Print Date & Time : 9 May 2021 Sunday 1:45 pm

বনেদি বেঙ্গল গ্লাসের অভিনব কৌশলে কর ফাঁকি

প্রকাশ: March 7, 2021 সময়- 12:31 am

রহমত রহমান: দেশের বৃহত্তম গ্লাস প্রস্তুত ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল গ্লাস ওয়ার্কস লিমিটেড। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বনেদি প্রতিষ্ঠানটি অ্যাম্বার, গ্লাস ও জার উৎপাদন করে। দেশের ওষুধ, খাদ্য, পানীয়, কৃষি, ভেটেরিনারি খাতের চাহিদা পূরণে প্রতি বছর ৫৬ হাজার মেট্রিক টনের বেশি অ্যাম্বার, গ্লাস ও জার উৎপাদন করে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি দেশের গ্লাস ল্যাম্প শেলের চাহিদা মেটায়। প্রতিষ্ঠানটি করপোরেট গ্রাহকের তালিকায় রয়েছে দেশের বৃহৎ ও বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি। তালিকায় ওষুধ কোম্পানির পাশাপাশি যোগ হচ্ছে অন্যান্য কোম্পানি। শুধু দেশই নয়, বহির্বিশ্বেও গ্লাস কনটেইনার প্রস্তুতকারক হিসেবে সুনাম রয়েছে বেঙ্গল গ্লাসের। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও সুনাম ছড়িয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। অননুমোদনযোগ্য খরচ আয়ের সঙ্গে যোগ না করে প্রায় ১৬ কোটি টাকার আয়কর পরিহার বা ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

মাত্র এক বর্ষে এ আয়কর পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। রাজস্ব অডিট অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটির আয়কর ফাঁকি উদ্ঘাটন করে সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে বেঙ্গল গ্লাস ওয়ার্কস লিমিটেডের পরিহার করা আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এনবিআর সূত্রমতে, বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল কার্যালয়ের অধীন রাজস্ব অডিট অধিদপ্তর এনবিআরের আওতাধীন তিনটি কর অঞ্চলের (কর অঞ্চল-৩, ৪ ও ৮) অধীনে ১০টি কর সার্কেলের ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ২০১৯-২০ করবর্ষের (২০২০ সালের ৪ অক্টোবর থেকে  ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর) ওপর আয়কর নির্ধারণের সঠিকতা যাচাইয়ের ওপর অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্ট (এআইআর) সম্পন্ন করেছে। নিরীক্ষিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেঙ্গল গ্লাস ওয়ার্কস লিমিটেড অন্যতম, যার ২০১৯-২০ করবর্ষে প্রায় ১৬ কোটি ১৭ লাখ টাকার আয়কর পরিহার বা অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বেঙ্গল গ্লাস ওয়ার্কস লিমিটেড কর অঞ্চল-৮-এর অধীন ১৬২ সার্কেলের কোম্পানি করদাতা। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯-২০ করবর্ষে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ৮২ বিবি ধারায় রিটার্ন দাখিল করেছে। এ করবর্ষে প্রতিষ্ঠান নিরূপিত আয় দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ৪৩ লাখ ৩ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু রাজস্ব অডিট অধিদপ্তর এই করবর্ষে প্রতিষ্ঠানটির আরও ৫০ কোটি ৩৩ লাখ ৬৪ হাজার ১১৫ টাকা আয় খুঁজে পেয়েছে; যার ওপর প্রতিষ্ঠানটি কর দেয়নি। প্রতিষ্ঠানের দেখানো আয় ও রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের খুঁজে পাওয়া মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ৭৬ লাখ ৭১ হাজার ৩১৫ টাকা।

প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কস্ট অব গুডস সোল্ড’ ক্রয় বাবদ ৪৬ কোটি ৪৮ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৯ টাকা খরচ দাবি করা হয়েছে। দাবিকৃত খরচের ওপর আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ৫২ ধারা ও বিধি-১৬ ক্লজ (বি) অনুযায়ী ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনযোগ্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কোনো উৎসে কর কর্তন করেনি। উৎসে কর কর্তনের কোনো চালান বা প্রমাণক প্রতিষ্ঠান দেয়নি। ফলে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ৩০ (এএ) ধারা অনুযায়ী, এই আয় অননুমোদনযোগ্য ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে এবং তা অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে মোট আয়ের সঙ্গে যোগযোগ্য।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদনে লোড করা, স্থানান্তর ও উত্তোলন বাবদ তিন কোটি ৮৫ লাখ ২১ হাজার ৭৩৬ টাকা খরচ দাবি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ৫২ (এএ) ধারা মোতাবেক ৪ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনযোগ্য। এ খরচের ওপর কর কর্তনের কোনো চালান বা প্রমাণক নিরীক্ষায় পাওয়া যায়নি। ফলে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ৩০ (এএ) ধারা অনুযায়ী, এই আয় অননুমোদনযোগ্য ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে এবং তা অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে মোট আয়ের সঙ্গে যোগযোগ্য।

আরও বলা হয়, ২০১৯-২০ করবর্ষে কোম্পানির করপোরেট করহার ৩৫ শতাংশ। সে অনুযায়ী ৬৬ কোটি ৭৬ লাখ ৭১ হাজার ৩১৫ টাকার ওপর প্রযোজ্য কর ২৩ কোটি ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬০ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ৭ কোটি ২০ লাখ ২ হাজার ৪০৮ টাকা পরিশোধ করেছে। বাকি ১৬ কোটি ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৫৫২ টাকা কর পরিশোধ না করে পরিহার বা ফাঁকি দিয়েছে। কোম্পানি থেকে পরিহার করা আয়কর আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করে রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরকে অবহিত করতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিশামউদ্দিন সালেহ এর বক্তব্য নিতে অফিসে ফোন করা হলে জানানো হয়, তিনি করোনার কারণে অফিস করেন না। বক্তব্য জানতে ই-মেইল পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি তিনি। প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগের রাকিবুল আজাদ ও রিজভী নামে দুজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে কথা বলে জানিয়েছেন, বেঙ্গল গ্লাস ফাঁকি দিয়েছে কিনা তাদের জানা নেই। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস) এমএ তরফদারকে প্রতিষ্ঠানের রিসিপশন থেকে বিষয়টি জানানো হলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

উল্লেখ্য, দেশের বৃহত্তম গ্লাস প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দ্য বেঙ্গল গ্লাস ওয়ার্কস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানের পথচলা শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। ১৯৭৫ সালে বাণিজ্যিকভাবে গ্লাসের বোতল তৈরি শুরু করে বেঙ্গল গ্লাস। ২০১৩ সালে ফ্লিন্ট গ্লাস প্রস্তুত শুরু করে। বেঙ্গল গ্লাসের করপোরেট গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছেÑজিএসকে, এসিআই, ইবনে সিনা, হামদর্দ, এসকায়েফ, নোভার্টিস, ফিলিপস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, রেনাটা লিমিটেড, এক্মি, জেসন, অ্যারিস্টোফার্মা, অপসোনিন, সানোফি, বেক্সিমকো ফার্মা, ইনসেপ্টা প্রভৃতি। বর্তমানে অ্যালোপ্যাথিক ও হোমিওপ্যাথিক ওষুধের বোতল প্রস্তুতে নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে বেঙ্গল গ্লাস। একই সঙ্গে খাদ্য, পানীয়, কৃষি ও ভেটেরিনারি খাতে তাদের তৈরি পণ্যের সুনাম রয়েছে। পরিবেশবান্ধব উন্নত কারখানা, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ধারাবাহিক গবেষণা ও উন্নয়নের কারণে আজকের এই ঈর্ষণীয় অবস্থানে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।