দিনের খবর প্রচ্ছদ বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

বছরে বন্দরের লোকসান ৮০ কোটি টাকা

দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত। এ বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্পাদন হয় ৯২ শতাংশেরও বেশি। তাই কর্ণফুলী নদীতে নৌ-বাণিজ্য কার্যক্রম বজায় রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং বা খনন করা প্রয়োজন। কিন্তু নানা জটিলতায় ব্যাহত হচ্ছে ড্রেজিংয়ের কাজ। এতে সংকুচিত হচ্ছে কর্ণফুলী, ভোগান্তিতে পড়ছে নগরবাসী। ফলে বন্দর ব্যবসায়ীরা গুনছেন আর্থিক লোকসান। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করে শেয়ার বিজ। এ নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে শেষ পর্ব

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: কর্ণফুলীর সদরঘাটে ২০১৩ সালে তৈরি করা হয় চারটি লাইটারেজ জেটি। এসব জেটির অবকাঠামোগত সুবিধা থাকলেও শুধু জেটির সামনে ড্রেজিং না হওয়ায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। এরমধ্যে এসব লাইটারেজ জেটি দেশের বৃহৎ চারটি শিল্পগ্রুপকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বরাদ্দের এক বছরেও তারা তা ব্যবহার করতে পারেনি। এতে জেটি থেকে বছরে ৮০ কোটি টাকা আয় বঞ্চিত হচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও নিজস্ব জেটিতে পণ্য খালাসের সুবিধা না পেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় গুনছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নির্মাণের প্রাক্কালে নদীতে পলি জমার হার বৃদ্ধি পেলে বন্দর চ্যানেলের নাব্য উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পায়। এ অবস্থায় ২০১২ সালের মে মাসে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পের আওতায় সরদঘাটে লাইটারেজ জাহাজের জন্য ৪০০ মিটার দীর্ঘ ও ১৫ মিটার প্রশস্ত একটি জেটি নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হয়। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘ পাঁচ বছর বন্ধ থাকে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের কার্যক্রম। এ সময়ে পলি জমে কর্ণফুলী নদী ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক নাব্য হারিয়ে ফেলে, ভাটার সময় দেখা যায় তার রুগ্ণ দশা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য আবারও ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পলিথিনের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে প্রত্যাশিত মাত্রায় কাজ করতে পারছে না বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এ প্রকল্পের কাজ প্রায় ১৪ মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি মাত্র ১৮ শতাংশ। যদিও একই সময়ে ১ নম্বর জেটিটি খাদ্যশস্যের জন্য বিএসএম গ্রুপকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর ২, ৩ ও ৪ নম্বর জেটি লৌহ ও ইস্পাতশিল্পের জন্য বিএসআরএম, কেএসআরএম ও আবুল খায়ের স্টিলকে এবং ৫ নম্বর জেটি সিমেন্ট ও ক্লিংকার শিল্পের জন্য কনফিডেন্স সিমেন্টকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব জেটি থেকে বন্দরের বছরে আয় হবে ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কনফিডেন্স সিমেন্ট জেটি ব্যবহার করলেও তেমন স্বস্তিতে নেই। অন্যদিকে বিএসআরএম, বিএসএম গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ এবং কেএসআরএম এখনও জেটিগুলো ব্যবহার করতে পারছে না। আর এসব জেটিগুলো আগামী ১০ বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রকল্প শুরু থেকে নানা জটিলতায় সম্মুখীন ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ প্রকল্প। নদীর সাত মিটার গভীরে মিলছে পলিথিন। এখনও মাটির দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে বদলাতে হয়েছে একাধিক ড্রেজার। আর এ কারণে পদে পদে ব্যাহত হচ্ছে ২৫৮ কোটি টাকার প্রকল্প। ফলে নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে কবে চালু করা যাবে লাইটারেজ জেটিগুলো। এক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে জেটির মুখে ড্রেজিং শেষ করা।

নৌযান ও শিপিং এজেন্ট সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অনেক স্থানে পলি জমেছে। ফলে বাকলিয়া অংশে বিশাল চর জেগে উঠেছে। পাশাপাশি নদীর গভীরতাও অনেক কমেছে। এছাড়া অনেক সময় নৌ-দুর্ঘটনায় ডুবে যাওয়া জাহাজগুলো তোলা হয়নি। এতে অনেক সময় নৌযান আটকে যাচ্ছে কিংবা জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে ঝুঁকিতে আছে নৌযান চলাচল প্রক্রিয়া। পাশাপাশি বাড়ছে পরিচালনা ব্যয়।

সদরঘাটে জেটি বরাদ্দ পাওয়া বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা সদরঘাটে একটা লাইটারেজ জেটি বরাদ্দ পেয়েছি; যা এখন পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারিনি। এখন আমাদের জেটির খুব চাহিদা আছে। যত দ্রুত বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদের ড্রেজিং করে দেবে, তত আমরা উপকৃত হবো। এতে আমাদের কাজে গতিশীল হবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার এম আরিফুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা মেইনলি ফোকাস করেছি চার মিটারের জেটিকে। এ জেটিগুলো ২০১৩ সালে তৈরি করা। এখনও একদিনের জন্যও ব্যবহার করতে পারিনি। তৈরি করতে তো খরচ হয়েছে। বিএসআরএম, কেএসআরএম, বিএসএম, আবুল খায়ের, কনফিডেন্স সিমেন্টকে দেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী তাদের কাছ থেকে ২০ কোটি টাকা আয় হবে। অপারেশনাল করতে গেলে, শুধু ৪০০-৫০০ মিটার যদি একবার ড্রেজিং করে ফেলতে পারি, যতই ভরাট হোক, মেইনটেন্যান্স করতে বছরে পাঁচ কোটি টাকা লাগবে। আয় হলেও খরচ করতে সমস্যা তো নেই। তিনি আরও বলেন, একটা অসুবিধা হচ্ছে, আমরা যে যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করছি, তা খুবই ছোট ও মান্ধাতার আমলের টেকনোলজি। কিন্তু এখানে এগুলো ছাড়া কোনো উপায় নেই। এখন কাজের গতি অনেক কম।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..