দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু

কাজী সালমা সুলতানা: বাঙালি জাতির রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। এ জাতির বিকাশে রয়েছে অসংখ্য কৃতী মানুষের অবদান। মূলত ঊনবিংশ এবং বিংশ শতকেই বাঙালি জাতিসত্তার নবজাগরণ ঘটে। রাজা রামমোহন রায়, এইচএলভি ডিরোজিও, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয় কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দসহ আরও অনেকে এই অভিযাত্রায় যুক্ত হন। এই দীর্ঘ সময়ে বাঙালি সবসময়ই তার নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে, নিজস্ব জাতীয়তাবোধ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। এ জাতি বছরের পর বছর তুর্কি, আফগান, ব্রিটিশদের অধীনে থেকে তাদের শাসন-শোষণে বারবার নিষ্পেষিত হয়েছে। কিন্তু পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে বারবার। ফকির মজনু শাহ ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০-১৮০০), চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (১৯৩০), তিতুমীরের সশস্ত্র লড়াই (১৮৩১), সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭), নীল চাষীদের বিদ্রোহ (১৮৫৯), তেভাগা আন্দোলনসহ (১৯৪৬) বিভিন্ন আন্দোলন আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য জাতি প্রস্তুত হয়েছে।

ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাঙালির এই বিশাল ঐক্যকে ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা আসে ১৯০৫ সালে। নিজেদের শাসন-শোষণকে চিরস্থায়ী করতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের লালন ক্ষেত্র বঙ্গভঙ্গ বাংলাকে বিভক্ত করে। ১৯১১ সালে তার অবসান ঘটলেও সেই ক্ষতের সূত্র ধরেই ভারত বিভক্তিকালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বের মধ্যে পড়ে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশে পরিণত হয়। তাই ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মধ্য দিয়ে পাকিস্তান নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জš§ হলেও বাঙালির প্রকৃত স্বাধীনতা অধরাই থেকে যায়।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ঘোষণা দেন, ‘একমাত্র উর্দুই হবে দেশের রাষ্ট্রভাষা’। প্রতিবাদ করে বাঙালি ছাত্ররা, ‘না’। তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। পূর্ব বাংলার ছাত্রদের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায় এবং সংগঠিত শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি শেখ মুজিবের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ছাত্রলীগ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে ছাত্ররা সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রনেতাদের আশ্বস্ত করেও ১৯৫২-এর ২৬ জানুয়ারি জিন্নাহর ঘোষণার প্রতিই সমর্থন জানান। এবার আন্দোলন শুরু হলে অনেকের সঙ্গে শেখ মুজিবও গ্রেপ্তার হন। এদিকে ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৪৪ ধারা অমান্য করে ছাত্ররা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে মিছিল করলে সেই মিছিলে গুলি চালানো হয়। ছাত্রদের মিছিলে গুলি করে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় মুজিব কারাগারে অনশন করে এই নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদ জানান।

১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হলে মুজিব জেলে থেকেই দলের সহসম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে দলটি আওয়ামী লীগ নামে পুনর্গঠিত হয়। শেখ মুজিব হন দলের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৪৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তাদের সুযোগ-সুবিধার দাবিতে ধর্মঘট করলে শেখ মুজিব এতে সংহতি প্রকাশ করেন। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কারাদেশ দিলেও তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থেকে সরে দাঁড়াননি।

১৯৫৪ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ নেতা যুক্তফ্রন্ট গড়েন। নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হয় বিপুল ভোটে। গোপালগঞ্জ আসন থেকে বিজয়ী শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মধ্যেই স্বৈরশাসক যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং প্রায় সাত মাস পর মুক্তি লাভ করেন।

১৯৫৫ সালে শেখ মুজিব আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। সে বছরই তিনি কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিয়ে একযোগে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতিরোধ এবং গ্রামীণ সহায়তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। কিন্তু দলের প্রয়োজনে ১৯৫৭ সালে তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন।

১৯৬৬ সালে পাকিস্তানের লাহোরে এক সর্বদলীয় জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিব বাঙালির মুক্তির সনদ ‘৬ দফা’ পেশ করেন। এই ৬ দফাকে কেন্দ্র করে শতাব্দীর সর্ব প্রথম বাঙালি জাতির সর্ববৃহৎ ঐক্য গড়ে ওঠে। এরপর থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান রূপকার হয়ে ওঠেন শেখ মুজিব।

এদিকে পাকিস্তানি স্বার্থান্বেষীরা দিশাহারা হয়ে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। এজন্য আগরতলা ষড়যন্ত্র মিথ্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে সর্বদলীয় ছাত্র সমাজ তাঁর ৬ দফার আলোকে রাজবন্দিদের মুক্তি দাবিতে ১১ দফার আন্দোলন শুরু করে। সবার কণ্ঠে তখন একটাই দাবি‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো।’ ছাত্র-জনতার গণজোয়ারে স্বৈরশাসক ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি মামলা প্রত্যাহার করে মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিশাল এক সমাবেশে বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। এভাবেই একজন নেতা শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন একটি জাতির আস্থার প্রতীক।

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে ৬ দফার পক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। এই ষড়যন্ত্র আঁচ করতে পেরেই গোটা জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে যুদ্ধের প্রস্তুতির আহ্বান জানান। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ এক ঢাকার রেসকোর্সের এক বিশাল জনসভায় বলেন,ক্স-

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

এদিকে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক একদিকে ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে ২৫ মার্চ (১৯৭১) গভীর রাতে তাদের সেনাবাহিনী লেলিয়ে দেয় এ দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের ওপর। শুরু হয় নির্বিচারে গণহত্যা। সে রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য সহকর্মীরা তাঁকে রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক করে ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। হানাদার পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা এবং মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণ। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আসে চূড়ান্ত বিজয়।

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস বাঙালি খুঁজে পেল তার নিজস্ব রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠিত হলো বাঙালির জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ। বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির লক্ষ্যে হাজার বছরের সংগ্রামের পূর্ণতা পায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে।’

শুরু হয় দেশ গড়ার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষকে এক সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ¯এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি এ দেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে তারা চাকুরি না পায় বা কাজ না পায়।’ দেশ, মাটি আর মানুষের প্রতি এমনই ছিল তাঁর গভীর মমত্ববোধ।

বিশ্ব নেতারা বঙ্গবন্ধুকে নানাভাবে মূল্যায়ন করেছেন। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, আমি হিমালয় দেখিনি তবে আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনি হিমালয়ের মতো। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত বলেছেন, আপসহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুম কোমল হৃদয় ছিল বঙ্গবন্ধুর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, শেখ মুজিব ছিলেন খুবই ভাবাবেগপ্রবণ, হৃদয়বান ব্যক্তি। একজন আইনপ্রণেতার চেয়ে বেশি পরিমাণে ছিলেন পিতৃসুলভ।

জ্যাকব এফ ফিল্ডের মতে, বিশ্বের নেতাদের সেরা ভাষণের তালিকায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, যা ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত।

দৃপ্ত সাহসী উচ্চারণে এই ভাষণের মতোই সারা জীবনে তিনি যা বলেছেন, তা দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই বলেছেন। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের রাজনীতি করার অপরাধে তাঁকে মোট ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। উপমহাদেশের আর কোনো নেতাকে এত জুলুম সহ্য করতে হয়নি।

১৯৭১ সালে টাইম ম্যাগাজিনের মূল প্রবন্ধ ছিল: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। প্রচ্ছদে ছিল বঙ্গবন্ধুর ছবি।

১৯৭১-এ নিউজ উইক পত্রিকা লিখেছিল, গড়পড়তায় বাঙালির চেয়ে দীর্ঘকাল বঙ্গবন্ধু হলেন চঙঊঞ ঙঋ চঙখওঞওঈঝ বা রাজনীতির কবি, যিনি আকৃষ্ট করতে পারতেন সব শ্রেণি আর বিশ্বাসের মানুষকে।

১৯৭৩ সালে বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তিপদকে ভূষিত করে। পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশচন্দ্র তাঁকে এই সম্মাননায় অভিষিক্ত করে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আজ থেকে বিশ্ববন্ধু। বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে শুধু বঙ্গবন্ধু নন, তিনি আজ সত্যিই বিশ্ববন্ধু।

কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভাষায় বলতে হয়,

যতকাল রবে পদ্মা-মেঘনা-

গৌরী-যমুনা-বহমান

ততকাল র’বে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান,

চারিদিকে আজ রক্তগঙ্গা

অশ্রু গঙ্গা বহমান

নেই-নেই ভয় হবে-হবে জয়

জয় শেখ মুজিবুর রহমান।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..