প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায়ে রেকর্ড: গত অর্থবছর টোল আদায় বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি

ইসমাইল আলী: উদ্বোধনের পর থেকেই বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল আদায় বাড়ছে। প্রতিবছরই টোল আদায় কিছুটা বাড়লেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা রেকর্ড সৃষ্টি করে। এ সময় সেতুটিতে টোল আদায় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ২০ শতাংশ। এতে গত অর্থবছরে টোল আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৮৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

এদিকে গত অর্থবছরে সেতুটির টোল আদায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে এটি নিয়ে কিছুটা সংশয়ে রয়েছে সেতু বিভাগ। কারণ ৪০ শতাংশ টোল হার বৃদ্ধি আদায় পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

সেতু বিভাগের তথ্যমতে, ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল আদায় ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সেবার সেতুটিতে টোল আদায় হয় ৩০৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে টোল আদায় কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৩২৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে সেবার তিন মাস সেতুতে যান চলাচল কমে যাওয়ায় টোল আদায় হ্রাস পেয়েছিল।

এদিকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে টোল আদায়ে আবারও গতি আসে। ওই অর্থবছরে সেতুটিতে টোল আদায় হয় ৩৪৯ কোটি তিন লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে টোল আদায় প্রথমবারের মতো ৪০০ কোটি টাকা অতিক্রম করে। সেবার বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ টোল আদায় বেড়েছিল ১৫ দশমিক ২৮ শতাংশ বা ৫৩ কোটি ৩৩ লাখ। সেটিই ছিল সেতুটিতে টোল আদায়ের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি।

পরের অর্থবছর টোল আদায় বৃদ্ধির হার আরও বাড়ে ২০ দশমিক ৪৫ শতাংশ বা ৮২ কোটি ২৯ লাখ। বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল আদায় বৃদ্ধির এটিই সর্বোচ্চ পরিমাণ।

জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতুতে গাড়ি চলাচল গত কয়েক বছর ধরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত অর্থবছরে সেতুতে রেকর্ড পরিমাণ গাড়ি চলাচল করে। এর ফলে টোল আদায় বেড়েছে। এছাড়া নতুন একটি প্রতিষ্ঠানকে বর্তমানে সেতুতে টোল আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা টোল আদায়ে নতুন প্রযুক্তি স্থাপন করেছে। এতে সেতুতে টোল ফাঁকি দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাবেও টোল আদায় বেড়েছে।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু সেতুতে গত ২৪ জুন প্রায় ২৭ হাজার যানবাহন সেতুটি পাড়ি দিয়েছে। সেদিন সেতুতে দুই কোটি ১৫ লাখ টাকা টোল আদায় হয়। চালু হওয়ার ১৯তম বার্ষিকীতে টোল আদায়ে এ রেকর্ড সৃষ্টি হয়।

বর্তমানে সেতুর টোল আদায় করছে কমিউটার সিস্টেম নেটওয়ার্ক (সিএনএস)। সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধু সেতু ব্যবহার করে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ২৬টি জেলায় বিভিন্ন পরিবহন যাতায়াত করে। সেতু উদ্বোধন হওয়ার পর থেকে নিয়মিত টোল আদায় করা হয়। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ঈদ উপলক্ষে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাড়ির চাপ বেড়ে যায়। এতে উত্তরবঙ্গের দিকে ২৪ ঘণ্টায় ১৬ হাজার ৭৭০ বাস-ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহন পার হয়। আর ঢাকার দিকে পার হয়েছে ৯ হাজার ৯৬২টি যানবাহন।

এদিকে গত ২৩ মার্চ সেতুটিতে টোলের হার বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করেন অর্থমন্ত্রী। সে সময় সেতুটিতে যানবাহনভেদে ৩৮ থেকে ৪২ শতাংশ টোল হার বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়। এছাড়া নতুন অন্তর্ভুক্তি হিসেবে চার এক্সেল ও এর অধিক এক্সেলযুক্ত ট্রেইলারকে পৃথক টোলের আওতায় আনা হয়। এছাড়া মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় আগামী বছর থেকে প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে টোল বাড়ানোর প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়।

বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সেতুতে মোটরসাইকেলে টোল আদায় করা হয় ৪০ টাকা, হালকা যান (প্রাইভেট কার, জিপ, পিকআপ, মাইক্রোবাস) ৫০০, ছোট বাস ৬৫০, বড় বাস ৯০০, ছোট ট্রাক ৮৫০, মাঝারি ট্রাক এক হাজার ১০০ ও বড় ট্রাকে এক হাজার ৪০০ টাকা। নতুন হার কার্যকর হলে টোলের পরিমাণ দাঁড়াবে মোটরসাইকেলে ৫৫ টাকা, হালকা যানে ৭০০, ছোট বাসে ৯০০, বড় বাসে এক হাজার ২৫০, ছোট ট্রাকে এক হাজার ২০০, মাঝারি ট্রাকে এক হাজার ৫৫০ ও বড় ট্রাকে দুই হাজার টাকা। এর বাইরে ৪ এক্সেল পর্যন্ত ট্রেইলারে চার হাজার এবং এর বেশি হলে প্রতি এক্সেলের জন্য অতিরিক্ত এক হাজার ৫০০ টাকা হারে টোল দিতে হবে।

তবে টোলের হার বৃদ্ধির এ হার কার্যকর নিয়ে সংশয়ে রয়েছে খোদ সেতু বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৯৮ সালে উদ্বোধনের ১৩ বছর পর প্রথম টোল হার বাড়ানো হয়। ২০১১ সালে ৩৫ শতাংশ টোল বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিল সেতু বিভাগ। অর্থ মন্ত্রণালয় তা কমিয়ে ২০ শতাংশ অনুমোদন করে। আর প্রধানমন্ত্রী তা আরও কমিয়ে মাত্র ১২ শতাংশ টোল বৃদ্ধির অনুমোদন দেন। এবার ৪০ শতাংশ প্রস্তাব করলে পুরোটাই অনুমোদন করেন অর্থমন্ত্রী। তবে এতটা টোল বৃদ্ধি কার্যকর করা কঠিন। এজন্য প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে।

জানতে চাইলে খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। তার অনুমোদনের পর বর্ধিত হার কার্যকর করা হবে।