দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

বছর ঘুরলেই বাড়ছে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি

শেখ আবু তালেব: মন্দা পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ আয় কমছে। ব্যাংক খাতের তারল্য প্রবাহ কমে যাওয়া এবং একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে। এতে বৃদ্ধি পেয়েছে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়। অপরদিকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আয় বৃদ্ধি পেলেও বছর ঘুরলেই বাড়ছে তহবিল ব্যবস্থাপনা খরচ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

দেশে বর্তমানে ৩৪টি ব্যাংকবহির্র্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) রয়েছে। মোট এনবিএফআই’র মধ্যে ২৩টি দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। এর মধ্যে পিপলস লিজিং অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

একটি নীতিমালা জারি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যয়ের চিত্র প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালা অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব সংগৃহীত আমানত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের পাশাপাশি কম সুদের বিদেশি তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের চিত্র আলাদাভাবে প্রকাশ করতে হয়।

এ-সংক্রান্ত হাল নাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী বছরের নভেম্বর শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনার গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫১ শতাংশে। এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৮ সালের এই সময়ে যা ছিল ৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে শূন্য দশমিক ২২ শতাংশীয় পয়েন্ট।

অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া কম সুদের অর্থের গড় তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬২ শতাংশে। এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৮ সালের এই সময়ে যা ছিল ১০ দশমিক শূন্য আট শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়েছে শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। আর তিন বছর আগে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ব্যয়ের এ দুই হার ছিল যথাক্রমে সাত দশমিক ৭৬ শতাংশ ও আট দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ তিন বছর ধরেই অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা খরচ।

এসব খরচ বৃদ্ধির বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতের বড় উৎস হচ্ছে ব্যাংক। তবে গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ঋণ-আমানত (এডিআর) অনুপাত নির্ধারিত সীমায় নামিয়ে আনতে অনেক ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে আমানত সংগ্রহ করেছে। ফলে আমানত সংগ্রহে সুদ বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকগুলো আমানত তুলে নিচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনিয়ম এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এতে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি বেশি। ফলে তহবিল ব্যবস্থাপনা খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের বড় একটি অংশ আসে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ থেকে। এছাড়া ব্রোকারেজ কমিশন ফি, সেবা চার্জ ও পরিচালন মুনাফাও যোগ হয়। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে ঋণ ও আমানত প্রবাহ কমে গিয়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায়।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২৩ প্রতিষ্ঠানের কমিশন, শেয়ারে বিনিয়োগ ও ব্রোকারেজ আয় কমেছে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর হিসাবে এ খাতে মোট পরিচালন আয় কমেছে ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। অপরদিকে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে সাত দশমিক ৬০ শতাংশ। কর-পরবর্তী মুনাফা কমেছে ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ। ৯টি প্রতিষ্ঠানের কর-পরবর্তী মুনাফায় ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ সুদহার অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। যেসব প্রতিষ্ঠানের দক্ষ ব্যবস্থাপনা আছে, তারা ভালো থাকলেও সমস্যায় পড়ছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো। খেলাপি ঋণও বৃদ্ধি পাচ্ছে উদ্বেগজনকভাবে। এজন্য সামগ্রিক খাতটি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা যাচ্ছে সব মহলে। ফলে বছর শেষে অনেক প্রতিষ্ঠানেরই শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ কমে যাবে।

ব্যাংকগুলো বিভিন্ন মেয়াদে আমানত নিতে পারলেও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান তা পারে না। বিদ্যমান নিয়মে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তিন মাসের কম মেয়াদের জন্য কোনো আমানত নিতে পারে না। ফলে গ্রাহকের কাছ থেকে সরাসরি আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করে থাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। আর ব্যাংকের চেয়ে বেশি সুদে ঋণ বিতরণ করে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে প্রতিষ্ঠানের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ব্যাংকের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হয় সব সময়।

জানা গেছে, ২০১৩ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ডাবল ডিজিট বা ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে একটি নীতিমালা প্রকাশ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ও আমানতের সহজলভ্যতার ফলে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে কমে আসছিল এনবিএফআই’র সমন্বিত তহবিল ব্যয় ব্যবস্থাপনা। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কমতে থাকে। একপর্যায়ে তা আট দশমিক ২১ শতাংশে নেমে যায়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..