দিনের খবর সারা বাংলা

বছরে ১১ কোটি ঘনফুট মাটি ইটভাটায়

নষ্ট হচ্ছে গ্রামীণ অবকাঠামো

জুনায়েদ আহম্মেদ, লক্ষ্মীপুর: এক হাজার ৪৫৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে লক্ষ্মীপুর। জেলায় ছোট-বড় ১৩০ ইটভাটায় বছরে প্রায় ১০০ কোটি ইট তৈরি হয়। ইট তৈরিতে প্রায় ১১ কোটি ঘনফুট (সিএফটি) মাটি ব্যবহার করা হয় বলে জানিয়েছেন ইটভাটা কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, এর পুরোটাই ফসলি জমির মাটি। এগুলো আনা হয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্মিত গ্রামীণ রাস্তা দিয়ে। এসব মাটি পরিবহনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাস্তাগুলো, ক্ষয়-ক্ষতির মুখে পড়ছে এসব পথে চলাচলকারী যানবাহন। ধুলাবালিতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, কষ্ট হচ্ছে পথচারীদের।

মাটি কেটে নেয়ায় অস্বাভাবিকভাবে কমছে কৃষিজমি। প্রতি বছর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভাটার সংখ্যা। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে মৌসুমি মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত এসব ইটভাটার কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক ও নদীভাঙনকবলিত জেলা লক্ষ্মীপুরের পুরো চিত্র এখন এমন। ফলে জনমনে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ। এর বিরুদ্ধে জেলার পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। মৌসুমি মাটি ব্যবসায়ী ও ইটভাটার স্বত্বাধিকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেয়াকে এক্ষেত্রে দায়ী করছেন অনেকে।

জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও জেলা কৃষি বিভাগ কার্যালয়ের প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৬ সালে জেলায় ইটভাটা ছিল ৭৫টি, যা ২০২১ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৩০টিতে। অর্থাৎ বছরে বেড়েছে ১১টি করে। সদর উপজেলায় ৬৮ ইটভাটা রয়েছে। অন্য উপজেলার মধ্যে রামগঞ্জে ২১, রামগতিতে ২৩ ও কমলনগরে ১৩ ও রায়পুরে পাঁচটি ইটভাটা রয়েছে।

‘ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৯’-এর তথ্য থেকে জানা যায়, আবাসিক এলাকা ও কৃষিজমিতে কোনো ইটভাটা তৈরি করা যাবে না। ইট তৈরি করার জন্য মজা পুকুর, খাল, দীঘি, নদ-নদী ও পতিত জমি থেকে মাটি সংগ্রহ করার কথা উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু এর কিছুই মানছে না ভাটার মালিকরা। ওই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে পোড়া ইট শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।

ইটভাটা নির্মাণে অনুমোদিত জমি তিন একর হলেও ভাটার মালিকরা দখল করছে কমপক্ষে ৯ থেকে ১০ একর। সে হিসেবে ইটভাটার দখলে প্রায় এক হাজার একর জমি চলে গেছে। লক্ষ্মীপুরে প্রতিবছর ইটের চাহিদা কত, এর জন্য কত ভাটার প্রয়োজনÑএমন কোনো তথ্য কারও কাছে পাওয়া যায়নি। ইটভাটার পাশের জমিতে ফসল হয় না। ফলে ভাটার মালিকদের কাছে অনেকটা বাধ্য হয়ে জমির মাটি বিক্রি করছে কৃষক। ইটভাটার মালিকরা নীতিমালা না মেনে গড়ে তুলছে ভাটা, প্রশাসন নিচ্ছে না দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরেজমিনে কয়েকটি ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, সদর উপজেলার তেয়ারিগঞ্জ ইউনিয়নে ভাটা রয়েছে ১৯টি। এর মধ্যে শুধু ৭নং ওয়ার্ড আন্দারমানিক গ্রামে রয়েছে ৯ ভাটা। অথচ পুরো ইউনিয়নটিই কৃষিভিত্তিক এলাকা। এ ছাড়া সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, বাঙ্গাখাঁ, রামগঞ্জ উপজেলার দরবেশপুর, ভোলাকোট ও রামগতি উপজেলার চররমিজে ইটভাটা গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এসব ভাটায় জ্বালানো হচ্ছে কাঠ, উজাড় হচ্ছে বন।

ইট তৈরিতে কী পরিমাণ মাটির ব্যবহার ও একটি ভাটায় বছরে কী পরিমাণ ইট তৈরি হয় এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কথা হয় সদর উপজেলার একটি ভাটার ম্যানেজার কামরুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, ইটের সাইজ  অনুসারে একটি কাঁচা ইট তৈরিতে মাটি লাগে শূন্য দশমিক শূন্য ৮৫ ঘনফুট। বছরের অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিটি ভাটায় কমপক্ষে গড়ে আট রাউন্ড ইট পোড়ানো হয়। প্রতি রাউন্ডে ১০ লাখ ইট থাকে। তার দেয়া তথ্যমতে, একেকটি ভাটায় বছরে কমপক্ষে ৭০ লাখ ইট পোড়ানো হয়। এ হিসেবে লক্ষ্মীপুরে ১৩০ ইটভাটার জন্য বছরে ১১ কোটি ঘনফুট মাটি প্রয়োজন, যেখান থেকে প্রায় ১০০ কোটি ইট তৈরি হয়। ইট তৈরির কারিগর ইউসুফ, মাঝি হাসানসহ আরও কয়েকজন একই তথ্য দেন।

তারা আরও জানান, ইট পোড়ানোর সংখ্যা রেজিস্টার বইতে লেখার কথা থাকলেও ভাটার মালিকরা প্রকৃত সংখ্যা লেখেন না। প্রকৃত সংখ্যা না লেখার কারণ জানতে চাইলে তারা জানান, ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার জন্যই প্রকৃত সংখ্যা লেখা হয় না।

সদর উপজেলার বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়নের মিরিকপুর গ্রামের কৃষক জামাল মিয়া জানান, তার ক্ষেতের পাশে ইটের ভাটা। রাতদিন সেখানে পুড়ছে ইট, উড়ছে ধোঁয়া। আর গ্রামের সব পাকা ও আধা পাকা রাস্তায় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাটিবাহী গাড়ির চলাচলে জনজীবন অতিষ্ঠ। অধিকাংশ চালকের নেই লাইসেন্স। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রতিদিন প্রতিটি ভাটায় কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০টি ট্রাক মাটি নিয়ে ঢুকে। ইটভাটা ও আশপাশের গ্রামজুড়ে যেন মাটি কাটার মহোৎসব চলছে।

তেয়ারিগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা শিক্ষক কামাল হোসেন জানান, কয়েক ইটভাটা পরিবেশ ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র, বিএসটিআইসহ যাবতীয় অনুমোদন নিয়ে কাগজে-কলমে বৈধ। কিন্ত এসব কাগজ নেই বা কম আছে, তারা আইনে অবৈধ। অথচ বৈধ ও অবৈধ সবার ইট তৈরি প্রক্রিয়া, ভাটা এলাকা, জ্বালানি ব্যবহার, মাটি সংগ্রহ প্রক্রিয়া সবই অবৈধ।

সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়নের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জনপ্রতিনিধি জানান, কোনো তদারকি ছাড়া ছাড়পত্র দিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তিন ফসলি জমিকে অনাবাদি দেখিয়ে ছাড়পত্র দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। এভাবে পরিবেশ সদনপত্র নিয়ে কৃষিজমি, গ্রামের রাস্তাঘাট ও পরিবেশ ধ্বংস করে মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে। প্রশাসনের তরফ থেকে কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে মৌসুমি মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের জেবি ইটভাটার এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে জানান, ইটে ব্যাপক লাভ। সে কারণে কিছু লোক ইটভাটা নির্মাণে মরিয়া। সে কারণে বছর বছর বাড়ছে ইটভাটা। তার মতে, মাটি ব্যবসায়ী ও ভাটার মালিকরা বেশিরভাগই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অনেক ব্যবসায়ী জোর করে কৃষকের জমিতে ভাটা দিচ্ছে, মাটি নিচ্ছে।

কমলনগরের তোরাবগঞ্জ গ্রামের বেড়ির পাশে থাকেন মরিয়ম বেগম। তিনি জানান, গত বছর বাড়ির পাশের একটি ভাটার ধোঁয়ায় তার বাড়ির অনেক গাছ মরে গেছে। ভাটার মালিকরা টাকা দিয়ে সব রাতারাতি ম্যানেজ করে ফেলছে।

সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগে ফসলি জমির মাটি লুট এবং ইটভাটা মালিক ও মাটির দালালদের দৌরাত্ম্যের বিষয়টি তুলে ধরেন আহমেদ জাকারিয়া নামে এক ভুক্তভোগী। এ ছাড়া স্থানীয় অনেক মানুষ নানা সময় জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। কৃষি কার্ডধারী কৃষকদের ব্যানারে মানববন্ধন হয়েছে, শোভাযাত্রা হয়েছে; কিন্তু কাজ হয়নি।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম পাটোয়ারী জানান, গ্রামীণ রাস্তাগুলো ইটভাটার কারণে টেকানো যাচ্ছে না। অথচ স্থানীয় সরকার বিভাগের কোনো সড়কের পাশে ইটভাটা নির্মাণের কোনো নিয়ম নেই। তিনি উল্টো প্রশ্ন রাখেন, আমরা কীভাবে এটা বন্ধ করব? ইটভাটা অনুমোদনের জন্য যে কমিটি আছে তাতে তো স্থানীয় সরকার বিভাগের কেউ নেই।

লক্ষ্মীপুরে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অফিস নেই। এখানকার পরিবেশ-সংক্রান্ত বিষয় দেখাশোনা করে পরিবেশ অধিদপ্তরের নোয়াখালী জেলা অফিস। সরেজমিনে পরিদর্শন না করে কিংবা নীতিমালা না দেখে পরিবেশ ছাড়পত্র দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াখালী পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তানজিদ তারেক জানান, সব জানে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক। আমরা জেলা প্রশাসককে তথ্য দিই।

বৈধ কাগজপত্র নিয়ে অবৈধ ইটভাটা পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ বলেন, ইটভাটার নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন অভিযান শুরু করেছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..