দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বন্ডেড কাঁচামাল রেজিস্টারে এন্ট্রি না করে অবৈধভাবে অপসারণ

সারাফা এগ্রিকালচার ফেব্রিক ইন্ডাস্ট্রিজ

রহমত রহমান: শুল্ককর ফাঁকি দিতে বন্ডেড কাঁচামাল নিয়মবহির্ভূতভাবে অপসারণ করা ছাড়াও আমদানি করা কাঁচামাল বন্ড রেজিস্টারে এন্ট্রি করা হয় না। এতে সুযোগ বুঝে অবৈধভাবে অপসারণ করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়া যায়। সারাফা এগ্রিকালচার ফেব্রিক ইন্ডাস্ট্রিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটি নিয়মবহির্ভূতভাবে বন্ড গুদামে আমদানি প্রাপ্যতা ও ইউপিবহির্ভূত পণ্য মজুত করে। মূলত রাজস্ব ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে এসব করে আসছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও শুল্ককর ফাঁকি প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি যশোর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনার সম্প্রতি অর্থদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আবদুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বক্তব্য দেবেন বলেও এক কর্মকর্তা জানান। পরে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক (হেড অব অ্যাকাউন্টস) বিষ্ণু কুমার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি দেখি না। যে দেখে তিনি যোগাযোগ করবেন।’ পরে কয়েক দিন যোগাযোগ করা হলেও তিনি বক্তব্য দেননি। শুক্রবার প্রতিষ্ঠানের আইনবিষয়ক কর্মকর্তা আইনজীবী ওয়ালিউর রহমান দোলন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা আইন আর আদালতের মাধ্যমে মোকাবিলা করব।’

সূত্রমতে, সারাফা এগ্রিকালচার ফেব্রিক ইন্ডাস্ট্রিজ (সাফি) ১৯৯২ সালে উৎপাদন শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি মাল্টি ফিশিং নেট, দড়ি, সেফটি নেট এবং বিভিন্ন কৃষি নেট উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে জাপানি ও চায়না প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব পণ্য উৎপাদন করা হয়। এ কোম্পানির চারটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলো হলো মেঘনা ফেব্রিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এএসএম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সালমা ফিলামেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ ও ইউনিট ফিলামেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

মামলার বিবরণে বলা হয়, সারাফা এগ্রিকালচার ফেব্রিক ইন্ডাস্ট্রিজ ফরিদপুর জেলার খলিলপুরে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় রাজধানীর ধানমন্ডিতে। ২০১৭ সালে বন্ড লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণ করে খোলাবাজারে বিক্রি ও অবৈধভাবে মজুত করে বলে অভিযোগ পায় এনবিআর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআরের নির্দেশে ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট যশোর ভ্যাট কমিশনারেটের একটি দল প্রতিষ্ঠানের বন্ড গুদাম সরেজমিনে পরিদর্শনে যায়। ভ্যাট কর্মকর্তারা বন্ড রেজিস্টার ও গুদামে কাঁচামালের গরমিল দেখতে পান।

পরে ভ্যাট কমিশনারেটে দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি শুল্ককর পরিশোধ ছাড়াই কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ৫৮ হাজার কেজি পিপি বেশি, ১৯ হাজার ১১০ কেজি মাস্টার ব্যাচ (ব্ল– দানা) কম, তিন লাখ ৫৯ হাজার ৫৫২ দশমিক ৮৫ কেজি এইচডিপিই কম এবং চার হাজার ৪৫০ কেজি নাইলন চিপস কম। অবৈধভাবে অপসারণ করা কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য পাঁচ কোটি ২৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫৪৬ টাকা। এতে জড়িত শুল্ককর এক কোটি ৬৬ লাখ ৫৯ হাজার ৬৭৯ টাকা। এছাড়া বন্ড গুদামে আট হাজার ৩৭৫ কেজি ফিনিশড গুডস (পিপি দ্বারা উৎপাদিত পলি) পাওয়া যায়, যা বার্ষিক আমদানি প্রাপ্যতা ও ইউপিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং এর শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় সাত লাখ ২৬ হাজার টাকা, প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার টাকা।

অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ডেটাবেইজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ৩ মে থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৯টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ৯টি আমদানি করা কাঁচামালের চালান বন্ড সুবিধায় খালাস নিয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বন্ড রেজিস্টারে এসব কাঁচামাল এন্ট্রি করা হয়নি। শুল্ককর ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি এসব কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণ করে খোলাবাজারে বিক্রি করেছে বলে প্রমাণিত হয়। ৯টি চালানে অবৈধভাবে অপসারিত কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য সাত কোটি ৩৭ লাখ ৭২ হাজার পাঁচ টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর দুই কোটি ২৮ লাখ ৬৯ হাজার ৩২২ টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের মোট অপসারিত কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১২ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ৫৫১ টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর তিন কোটি ৯৭ লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৬ টাকা। শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে কাঁচামাল অপসারণ করায় প্রতিষ্ঠানটিকে ২৭ অক্টোবর দাবিনামা-সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। লিখিত জবাব ও শুনানিতে অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা কাঁচামাল পুনরায় যাচাই করার আবেদন করেন। পরে একটি কমিটি করে দেয়া হয়। সেই কমিটি ১৭ আগস্ট পরিদর্শন ও যাচাই করে প্রতিবেদন দেয়। কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, পরিদর্শনে আট লাখ ৪২ লাখ ৮৫৫ কেজি এইচডিপিই, ১৯ হাজার ১১০ কেজি মাস্টার ব্যাচ (ব্ল– দানা) কম এবং ৫৮ হাজার কেজি পিপি বেশি পাওয়া যায়। এর সঙ্গে জড়িত শুল্ককর দুই কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার ২৩৯ টাকা।

সূত্র জানায়, কমিটির প্রতিবেদন ও প্রতিষ্ঠানের লিখিত বক্তব্য পর্যালোচনা করে রায় দেন যশোর ভ্যাট কমিশনার মুহম্মদ জাকির হোসেন। এতে ৫৮ হাজার কেজি পিপি বেশি কাঁচামালের রাজস্ব ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৩ টাকা, যার বিপরীতে ৪৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়। একইসঙ্গে আট লাখ ৪২ হাজার ৮৫৫ কেজি এইচডিপিই ও ১৯ হাজার ১১০ কেজি মাস্টার ব্যাচ কম পাওয়ায় এর সঙ্গে জড়িত রাজস্ব দুই কোটি ২৭ লাখ ৩৫ হাজার ১৬১ টাকা, যার বিপরীতে দুই কোটি ৩০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়। শুল্ককর দুই কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার ২৩৯ টাকা এবং অর্থদণ্ড দুই কোটি ৭৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। শুল্ককর ও অর্থদণ্ডসহ মোট রাজস্ব পাঁচ কোটি ১৭ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৯ টাকা। এ রাজস্ব পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটিকে ১৫ দিনের সময় দেয়া হয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..