প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থাপনা ও করণীয়

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: আমদানি বাণিজ্যে একটি পণ্যের স্থানীয় বাজার মূল্য নির্ধারণে আমদানি শুল্ক একটি বড় ভ‚মিকা পালন করে। কটা পণ্যের চীনে বাজার দর, যা বাংলাদেশে কিন্তু তা নয়। এই পার্থক্য তৈরি হয় আমদানি শুল্কের কারণে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রত্যেক দেশের কাস্টমস বা শুল্ক কর্তৃপক্ষ একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কাস্টমসের এসব ভ‚মিকার মধ্যে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ ও রাজস্ব আদায় বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। এর পাশাপাশি দেশীয় রপ্তানি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কাস্টমস শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে, যাকে আমরা বলছি বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনা।

শুল্ক মুক্ত কাঁচামাল আমদানি করার বহুবিধ সুবিধা রয়েছে যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলোÑরপ্তানিকারকের চলতি মূলধন ব্যয় হ্রাস, উৎপাদন ত্বরান্বিতকরণ ও লিড টাইমের উন্নতি। রপ্তানিকারক তার মনোনীত ব্যাংকে ঋণপত্র খুলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে কারখানার নিজস্ব গুদামে সরাসরি নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উৎপাদন করে বৈদেশিক ক্রেতার কাছে বিক্রয় তথা জাহাজীকরণ করে এবং দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে বিশেষ ভ‚মিকা পালন করে। যদিও বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনা ছাড়াও আরও দুটি রপ্তানি প্রণোদনা রয়েছে নগদ সহায়তা ও শুল্ক প্রত্যর্পণ সুবিধা। এই তিনটি সুবিধার মধ্যে বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

আমাদের দেশ থেকে ৭৫০টির মতো পণ্য বিশ্ব বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। এসব পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প একাই প্রায় ৮৫ শতাংশ রপ্তানি আয় করে। ১০০ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি আয় করে কেবল ওষুধ ও চামড়াজাত পণ্য। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ তাদের দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করার জন্য অনেক প্রণোদনা সহায়তা দিয়ে থাকে। আমাদের দেশের পশ্চাৎ শিল্প খুব ভালো করছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের এক্সেসরিজ এখন আর খুব একটা দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয় না। কিন্তু এই পশ্চাৎ শিল্পের কাঁচামাল আবার দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। সঙ্গতকারণেই এই শিল্পের জন্যেও বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনা সুবিধা প্রযোজ্য করা হয়েছে। আবার যেসব আমদানি পণ্য অভ্যন্তরীণ ভোগের জন্য শিল্প-ভোক্তা কর্তৃক শুল্ক দিয়ে আমদানি করা হয়েছে সেসব পণ্য যদি সরাসরি রপ্তানিকারকের কাছে সরবরাহ করা হয় তাহলেও এই সব পণ্যের আমদানি পর্যায়ের শুল্ক ফেরত দেয়া হয়। এসব শুল্ক মুক্ত আমদানি পরিচালিত হয় বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। আমদানিকারক কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে একটি বন্ড বা অঙ্গীকার করেন এই বলে যেÑশুল্ক মুক্ত সুবিধায় বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমদানিকৃত কাঁচামাল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রপ্তানি করা হবে এবং যদি করতে ব্যর্থ হই তবে সম্পূর্ণ শুল্ক সুদসমেত পরিশোধ করা হবে।

বাংলাদেশে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা কেবল রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আংশিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকেও এই সুবিধা দেয়া হচ্ছে। শুল্ক প্রত্যর্পণ সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশের আংশিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামাল আমদানি করে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করছে। কিন্তু এই শুল্ক প্রত্যর্পণ অনেক বেশি জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে ও শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করা যায়। কিন্তু ব্যাংকগুলো সব আমদানি কাম রপ্তানিকারকের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যু করতে চায় না। সঙ্গতকারণেই বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি সবচেয়ে সুবিধাজনক ও রপ্তানিবান্ধব। বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার হাজার রপ্তানিকারক এই সুবিধা ভোগ করছে এবং রপ্তানি বাণিজ্যে অবদান রাখছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প এই সুবিধা সবচেয়ে বেশি ভোগ করছে। ১৯৮৩ সালে এই সুবিধা প্রথম বাংলাদেশে প্রচলিত হয় এবং ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের পরপরই এই ধরনের শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি ও রপ্তানি ১৭৮১ সালে কিংস ওয়ারহাউস নামে শুরু হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রিত কাস্টমস (বন্ড) কমিশনারেটের মাধ্যমে এই শুল্কমুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুজন কাস্টমস কমিশনারের তত্ত¡াবধানে দুটি কমিশনারেট পরিচালিত হচ্ছে। কাঁচামাল কোন ব্যাংকের কোন শাখার মাধ্যমে আমদানি হবে, একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কী কী কাঁচামাল আমদানি করতে পারবে, আমদানির কত দিনের মধ্যে উৎপাদন ও রপ্তানি করতে হবে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উৎপাদন না করলে করণীয় কী, রপ্তানি না করে স্থানীয় বাজার বিক্রির পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয় দেখভাল করে কাস্টমস (বন্ড)।

রপ্তানিকারককে এই সুবিধা নিতে হলে কাস্টমস (বন্ড) কমিশনারের কাছে আবেদন করতে হয়। কাস্টমস কমিশনার যাচাই বাছাই করে এই লাইসেন্স দিয়ে থাকে। এই লাইসেন্স বন্ড লাইসেন্স বলে পরিচিত। এই লাইসেন্সে একজন রপ্তানিকারকের জন্য সব ধরনের দিকনির্দেশনা থাকে। বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভ‚মিকা অপরিসীম। কোনো ব্যাংক রপ্তানিকারকের আমদানি ঋণপত্র খুলবে, আমদানি, উৎপাদন ও জাহাজীকরণ  পরবর্তী পর্যায়ে রপ্তানি সংক্রান্ত কাগজপত্র বৈদেশিক ক্রেতার কাছে পাঠাবে এবং রপ্তানি আয় সংগ্রহ করবে তা নির্ধারণ করেন কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। যে ব্যাংক এ গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে থাকে লিয়েন ব্যাংক বলা হয়।

বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিনটি লিয়েন ব্যাংক একজন রপ্তানিকারকের জন্য যুগপৎভাবে আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। একটা লিয়েন ব্যাংক যখন এককভাবে একজন রপ্তানিকারককে বিভিন্ন কারণে সহায়তা করতে পারে না তখন একাধিক লিয়েন ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। লিয়েন ব্যাংক কাস্টমসের পক্ষে রপ্তানিকারকের আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমের সার্বিক হিসাব সংরক্ষণ করেন। লিয়েন ব্যাংকের রপ্তানি আয় প্রাপ্তি সনদ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বন্ড অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ব্যাংক তথা অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাঁচামাল বা মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদন তথা রপ্তানি না করে স্থানীয় বাজারে কিছু অসৎ রপ্তানিকারক বিক্রি করে অভ্যন্তরীণ বাজারে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি করেন যার চরম মূল্য দিতে হয় স্থানীয় আমদানিকারকদের। একই পণ্যের শুল্কমুক্ত ও শুল্কযুক্ত মূল্যের তারতম্যের কারণে অনেক আমদানিকারক ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু তাই নয়, দেশ বঞ্চিত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে। অপরদিকে ব্যাংকিং খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমদানি দায় ও রপ্তানি অর্থায়ন পরিশোধ করতে না পেরে।

দেশের রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের টেকসই অবস্থান সৃষ্টিতে বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনা আরও প্রসারিত করা জরুরি। বিশেষ করে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা ও অর্থনৈতিক জোনে বন্ড কাস্টমসের কর্মপরিধি বৃদ্ধি, কাস্টমস ও কাস্টমস (বন্ড)-এর কাজের সমন্বয়হীনতা দূরীকরণ, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের লোকবল বৃদ্ধি, ব্যাংকার ও রপ্তানিকারকদের প্রশিক্ষণ, বন্ড রেজিস্টারের অটোমেশন খুব জরুরি। বাংলাদেশে তিন ধরনের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আছে-১০০ শতাংশ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং আংশিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ১০০ শতাংশ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত সুবিধায় বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি করেন, আর আংশিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান শুল্ক প্রত্যর্পণ বা ডিউটি ড্রব্যাক সুবিধা ভোগ করে আসছে। শুল্ক প্রত্যর্পণ সুবিধার-অসুবিধা হলো রপ্তানিকারকের চলতি মূলধনের দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকা যার সুযোগ ব্যয়ের সুবিধা থেকে রপ্তানিকারক বঞ্চিত হচ্ছে। তাই শুল্কমুক্ত সুবিধা বা বন্ডেড ওয়ারহাউস সুবিধা অধিকতর কার্যকর সব ধরনের রপ্তানিকারকের জন্য। বাংলাদেশের ওয়ালটন, প্রাণ, বেক্সিমকো, স্কয়ারসহ বহু প্রতিষ্ঠান আংশিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উৎপাদন করে যাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বন্ডেড ওয়ারহাউস ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি করতে দিলে রপ্তানি বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হতো। শুল্ক একটি দেশের রাজস্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে রপ্তানি উন্নয়ন আরও জোরদার করা উচিত।

ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট

ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড