প্রচ্ছদ শেষ পাতা

বছরে রেলের আয় বেড়েছে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা

বেসরকারি খাতে ইজারা

ইসমাইল আলী: জনবল সংকট, আয় কম ও লোকসানের কারণে আট রুটের ২১ জোড়া (৪২টি) লোকাল ও মেইল ট্রেন বেসরকারি খাতে ইজারায় দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। যদিও ইজারা নেওয়া চার প্রতিষ্ঠানই ট্রেনগুলো পরিচালনা থেকে মুনাফা করছে। পাশাপাশি ট্রেনগুলো থেকে রেলের আয়ও বেড়ে গেছে। রেলওয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে দেখা যায়, ইজারা দেওয়া ২১ জোড়া ট্রেন থেকে রেলের আয় বেড়ে গেছে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। যদিও বেসরকারি খাতে ইজারা বাতিল করে সব ট্রেন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এজন্য বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ শেষে নতুন করে ট্রেন ইজারা না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
তথ্যমতে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সুপারিশে রেলওয়ের পরিচালনা কার্যক্রম উন্নয়নে রিকভারি প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছিল। এর আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ে অথরিটির (বিআরএ) পঞ্চম সভায় যাত্রীবাহী ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে ১৯৯৭ সালের ৭ জুলাই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের সাত জোড়া (১৪টি) লোকাল ট্রেন বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়ে দাঁড়ায় ১৩ জোড়া (২৬টি)। পাশাপাশি আরও আট জোড়া মেইল (কমিউটার) ট্রেন ইজারা দেওয়া হয়। এগুলো হলো: ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ বাজার রুটের জামালপুর কমিউটার, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের কর্ণফুলী কমিউটার, ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটের তিতাস কমিউটার, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটের সাগরিকা কমিউটার, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-জারিয়া ঝাঞ্জাইল রুটের বলাকা কমিউটার, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ বাজার রুটের দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার, ঢাকা-মোহনগঞ্জ রুটের মহুয়া কমিউটার এবং ঢাকা-আখাউড়া রুটের তিতাস কমিউটার ট্রেন।
প্রতিবেদনে ট্রেনগুলো ইজারা দেওয়ার আগের ও পরের আয়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ১৩ জোড়া ট্রেন ইজারায় পরিচালনা করছে মেসার্স এসআর ট্রেডিং। ইজারার আগে ট্রেনগুলো থেকে মাসে রেলের আয় হতো প্রায় ১৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। আর ইজারা দেওয়ার পর আয় হচ্ছে প্রায় ৩১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ আয় বেড়েছে ১৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
একই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে কর্ণফুলী কমিউটার ও দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার। ইজারা দেওয়ার আগে ট্রেন দুটি থেকে রেলওয়ের আয় হতো যথাক্রমে ১১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ও ১৯ লাখ ২০ হাজার টাকা। বর্তমানে ট্রেন দুটি থেকে আয় হচ্ছে যথাক্রমে ৩০ লাখ ৮১ হাজার টাকা ও ৪০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ কর্ণফুলী কমিউটার থেকে রেলওয়ের আয় বেড়েছে প্রায় ১৯ লাখ ২২ হাজার টাকা এবং দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার থেকে আয় বেড়েছে ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
এদিকে মেসার্স এলআর ট্রেডিং ইজারা নিয়েছে জামালপুর কমিউটার ট্রেনটি। এ ট্রেন থেকে বর্তমানে রেলের আয় হচ্ছে ৩১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। আগে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ ট্রেনটি থেকে রেলের আয় বেড়েছে মাসে ১৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
মেসার্স এনএল ট্রেডিং পরিচালনা করছে সাগরিকা কমিউটার ও বলাকা কমিউটার ট্রেন দুটি। ইজারা দেওয়ার আগে এ দুই ট্রেন থেকে রেলের আয় ছিল যথাক্রমে ১৩ লাখ ৯০ হাজার ও ১০ লাখ ২৪ হাজার টাকা; বর্তমানে যা বেড়ে হয়েছে ১৯ লাখ ৫০ হাজার ও ১৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা। অর্থাৎ দুই ট্রেন থেকে রেলের আয় বেড়েছে যথাক্রমে পাঁচ লাখ ৬০ হাজার ও সাত লাখ ৩৮ হাজার টাকা।
এর বাইরে ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটের তিতাস কমিউটার, মহুয়া কমিউটার ও ঢাকা-আখাউড়া রুটের তিতাস কমিউটার ইজারায় পরিচালনা করছে মেসার্স টিএম ট্রেডিং। এ তিন ট্রেন থেকে রেলের আয় ছিল যথাক্রমে পাঁচ লাখ ২০ হাজার টাকা, পাঁচ লাখ ৭১ হাজার ও পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। তবে ইজারায় দেওয়ার পর ট্রেন তিনটি থেকে আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১১ লাখ ৩৮ হাজার, ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ও ১২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ তিন ট্রেন থেকে রেলের মোট আয় বেড়েছে ২৬ লাখ টাকার বেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২১ জোড়া ট্রেন বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ায় মাসে রেলের অতিরিক্ত আয় হচ্ছে প্রায় এক কোটি ১১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এছাড়া ট্রেনগুলোর টিকিট চেকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কমপক্ষে ৮৬ জন টিটিই প্রয়োজন হচ্ছে না। এছাড়া টিকিট ছাপানো, বুকিং সহকারী নিয়োগেও কোনো ব্যয় নেই। ফলে আরও প্রায় ১০ কোটি টাকা রাজস্ব সাশ্রয় হচ্ছে রেলের।
এদিকে গত ১৮ মার্চ এ সভায় রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, বর্তমানে দেশে বেশকিছু ট্রেন বেসরকারি খাতে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২০ সালে বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের এসব ট্রেন পরিচালনা চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এরপর থেকে আর কোনো ট্রেন বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে না।
সে সময় রেলওয়ে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোটি কোটি টাকায় ইঞ্জিন-কোচ কেনা হবে আর ম্যানেজমেন্ট দুর্বলতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেন চালাবেÑতা হতে পারে না। সবকিছু যদি বেসরকারি কোম্পানির হাতে দেওয়া হয়, তবে কোনো সুফল জনগণ পাবে না।

সর্বশেষ..