বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা ও আজকের কৃষি

মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন: বিখ্যাত দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও গৌরবমণ্ডিত শিল্প হচ্ছে কৃষি।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক রাজনৈতিক নেতা। তিনি দার্শনিক রুশোর বাণীকে লালন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ও সমৃদ্ধ একটি সোনার বাংলা গড়তে কৃষিশিল্পের উন্নয়ন অপরিহার্য এবং কৃষি একটি জ্ঞাননির্ভর শিল্প। গতানুগতিক কৃষিব্যবস্থা দ্বারা দ্রুত ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতির খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য চাই কৃষির ব্যাপক আধুনিকীকরণ।

কৃষির সার্বিক উন্নয়নে মেধাবী শিক্ষার্থীদের যদি কৃষিশিক্ষায় আগ্রহী করে তোলা না যায়, তাহলে কৃষি খাতে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কখনোই সম্ভব হবে না। এ উপলব্ধি থেকে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রদত্ত ভাষণটি একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে আজও সাক্ষ্য দেয়। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের কৃষির দিকে নজর দিতে হবে।’ তিনি কৃষিবিদদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের কোট-প্যান্ট খুলে একটু গ্রামে নামতে হবে। কেমন করে হালচাষ করতে হয়, এ জমিতে কত ফসল হয়, এ জমিতে কেমন করে লাঙল চষে, কেমন করে বীজ ফলন করতে হয়, আগাছা কখন পরিষ্কার করতে হবে, ধানে কোন সময় নিড়ানি দিতে হয়, কোন সময় আগাছা ফেলতে হয়Ñপরে ফেললে আমার ধান নষ্ট হয়ে যায়। এগুলো বই পড়লে হবে না। গ্রামে যেয়ে আমার চাষি ভাইদের সঙ্গে প্রাকটিক্যাল কাজ করে শিখতে হবে। তাহলে আপনারা অনেক শিখতে পারবেন।’ ১৯৯৬ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ গড়ার লক্ষ্যে কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছিলেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি উন্নয়ন, মহিলাদের কৃষিতে অংশগ্রহণ ও দারিদ্র্যমোচনের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল তখন। ফলে বাংলাদেশ ২০০০ সালে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। জাতির এ অর্জনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এএফও) থেকে ‘সেরেস’ পদকে ভূষিত হন।

পরবর্তী সময়ে কয়েকটি বছর কৃষি উন্নয়ন থমকে গিয়েছিল, যার ফলে খাদ্য আমদানি করতে হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় ২০০৮ সালে আবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও এক নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়। কৃষি খাতে আবার ভর্তুকি, সার বিতরণ ও সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, শস্য বহুমুখীকরণসহ অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। স্বাধীনতার ৫০ বছরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ আবাদি ভূমি কমে যাওয়া সত্ত্বেও খাদ্যশস্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদেরও উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে।

২০০৯ সালে খাদ্য ঘাটতি ছিল ২৬ লাখ টন। একই বছরের প্রথম ক্যাবিনেট সভায় সারের দাম কমানোর প্রস্তাব পাস হয়। ৯০ টাকা কেজি সারের মূল্য ২২ টাকায় এবং ৮০ টাকার সার ১৫ টাকায় আনা হয়। বীজ, সেচ ও বিদ্যুতে ভর্তুকিসহ সবকিছু পর্যাপ্ত ও সহজপ্রাপ্য করার পদক্ষেপ নেয়া হয়। একই সঙ্গে পানি সেচের ব্যবস্থা করার জন্য পাম্প চালনার জন্য ডিজেলের মূল্যে ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করার স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর। সেই ধারাবাহিকতায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সরকারি সহায়তায় এবার এই মহামারির মধ্যেই শেষ হয়েছে দেশের ইতিহাসে সবার আগে হাওরাঞ্চলের বোরো ধান কর্তন। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে অঞ্চলভেদে ৫০-৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে প্রায় ৫২ হাজার কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ প্রকল্পের অধীনে বরাদ্দপ্রাপ্ত ২০৮ কোটি টাকার মাধ্যমে সারাদেশে এক হাজার ৭৬২টি কম্বাইন হারভেস্টার, ৩৭৯টি রিপার, ৩৪টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ প্রায় দুই হাজার ৩০০টি বিভিন্ন ধরনের কৃষিযন্ত্র কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে শুধু কৃষি যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিবছর মোট খাদ্যশস্য উৎপাদনের সাত থেকে ১০ ভাগ অপচয় হয়। কৃষিকাজের প্রতিটি স্তরে কৃষিযন্ত্র ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে বছরে আরও ৭০ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য উৎপাদন বেশি হতো। কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন ব্যাপক কৃষি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দানাশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ফসল উৎপাদনে ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কর্তনপূর্ব, কর্তনকালীন ও কর্তনোত্তর সময়ে ফসলের ক্ষতি হয়। বাংলাদেশে দানাশস্যে ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতির পরিমাণ মোট উৎপাদনের ১২-১৫ শতাংশ, যা ফল ও শাকসবজির ক্ষেত্রে প্রায় ২৫-৪০ শতাংশ। বাংলাদেশের মোট উৎপাদনের প্রায় সাত ভাগ গম, ১২ দশমিক শূন্য পাঁচ ভাগ তেলবীজ, ২৫ শতাংশ শাকসবজি এবং আলু, সাড়ে ১২ শতাংশ ডাল ফসল এবং সাড়ে ১০ শতাংশ মরিচ ফসলে কর্তনোত্তর ক্ষতি হয় শুধু দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করার ফলে। খাদ্য সরবরাহ ও জোগানের মধ্যে যে ঘাটতি রয়েছে, তা সঠিক ফসল কর্তনোত্তর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কমানো সম্ভব। অন্যদিকে প্রতিনিয়তই কৃষিকাজে শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়ায় কৃষকরা সঠিক সময়ে ফসল জমিতে লাগাতে পারছে না। ফলে কৃষকদের মাঝে কৃষিকাজে যন্ত্র ব্যবহারের ব্যাপক চাহিদা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কৃষিকাজের এ অবস্থার কারণে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদা বৃদ্ধির ফলে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা।

কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে একটি শব্দ, তা হলো ই-কৃষি। ই-কৃষিকে অনেক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এ সবগুলোকে একত্রিত করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো নির্ভরযোগ্যভাবে কৃষক, কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসায়ী, সংশ্লিষ্ট গবেষক ও বিজ্ঞানী, পরিকল্পনাবিদ, ভোক্তা প্রভৃতি গোষ্ঠীর কাছে দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছে দিতে ইলেকট্রনিক মাধ্যমের (ইন্টারনেট, ইন্ট্রানেট, রেডিও, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ইত্যাদি) ব্যবহারই ই-কৃষি। কৃষিসেবা অনলাইন ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রদানের জন্য বেশ কিছু ই-কার্যক্রম রয়েছে। ‘ডিজিটাল ক্রপক্যালেন্ডার’: জমিতে বছরব্যাপী পরিকল্পনামাফিক চাষবাদ করার জন্য কৃষক ফসল প্যাটার্ন পছন্দ করার পর একটি কার্ড প্রিন্ট করতে পারবে, যেখানে তারিখসহ চাষাবাদ পদ্ধতি, সার, সেচ, বালাই দমন ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা লেখা থাকবে। ‘কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা’: ছবিভিত্তিক কৃষকের চাষাবাদ পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষক ছবি দেখে ১২০টি ফসলের উন্নত চাষপ্রণালি, সার ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং বালাইব্যবস্থাপনা এসব সম্পর্কে জানতে পারবে। ‘অনলাইনে কৃষকের জানালা’ : ছবি দেখে বালাই শনাক্তকরণ এবং তার ব্যবস্থাপনার বর্ণনা এখান থেকে পাওয়া যাবে। ই-কৃষি সেবা বিস্তারের লক্ষ্যে ৬৪টি জেলা থেকে সংগৃহীত খুচরা, পাইকারি ও কৃষকপ্রাপ্ত বাজারদর দৈনিক, সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক ভিত্তিতে অনলাইনের মাধ্যমে পাঠানো হয়, যা পরে ওয়েবসাইটে সহজলভ্য করা হয়ে থাকে।

কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষক লাভবান হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। একই সঙ্গে ফসলের নিবিড়তা বাড়বে। সময় বাঁচার ফলে আলাদা একটা ফসল করা যাবে। এর ফলে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। কৃষি দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে এবং কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়বে। কৃষির ওপর ভিত্তি করে উন্নত বাংলাদেশ হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের টেকসই রূপদানের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় এই দেশে কৃষিভিত্তিক টেকসই শিল্পোন্নয়নের প্রসার ঘটানো সম্ভব।

সবার সম্মিলিত আন্তরিক ও কার্যকর প্রচেষ্টাই আমাদের নিয়ে যাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সর্বোচ্চ সীমানায়। অদূর ভবিষ্যতে আমরা বিনির্মাণ করতে পারব স্বনির্ভর সুখী-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। কথার চেয়ে কাজ বেশি, পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়ন বেশিই হোক আমাদের আন্তরিক অঙ্গীকার। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক আমাদের হƒদয়ের মনমানসিকতার ঐকান্তিক ইচ্ছা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

পিআইডি নিবন্ধন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯১১৫  জন  

সর্বশেষ..