দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার সুপার সল্টের

# ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সুপার ক্রিস্টাল সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের বন্ড লাইসেন্স স্থগিত

# বিআইএন লক। রফতানি করলে অনুমতি নিতে হবে

রহমত রহমান: সুপার ক্রিস্টাল সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সুপার গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধায় অপরিশোধিত লবণ আমদানি করে আসছে। তবে ঘোষণা ও শুল্ককর পরিশোধ ছাড়াই তা অবৈধভাবে অপসারণ করে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।

অবৈধভাবে অপসারিত লবণের শুল্ককর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটিকে দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি এ নোটিস জারি করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বন্ডিং কার্যক্রম ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় বন্ড লাইসেন্স স্থগিত ও বিআইএন লক করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ মুহাম্মাদ ওয়ালী উল্লাহর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে বারবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। মোবাইল ফোনে এসএমএস দেওয়ার পরও তিনি জবাব দেননি। এ বিষয়ে সুপার গ্রুপের ব্যবস্থাপক (কমার্শিয়াল) আনোয়ার শিকদার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এখনও কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব দেওয়া হয়নি।’ কাঁচামাল অবৈধভাবে সরানো হয়েছে কি না এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘না, কাঁচামাল অবৈধভাবে সরানো হয়নি। জোর করে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে।’

এনবিআর সূত্র জানায়, সুপার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সুপার ক্রিস্টাল সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, যা আগে শিকদার সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ নামে পরিচিত ছিল। প্রতিষ্ঠানটির নারায়ণগঞ্জের মঙ্গলখালী মুড়াপাড়া রূপগঞ্জ ফ্যাক্টরি বাংলাদেশের অন্যতম লবণ প্রক্রিয়াজাত কারখানা। ২০০৭ সালে বন্ড লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি অপরিশোধিত লবণ আমদানি করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা লবণ শুল্ককর পরিশোধ ছাড়াই অবৈধভাবে অপসারণের অভিযোগ ওঠে। এনবিআরের নির্দেশে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট তা যাচাই করে। প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিআইএন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) লক করে দেওয়া হয় এবং লাইসেন্সিং কার্যক্রম ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। তবে কোনো রফতানি কার্যক্রম থাকলে বন্ড কমিশনারেটের অনুমোদনসাপেক্ষে কেইস টু কেইস ভিত্তিতে সম্পাদন করা যাবে।

সূত্র আরও জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর বন্ড কমিশনারেটের একটি টিম প্রতিষ্ঠানটির রূপগঞ্জ কারখানা পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড ওয়্যারহাউসে মজুত লবণ ও বন্ড রেজিস্টারে উল্লিখিত লবণে পার্থক্য দেখা যায়। কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন, প্রতিষ্ঠানটি শুল্ককর ফাঁকি দিতে বন্ড সুবিধার লবণ অবৈধভাবে অপসারণ করেছেন। পরে বন্ড কর্মকর্তারা কমিশনারেটে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের নথি, বন্ড রেজিস্টার, এনবিআরের সিআইএস সেল হতে প্রাপ্ত আমদানি তথ্য ও সরেজমিনে প্রাপ্ত কাঁচামালের তথ্য আড়াআড়িভাবে যাচাই করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের ইউপি (ইউটিলাইজেশন পারমিশন), বন্ড রেজিস্টার ও আমদানি তথ্য পর্যালোচনায় কাঁচামালের মজুত কম পরিমাণে পাওয়া যায়। পরে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্ড কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শনে বন্ডেড ওয়্যারহাউসে লবণ (কাঁচামাল) ১২ লাখ পাঁচ হাজার ৫৪০ কেজি ও লবণ খোলা অবস্থায় (কাঁচামাল) ৬৯ হাজার কেজিসহ মোট ১২ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪০ কেজি পান। অথচ প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ ইউপি অনুযায়ী বন্ডেড ওয়্যারহাউসে ৬৮ লাখ ৬৮ হাজার ১৪০ কেজি অপরিশোধিত লবণ থাকার কথা। কিন্তু ওয়্যারহাউসে ৫৫ লাখ ৯৩ হাজার ৬০০ কেজি লবণ কম পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি শুল্ককর ফাঁকি দিতে ঘোষণা ছাড়াই অবৈধভাবে পণ্য অপসারণ করেছে। অবৈধভাবে অপসারিত লবণের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য এক কোটি ৩৩ লাখ ছয় হাজার ৬৩৩ টাকা। এর মধ্যে প্রযোজ্য শুল্ককর এক কোটি ১৮ লাখ ৮৫ হাজার ৪৮৫ টাকা।

সূত্র আরও জানায়, ফাঁকি দেওয়া শুল্ককর পরিশোধে ১৭ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। যাতে বলা হয়, কাস্টমস আইন, ১৯৬৯-এর ১১১ ধারা অনুযায়ী অবৈধভাবে অপসারিত কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ককর এক কোটি ৩৩ লাখ ছয় হাজার ৬৩৩ টাকা পরিশোধযোগ্য। কেন এ শুল্ককর আদায় করা হবে নাÑতার ব্যাখ্যা দিতে কারণ দর্শানো নোটিস জারি করা হয়। নোটিসে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কেন দণ্ডারোপমূলক ব্যবস্থা গ্রহণসহ লাইসেন্স বাতিল করা হবে না, তার কারণ ব্যাখ্যাসংবলিত লিখিত জবাব ২২ নভেম্বরের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে। ব্যাখ্যা ও শুল্ককর পরিশোধ না করলে মামলাটি আইনানুগভাবে নিষ্পত্তিসহ লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

এ বিষয়ে বন্ড কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, সুপার ক্রিস্টাল সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে অপরিশোধিত লবণ ঘোষণা ও শুল্ককর পরিশোধ ছাড়াই অপসারণের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে আসছে। পরিদর্শনে কাঁচামাল অপসারণের প্রমাণ পেয়েছি। আমরা প্রতিষ্ঠানটির বন্ডিং কার্যক্রম খতিয়ে দেখছি। তবে অনেক বেশি শুল্ককর ফাঁকি পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সাল থেকে সুপার গ্রুপের পথচলা শুরু। বর্তমানে এ গ্রুপের সুপার ক্রিস্টাল সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ ছাড়াও সুপার সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, সুপার ক্রিস্টাল সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ (ইউনিট-২), সুপার ডাল মিল ইন্ডাস্ট্রিজ, সুপার ফ্লাওয়ার ইন্ডাস্ট্রিজ ও সুপার ট্রেডিং করপোরেশন নামে প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..