পাঠকের চিঠি

বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে তালবীজ রোপণ কর্মসূচি

পাঠকের চিঠি

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট এই সাত মাসে সারা দেশে বজ্রপাতে ২৪৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ সময়ে বজ্রাঘাতে আহত হয়েছেন ৯৭ জন। সাত মাসে নিহতদের মধ্যে ৩০ নারী, ছয় শিশু, আট কিশোর-কিশোরী ও ২০২ পুরুষ রয়েছেন। জানুয়ারিতে বজ্রপাতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালের তথ্যের ভিত্তিতে ‘সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন সম্প্রতি এ তথ্য প্রকাশ করে।
এতে বলা হয়, ঝড়ের সময় ধান কাটতে গিয়ে ক্ষেতে বজ্রপাতের শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এরপর বেশি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বজ্রপাতের সময় মাছ ধরতে গিয়ে। এছাড়া মাঠে গরু আনতে গিয়ে এবং টিন ও খড়ের ঘরে অবস্থান ও ঘুমানোর সময় বজ্রাঘাতে বেশি মানুষ মারা গেছে। বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সময় অজ্ঞতাবশত লম্বা গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়ার সময় গাছে বজ্রপাত হওয়ায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
কয়েক বছর ধরে দেশে বজ্রপাতে অধিক মৃত্যুর বিষয়টি বলা যায় আতঙ্ক তৈরি করেছে। বৈশাখ থেকে পুরো বর্ষা মৌসুমেই এ দুর্যোগ লক্ষ করা যায়। বর্তমানে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুর ক্ষেত্রে বজ্রপাতের স্থান সবার ওপরে। স্যাটেলাইট থেকে নেওয়া ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে মে এ তিন মাসে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে। দেশের অন্যান্য অংশেও বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা কম নয়। অবস্থা দেখে বজ্রপাতকে সরকার ২০১৫ সালেই দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
এ থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্যোগও লক্ষ করা যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশ, বজ্রপাত কমাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ গাছ বজ্রপাতনিরোধী; আবার এর ফল ও রস বিক্রি করে আয় করা যেতে পারে। তালগাছের কাঠ ব্যবহার করা যায় জ্বালানি এবং নৌকা ও ঘর তৈরির উপাদান হিসেবে। জানা যাচ্ছে, এ লক্ষ্যে তালবীজ ও চারা বিতরণ করা হচ্ছে সরকারিভাবে। কোথাও কোথাও তরুণরা এগিয়ে এসেছে স্বেচ্ছায়। বাড়ির আশপাশে ও পথের ধারে তারা তালের চারা রোপণ করছে সারিবদ্ধভাবে। পথের দুপাশে সারিবদ্ধ তালগাছের দৃশ্য মোহনীয়ও বটে। পাবনার সাঁথিয়ায় এক দিনে দুই লাখ তালবীজ রোপণ করা হয়েছে। যশোরের মনিরামপুরেও উদ্বোধন করা হয়েছে তালবীজ রোপণ কর্মসূচির। (দৈনিক শেয়ার বিজ, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭)
সরকার বজ্রপাতে করণীয় বিষয়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে, প্রচারপত্র করছে এবং বাসাবাড়িতে বজ্রপাত-নিরোধক দণ্ড লাগানোর অনুরোধ করছে। গ্রামগঞ্জে অবশ্য তালগাছ ও নারিকেল গাছই এর ভালো বিকল্প। আশার কথা, গ্রামের সাধারণ মানুষ তালবীজ রোপণের উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসছে।
কেন দেশে বজ্রপাতের প্রকোপ বেড়ে গেল, তার কারণ উদ্ঘাটনেও কাজ করতে হবে। অনেকে বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বজ্রপাত এতটা বেড়েছে। স্থানীয় পর্যায়েও যেভাবে গাছপালা কাটা হচ্ছে, সে হারে তা লাগানো হচ্ছে না। পরিবেশগত বিপর্যয়ে আমাদেরও দায় রয়েছে। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক তহবিল থেকে প্রাপ্ত সহায়তার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে আমাদের নিজ স্বার্থেই।
বজ্রপাতের শিকার বেশিরভাগই মাঠ, হাওর, বিল ও নদীতে কর্মরত খেটে খাওয়া মানুষ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। বজ্রপাতে কোনো পরিবারের এমন কেউ মারা গেলে সেখানে কী অভিঘাত পড়ে, তা সহজেই অনুমেয়। বাস্তবতা হলো, বজ্রপাতের ভয়ে কৃষক মাঠে যাওয়া ছেড়ে দেবে না। রাখাল গরু-মহিষের দেখভাল করতে যাবেই। জেলে বিল বা নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া বন্ধ করবে না। দেশে, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে বজ্রপাতনিরোধী গাছপালা বাড়িয়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার ও প্রশাসন এ কাজে এগিয়ে আসতে পারে। কী ধরনের ঝড়বৃষ্টিতে বা তার আগে-পরে বজ্রপাত বেশি ঘটে থাকে, সে বিষয়ে কিছু সাধারণ জ্ঞান সবারই থাকা প্রয়োজন। বজ্রপাতের বেলায় তাৎক্ষণিকভাবে কী করতে হবে, সেটি জানা থাকলেও বিপদ এড়ানো কঠিন হবে না।
পাবনায় এবারও এক দিনে এক লাখ তালবীজ রোপণ করা হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির আওতায় বৃহস্পতিবার জেলাব্যাপী এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
কর্মসূচি উদ্বোধনকালে ডেপুটি কমিশনার কবীর মাহমুদ বলেছেন, ‘আমরা তালবীজ রোপণ করে দিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আপনাদের। অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, বৃক্ষরোপণের পরে সেগুলো পরিপূর্ণ যতœ নেওয়া হয় না। ফলে গাছগুলো মরে যায়। আপনারা না হলেও আপনার ভবিষ্যৎ প্রজš§ এর সুফল ভোগ করবে।’
ডিসির আহ্বানে সাড়া দিয়ে এলাকাবাসী এতে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হলে তালগাছগুলো বেড়ে উঠবে। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে দেশের অন্যান্য স্থানেও তালবীজ রোপণ করার কর্মসূচি নেওয়া হলে বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা কমবে।

রোকেয়া বেগম
মোহাম্মদপুর, ঢাকা

সর্বশেষ..