেদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সংগঠনের মাধ্যমে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রায়নে জনসম্পৃক্তি বাড়াতে হবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিমাণগত বিস্তারের সঙ্গে ব্যাপক মানোন্নয়নের প্রয়াস চালাতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে মতবিভেদ ভুলে আমাদের দেশ গড়ায় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আর্থসামাজিক অগ্রগতির ফলে পরবর্তী দশকে বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের সোপানে উন্নীত হতে সক্ষম হবে আর সোনার বাংলার বাস্তবে রূপায়ণ ঘটবে এই শতাব্দীর চল্লিশের দশকে।