মত-বিশ্লেষণ

বজ্রপাতে প্রাণহানি ও ক্ষতি কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি

ড. ফোরকান উদ্দিন আহমদ: বলা হয়ে থাকে বজ্রপাত প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি। তবে এটি মানুষের পরিচিত সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর একটিও বটে। সম্প্রতি বাংলাদেশসহ পৃথিবীজুড়ে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাত জেলায় বজ্রপাতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে ফরিদপুরের দুই উপজেলায় বজ্রপাতে নারীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন সালথা উপজেলার কাগদি স্বজনকান্দা গ্রামের ইদ্রিস মোল্লর স্ত্রী হাসি বেগম, বাতা গ্রামের ইসমাইল মোল্লার ছেলে বিলাল মোল্লা এবং নগরকান্দা উপজেলার দক্ষিণ বিলনালিয়া গ্রামের পাচু ব্যাপারীর ছেলে ইমরান ব্যাপারী।
প্রায় একই সময় বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে দুই স্থানে বজ্রপাতে স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজন মারা যান। এ সময় আহত হন আরও দুজন। নিহতরা হলেন উপজেলার কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের ডাকাতমারা চর এলাকার আমিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ফেলানী খাতুন এবং একই ইউনিয়নের চরবাটিয়া গ্রামের তহসিন আলীর ছেলে সুমন মিয়া।
এর আগে ভোর সাড়ে ৬টায় পটুয়াখালীর গলাচিপায় বজ্রপাতে মতিউর রহমান ফরাজী নামে
এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার
গজালিয়া ইউনিয়নের হরিদেবপুর গ্রামের মৃত ধলু ফরাজীর ছেলে।
এছাড়া দুপুরে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় জমিতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে কৃষক মঙ্গল চন্দ্র সরকার মারা যান। একই দিনে বেলা ৩টায় মাগুরায় জমি চাষ করার সময় বজ্রপাতে কৃষক ওয়ালিদ বিশ্বাস নিহত হন। তিনি সদর উপজেলার নলদাহ গ্রামের অরুণ বিশ্বাসের ছেলে। প্রায় একই সময় সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে বজ্রপাতে মারা যান ধুইতা শেখ নামের এক কৃষক। অন্যদিকে সন্ধ্যায় জামালপুরের মাদারগঞ্জে পৃথক দুই স্থানে বজ্রপাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন উপজেলার জোড়খালী ইউনিয়নের খিলকাঠি গ্রামের টিটু মিয়ার ছেলে সারোয়ার হোসেন এবং একই ইউনিয়নের চরগোলাবাড়ী নামাপাড়া গ্রামের গনি মিয়ার ছেলে রাসেল। (শেয়ার বিজ, ২৩ আগস্ট)।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামান্য বৃষ্টিপাত বা ঝড়ো বাতাসেও ঘটছে বজ্রপাত। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে ২০১৮ সালে ২৯৭ জন, ২০১৭ সালে ৩০৬ জন, ২০১৬ সালে ২৪৫ জন ও ২০১৫ সালে ১৮৬ জন বজ্রপাতে মারা গেছে। সরকার অতিসম্প্রতি বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। এর প্রতিরোধ বা প্রতিকার এখন পর্যন্ত বিদ্যমান কোনো প্রযুক্তির দ্বারা সম্ভব নয়। তবে কিছু সাবধানতা বা সতর্কতা অবলম্বন করে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব। বজ্রপাতের আঘাত থেকে রেহাই পেতে হলে কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সবার জেনে রাখা ভালো।
বজ্রপাতের শঙ্কা থাকলে পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। ঘনঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু জায়গায় যাওয়া যাবে না। এ অবস্থায় সবচেয়ে ভালো হয়, যদি কোনো দালানের নিচে আশ্রয় নেওয়া যায়। উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকতে হবে। উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের শঙ্কা বেশি থাকে। খোলা জায়গায় কোনো গাছ থাকলে তা থেকে অন্তত চার মিটার দূরে থাকতে হবে। এ ছাড়া ফাঁকা জায়গায় কোনো যাত্রীছাউনি, নদী, বিল, মাঠঘাট বা বড়ো গাছ ইত্যাদিতে বজ্রপাত হওয়ার শঙ্কা অত্যন্ত বেশি থাকে। ঘরে থাকলে জানালা থেকে দূরে থাকতে হবে। জানালা বন্ধ রাখতে হবে। ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলতে হবে। বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা যাবে না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করা যাবে না। বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হবে। বজ্রপাতের আভাস পেলে আগেই এগুলোর প্লাগ খুলে সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। অব্যবহƒত যন্ত্রপাতির প্লাগ আগেই খুলে রাখতে হবে। বজ্রপাতের সময় রাস্তায় গাড়িতে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার চেষ্টা করতে হবে। বজ্রপাত হলে গাড়ি পাকা ছাউনির নিচে রাখতে হবে। এ সময় গাড়ির কাচে হাত দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালিপায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। যদি একান্ত বেরোতেই হয় তাহলে পা ঢাকা জুতা পরে বের হতে হবে। রবারের গামবুট এক্ষেত্রে সব থেকে ভালো কাজ করবে। খোলা জায়গায় বা ফসলের মাঠে কাজ করা অবস্থায় আশ্রয়ের জায়গা না থাকলে যতটা সম্ভব নিচু হয়ে গুটিসুটি মেরে বসে পড়তে হবে। কোনো অবস্থাতেই মাটিতে শোয়া যাবে না। জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। বজ্রপাতের সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হবে। নৌকায় থাকলে ছইয়ের নিচে থাকতে হবে।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর ২০টি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑবজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ না করা। প্রতিটি ভবনে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন। ঝড়বৃষ্টির সময় খোলা স্থানে অনেকে মিলে একত্রে অবস্থান না করা। সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে চলে যাওয়া। খোলা জায়গা বা কোনো বড়ো গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া। বৈদ্যুতিক তারের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা এবং যন্ত্রপাতির বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন রাখা। এপ্রিল-জুন মাসে বজ্রপাত বেশি হয়, তাই এ সময়ে আকাশে মেঘ দেখা গেলে ঘরে অবস্থান করা এবং যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত।
জরুরি প্রয়োজনে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে সংস্থাটি বলেছে, ‘ঘন কালো মেঘ দেখা গেলে অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে বের হতে পারেন। উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার, ধাতব খুঁটি ও মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকুন। খোলা জায়গা, মাঠ বা উঁচু স্থানে থাকবেন না।’
বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতন হলে এ দুর্যোগ থেকে অনেকাংশেই রক্ষা পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে গবেষণা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। বিশেষ করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জনসাধারণকে সচেতন ও সজাগ করে তোলা প্রয়োজন, যাতে বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা এড়ানো যায়। বজ্রপাত নিয়ে গবেষণার বিষয়টিকে সরকারের পক্ষ থেকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
অস্বাভাবিক খরা, বন্যা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বজ্রপাত বৃদ্ধির জন্যও ভূমণ্ডলের উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রবণতাকে দায়ী করছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলেই বজ্রপাত ও এতে মৃত্যুর হার বেশি। গ্রামেগঞ্জে আজকাল তাল, নারিকেল, সুপারি, বট প্রভৃতির মতো বড় বড় গাছের অভাব, বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা না থাকা, কৃষি যন্ত্রপাতিতে ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণেও বজ্রপাতের হার বাড়ছে বলে অনেকের ধারণা। বাংলাদেশে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বজ্রপাতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বজ্রপাত সবচেয়ে বেশি হয়। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪০টি বজ্রপাত হয়ে থাকে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ঝড়-বৃষ্টির পাশাপাশি এখন বজ্রপাতের পূর্বাভাসও দেওয়া হয়। বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে হলে নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস শোনা এবং সে অনুযায়ী সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরে যে হারে বজ্রপাতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ বজ্রপাত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মারা গেছে প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ। বছরে গড়ে ৮০ থেকে ১২০ দিন বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। বজ্রপাত থেকে বাঁচতে তাই সচেতনতার বিকল্প নেই। সতর্ক হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেতে পারে।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..