প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে বেপরোয়া ওলিরা ফ্যাশন

পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান

রহমত রহমান: বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান ওলিরা ফ্যাশনস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়ে আসছে। শুধু এখন নয়, ২০১১ সালে বন্ড লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি একইভাবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। মামলা, অর্থদণ্ড দেওয়ার পরও কোনোভাবেই ওলিরা ফ্যাশনের ফাঁকি রোধ সম্ভব হচ্ছে না।
সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৬ কোটি ২০ লাখ টাকার শুল্ককর ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। ফাঁকি প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানকে ১৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ রায় দেওয়া হয়। এছাড়া কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর প্রতিষ্ঠানটির বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের একটি চালান আটক করেছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ওলিরা ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হুমায়ুন রশীদ বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের বিষয়টি অস্বীকার করে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা পণ্য শিপমেন্ট যে করেছি, তার বিএল, পিআরসিসহ সব কাগজ দিয়েছি। কিন্তু বন্ড কমিশনারেট তা কোনোভাবেই আমলে নেয়নি। রায় যে দিয়েছে, তা আমাদের জানানো হয়নি। অডিট করতে আমরা আবেদন করেছি, তাও আমলে নেওয়া হয়নি। তবে আমরা আবেদন করেছি।’ এর আগে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, একই কেস।
এনবিআর সূত্র জানায়, মিরপুর পল্লবীতে (৩৫/সেকশন-৭) ওলিরা ফ্যাশনস লিমিটেডের কারখানা। রফতানির শর্তে ২০১১ সালে এ প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়। লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে শর্ত ভঙ্গ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য তৈরি না করে তা চোরাই পথে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়ে আসছে। মামলার পরও কোনোভাবেই ফাঁকি রোধ সম্ভব হচ্ছে না।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৩০ মার্চ এনবিআরের নির্দেশে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানের কারখানা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিরীক্ষা করে; যাতে কাঁচামাল কম পাওয়া যায়। পরে চলতি বছরের ২২ আগস্ট প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। এর আগে ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর পরিদর্শন করা হয়। পরে প্রায় ৫৫ হাজার ৭৬০ কেজি পণ্য কম পাওয়ায় প্রায় এক কোটি ৩২ লাখ টাকা শুল্ককর ফাঁকির জন্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
কারণ দর্শানো নোটিসে বলা হয়, সরেজমিন পরিদর্শনে বন্ড রেজিস্টারের তুলনায় কম পাইল ফেব্রিকস পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটি পোশাক রফতানির জন্য স্থানীয় বাজার থেকে তিন লাখ ৬৩ হাজার ৭১৮ দশমিক ২৭ কেজি ফেব্রিকস ক্রয় করে। এছাড়া আগের মামলার ৫৫ হাজার ৭৬০ কেজি ফেব্রিকস বাদ দেওয়া হয়। স্থানীয় বাজার থেকে ক্রয় ও আগের মামলার ফেব্রিকস বাদ দিয়ে নিরীক্ষা মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা আট লাখ ৮৫ হাজার ২৪১ দশমিক ৬২ কেজি ফেব্রিকস কম পাওয়া যায়, যা প্রতিষ্ঠানটি পোশাক তৈরি না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা। এ কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যার ওপর প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ২৬ কোটি ২০ লাখ টাকা।
নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে লিখিত জবাব দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, পরিদর্শনে বন্ড কর্মকর্তারা ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুমোদিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী সমাপনী মজুতের সঙ্গে সরেজমিন পরিদর্শনের পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের (২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২৪ মার্চ) পর্যন্ত আমদানি যোগ করে ২৬ কোটি ২০ লাখ টাকা শুল্ককর পরিশোধে দাবিনামা জারি করা হয়েছে; যা বোধগম্য নয়। এ দাবিনামা নিষ্পত্তিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অধিকতর তদন্ত করে নিষ্পত্তি করতে অনুরোধ জানানো হয়।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানের লিখিত বক্তব্য ও মামলার নথি নিয়ে গত ২৫ সেপ্টেম্বর বন্ড কমিশনারেটে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. জাহিদ সরকার মৌখিক বক্তব্য পেশ করেন। শুনানিতে নথি পর্যালোচনা করে কমিশনার এসএম হুমায়ুন কবীর বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণ করে কাস্টমস আইন, ১৯৬৯-এর ধারা ১৩(১), ৮৬ ও ৯৭ এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সিং বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধান লঙ্ঘন করেছে। প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কাস্টমস আইন অনুযায়ী ১৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের ফাঁকি দেওয়া শুল্ককর ২৬ কোটি ২০ লাখ টাকা ও অর্থদণ্ডসহ প্রায় ৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা আদেশ জারির ১০ দিনের মধ্যে পরিশোধের আদেশ দেওয়া হয়। শুল্ককর ও অর্থদণ্ড পরিশোধ করলে এ অভিযোগটি নিষ্পত্তি হবে।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের ২৮ আগস্ট কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে ওলিরা ফ্যাশনের প্রায় এক কোটি ৭১ লাখ টাকার একটি চালান আটক করে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনারকে প্রতিবেদন দেয় কাস্টমস গোয়েন্দা। এতে বলা হয়, চলতি বছরের এপ্রিলে ওলিরা ফ্যাশন বন্ড সুবিধায় কাপড় আমদানি করে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে খালাসের সময় খালাস স্থগিত করা হয়। শতভাগ কায়িক পরীক্ষায় দেখা যায়, ঘোষণা মোতাবেক রেয়ন সোল ফ্যাব ডব্লিউ-৬৩/৬৫ মোট ২৬ হাজার ৫০০ কেজির স্থলে ঘোষণাবহির্ভূতভাবে কটন মিক্সড ফেব্রিকস ২৯ হাজার ৯৪৬ কেজি আমদানি করা হয়। যা রফতানি হয় না; বরং স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। পণ্য চালানটির শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৯০ লাখ ৩৪ হাজার টাকা; যার মধ্যে প্রযোজ্য শুল্ককর ৮০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। শুল্ককরসহ চালানের মূল্য এক কোটি ৭১ লাখ চার হাজার ৩১৬ টাকা।

 

সর্বশেষ..