প্রচ্ছদ শেষ পাতা

বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে দেড় শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: শত বছরের ডেল্টা প্ল্যান বা বদ্বীপ পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও দেড় শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি হারে বাড়বে। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না হলে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বহুলাংশে প্রভাবিত হবে। ‘ইন্টিগ্রেটেড অ্যাসেসমেন্ট ফর দ্য বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান, ২১০০: অ্যানালাইসিস অব সিলেক্টেড ইন্টারভেনশন’ শীর্ষক এক গবেষণায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে গতকাল অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে ডেল্টা প্ল্যান সঠিকভাবে বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন মডেল গ্রহণ করতে হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) আয়োজনে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। পরিকল্পনামন্ত্রী এম. এ. মান্নানের সভাপতিত্বে সেমিনার সঞ্চালনা করেন জিইডি সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মুনসুর রহমান। এ সময় পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) শাহিন আহমেদ চৌধুরী, শামীমা নার্গিস, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক ড. এমএ কাশেমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবেদন প্রসঙ্গে ড. শামসুল আলম বলেন, এটি একটি চলমান গবেষণা। ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়িত না হলে ২০২৭ সালের মধ্যে অতিদারিদ্র্য শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা সম্ভব নয়। দেশের ১৩৯টি বাঁধ সংরক্ষণের অভাবে প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। যদি এসব বাঁধ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়, তাহলে মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বন্যা ও উপকূলীয় অঞ্চলকে লবণাক্ততামুক্ত রাখা সম্ভব হবে। আরও বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধগুলো চার মিটার উঁচু করে তৈরি করা হলেও সংস্কারের অভাবে এখন দুই থেকে আড়াই মিটার উঁচু রয়েছে। এসব বাঁধ অন্তত ছয় মিটার উঁচু করে সংস্কার করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষা করতে হলে বনায়নের মাধ্যমে  সি-ওয়াল তৈরি করতে হবে। এতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে। যেকোনোভাবে হোক সবুজ বেষ্টনী তৈরি করতে হবে। এছাড়া খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের জন্য বাঁধ সংস্কারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সুইস গেট তৈরি করতে হবে। নীতি ও বিজ্ঞানের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু সমন্বিত বাস্তবায়ন মডেল উপস্থাপন করেন তিনি।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে যেভাবে ধাপে ধাপে পরিকল্পনা রয়েছে, তা সোভিয়েতরাও করতে পারেনি। যেকোনো পরিকল্পনাই করা হোক না কেন তার মূলেই রয়েছে বাংলাদেশের উন্নয়ন। শত বছরের এই পরিকল্পনা হচ্ছে একটি আমব্রেলা প্রকল্প। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রতিবছর এডিপি বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তাই এডিপির সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি আরও বলেন, প্রকল্প ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও মেধাকে কাজে লাগাতে হবে। এটা আবেগের বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রীও সব সময় বলেন, ‘চলুন নিজের কাজটা নিজেই করি। বিদেশি কেউ এলে সেটি গ্রহণ করা হবে। কিন্তু আমাদের নিজের মেধার ওপর দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।’

জামিনুল রেজা চৌধুরী বলেন, উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় বাঁধ সংস্কারের বিকল্প নেই। যদিও ব্যয়বহুল বিষয়। তারপরও এর বিকল্পও কিছু নেই। সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে। এতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। সাইক্লোন শেল্টার মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়িত হওয়ায় অনেক মানুষের প্রাণ রক্ষা পাচ্ছে। মানুষের জীবন রক্ষায় এসব শেল্টারের সংস্কার জরুরি।

ড. শামসুল আলম বলেন, সমন্বিতভাবেই ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত তিনটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২১টি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ওই তালিকার প্রথম প্রকল্পটিই হচ্ছে পদ্মা নদীতে একটি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প। কিন্তু কয়েক বছর আগে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতের আপত্তিতে তা স্থগিত হয়। এখন প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে বলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান ড. শামসুল আলম।

তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এক হাজার ৫৬৪টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ২৪৬টিই হচ্ছে ডেল্টা প্ল্যানসংশ্লিষ্ট। এগুলোর অনুকূলে বরাদ্দ রয়েছে এডিপির শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ অর্থ।

সাহিদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, এসব প্রতিবেদন অনেক বেশি টেকনিক্যাল। তাই ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারবে। ড. এমএ কাশেম বলেন, কোস্টাল ওয়াল তৈরি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থা যদি ঠিক থাকত বা ইকোসিস্টেম ঠিক থাকলে পেঁয়াজের দাম এত বাড়ত না। এজন্য ইকোসিস্টেম রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন ইলিশ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ায় এখন দুই থেকে আড়াই কেজি ইলিশ সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..