সারা বাংলা

বন্দর কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের অনিয়মে স্থবির ভোমরা স্থলবন্দর

সৈয়দ মহিউদ্দীন হাশেমী, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে ট্রাক থেকে পণ্য লোড-আনলোড বন্ধ ছিল টানা ছয় দিন। গতকাল চালু হলেও অচলাবস্থা আজও কাটেনি। এ সময়ে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে ২৫ কোটি টাকার বেশি।

সংশ্লিষ্ট ব্যসায়ী সূত্র থেকে জানা গেছে, ভারত থেকে একটি ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করলে তা ছাড় করানোর সময় শ্রমিক বিল ও রাজস্ব একইসঙ্গে পরিশোধ করতে হয় সরকারি চালানের মাধ্যমে। অপরদিকে শ্রমিকদের বিল পরিশোধ করেন সরকার নিযুক্ত শ্রমিক ঠিকাদার। ঠিকাদার মাস শেষে সরকারের কাছ থেকে ব্যবসায়ীদের দেয়া নির্ধারিত বিল তুলে নেন।

কিন্তু একমাত্র ভোমরা বন্দরে এরপরও পণ্য খালাসের সময় আবারও বিল দিতে হয় শ্রমিকদের। ফলে একই পণ্যে দুইবার লোড-আনলোড বিল গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের। এতে করে আমদানি খরচে বাড়তি টাকা যোগ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে পণ্য খালাসে বখশিশের নামে শ্রমিকদের সরাসরি মজুরির টাকা দেয়া বন্ধ করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। বখশিশের টাকা বন্ধ করে দেয়ায় শ্রমিকরাও কাজ বন্ধ করে দেয়। ফলে বন্দরে পণ্যে লোড-আনলোড বন্ধ হয়ে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

স্থলবন্দরের হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম পণ্য খালাস বন্ধের বিষয়ে বলেন, এতদিন ট্রাকপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বখশিশের নামে মজুরি দিতেন ব্যবসায়ীরা। এই মজুরির টাকা বন্ধ করে দেয়ায় শ্রমিকরা গত বৃহস্পতিবার থেকে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।

স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম বলেন, প্রতি টন পণ্য খালাসে প্রায় ৭০ টাকা পরিশোধ করতে হয় ব্যবসায়ীদের। সঙ্গে শ্রমিকদের ট্রাকপ্রতি বখশিশের নামে মজুরি দিতে হয় ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা। বাড়তি এই বখশিশের নামে মজুরির টাকা গোনা সম্ভব নয় বিধায় তারা নিজস্ব উদ্যোগে শ্রমিক ডাকা বন্ধ করে দিয়েছেন।

স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান জানান, সরকার নির্ধারিত ৬৯ টাকা ২০ পয়সা হারে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কেটে রাখা হয়। অন্যদিকে ঠিকাদার কম দরে ইজারা নেয়ায় টেন্ডারকৃত শ্রমিকদের জন্য পরিশোধ করা হয় ২৭ টাকা ৭৪ পয়সা।

জানা গেছে, ড্রপ কমনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড নামক একটি প্রতিষ্ঠান ভোমরা বন্দরে শ্রমিক নিয়োগের ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিল। অথচ সেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজ পর্যন্ত কোনো শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে  বন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে মাসের পর মাস ওই টাকা তুলে আত্মসাৎ করছেন।

গত ৩ মার্চ বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এক চিঠিতে ব্যবসায়ীদের অবগত করে, ১ এপ্রিল থেকে ডাবল শ্রমিক বিল কার্যকর করা হবে। এ উপলক্ষে গত ২৩ মার্চ বাংলাদেশ স্থলবন্দর কৃর্তপক্ষের সচিবের উপস্থিতিতে ও বন্দরের চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে একটি কার্যকরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিষয়টি মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত ওই আদেশ চালু না করার জন্য সচিব, জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করেন ব্যবসায়ীরা।

এছাড়া সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার জন্য লিখিতভাবে অনুরোধ জানান তারা। অথচ কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও উপপরিচালক তাদের নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থে জোরপূর্বক ডাবল বিল চালু করতে মরিয়া। এটি চালু হলে প্রতি ট্রাকে শুধু শ্রমিক-সংক্রান্ত ব্যয় হবে ১০ হাজার টাকারও বেশি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শ্রমিক নেতা জানান, সম্প্রতি বন্দর কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের অনিয়মের জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঝামেলা হওয়ায় তারা আমাদের কাজে না ডাকায় চারটি শ্রমিক সংগঠনের প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।

এ বিষয়ে জানার জন্য ভোমরা স্থল বন্দরের উপপরিচালক মনিরুল ইসলামের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, উক্ত বিষয় সমাধানে ডিসি অফিসে মিটিং চলছে।

ভোমরা শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা আমিরুল আমিন জানান, প্রতিদিন গড়ে ছয় কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়। সে হিসেবে রাজস্ব ক্ষতি দাঁড়াবে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..