দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা সাক্ষাৎকার

বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ার নিয়ে ম্যানিপুলেশন হচ্ছে!

দেশের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দোহার থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ-বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। সম্প্রতি দেশের বিনিয়োগ-অর্থায়ন, কভিড-১৯ এর প্রভাব মোকাবিলা, ব্যবসা সহজীকরণসহ উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ও তা বাস্তবায়নের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে তিনি কথা বলেন দৈনিক শেয়ার বিজ-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শেখ সাজিদ

শেয়ার বিজ: করোনাভাইরাসের টিকা তৈরির চেষ্টা করছে বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি টিকা পেতে ভারতের প্রতিষ্ঠান সেরামের সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ এতে বেক্সিমকোর অবদান রয়েছে, যা আমাদের দেশের জন্যও একটি সুখবর বিষয়টি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

সালমান এফ রহমান: এই টিকার সুবিধা হচ্ছে এটি দুই থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তৈরি করতে হয়, যেটা আমাদের দেশে প্রচলিত সাধারণ টিকার মতো। আমাদের দেশে সেই অবকাঠামো আছে। চীনের একটি কোম্পানি যারা বিদেশ যাচ্ছে তাদের করোনার টিকা দিচ্ছে। এর একটি টিকার দাম নিয়েছে তারা ৬০ ডলার। এটা তো অনেক ব্যয়বহুল। আমেরিকায় যে টিকাটি বের হচ্ছে তার দামও অনেক বেশি। সেরামের টিকা চার থেকে ছয় ডলারের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে আমরা শুনেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেন অক্সফোর্ডের সঙ্গে কথা বলতে। আমরা অক্সফোর্ড মানে অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তারা জানাল, বাংলাদেশে টিকা সরবরাহের জন্য তারা সেরাম ইনস্টিটিউটকে লাইসেন্স দিয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে টিকা নিতে হলে সেরামের মাধ্যমে কিনতে হবে। তারা সরাসরি বাংলাদেশে বিক্রি করবে না।

তখন আমরা সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা বলল, হ্যাঁ আমরা বাংলাদেশকে টিকা দেব। তখন আমরা বিষয়টি প্রধানন্ত্রীকে বলি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি চাই যখন ভারতে টিকাটি বিপণন শুরু হবে, তখনই যেন আমরা পাই। পাশাপাশি ভারতকে যে দামে টিকা দেবে অক্সফোর্ড, আমাদেরও সেই দামে দিতে হবে। আমরা বিষয়টি অক্সফোর্ডকে জানালে তারা রাজি হয়। ফলে দুটো প্রস্তাবেই তাদের রাজি করাতে পারি। আমরা সেরামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, টিকা নিতে হলে এখনই বুকিং দিতে হবে। তাহলে আমরা তোমাদের জন্য টিকা রাখব। পরে আমরা তিন কোটি টিকার অর্ডার দিয়েছি।

আমার জানামতে, কোনো এলডিসি দেশ কিংবা আমাদের দেশের আশেপাশে যারা রয়েছে, তারা কিন্তু এখনও এ পরিমাণ টিকার অগ্রিম বুকিং দিতে পারেনি, এরকম আমি শুনিনি। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াÑসবাই চেষ্টা করছে। আমরা কিন্তু এর মধ্যে বড় পরিমাণ টিকার ব্যবস্থা করে ফেলেছি, এ অঞ্চলে যা কেউ পারেনি। এর জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীকেই ধন্যবাদ জানাব। প্রধানমন্ত্রী খুব সুন্দরভাবে কভিড-১৯ মোকাবিলা করছেন।

শেয়ার বিজ: করোনাভাইরাসের আঘাত থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা পুনরুদ্ধার হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

সালমান এফ রহমান: বাংলাদেশ তো অর্থনৈতিকভাবে অনেক ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। যত রকমের তথ্য আমরা পেয়েছিলাম সব ভালো ছিল। ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভের কথা বলেন, রপ্তানির কথা বলেন সবই ঠিক ছিল, এটি বাড়ছিল। কিন্তু আমেরিকা ও ইউরোপে এরই মধ্যে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ আসছে। তাই পরবর্তীকালে কী হবে বলা মুশকিল। আমদানি-রপ্তানিতে কী প্রভাব ফেলবে, কী হবে, তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। আশা করছি ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে করোনা টিকা চলে আসবে। যদি টিকা চলে আসে, তাহলে আগামী বছরে আমরা স্বাভাবিকে চলে আসতে পারব। করোনা তো আমাদের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছেই। তবে আশা থাকবে আমরা তাড়াতাড়ি এটা রিকভারি করতে পারব।

শেয়ার বিজ: বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে, যেমন রেমিট্যান্স রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তুলনকামূলকভাবে এখনও ভালো করছেÑএটার কারণ কী, আপনি কী মনে করেন?

সালমান এফ রহমান: রেমিট্যান্সের বিষয়টি তো আমি বলেছি। এর দু-তিনটি কারণ আছে। একটি হলো গত বাজেটে দুই শতাংশ ইনসেনটিভ দেওয়া হয়েছে। সেটা কিন্তু সাংঘাতিকভাবে কাজ করছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে কভিড-১৯-এর কারণে কিন্তু হুন্ডি ব্যবসা অনেক কমে গেছে। হুন্ডি ব্যবসা করতে হলে ফিজিক্যাল ক্যাশ নিয়ে মুভ করতে হয়ে। এটা করতে হয় দুই দেশেই। যে দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স আসে, সবগুলোই লকডাউন ছিল। ফলে কেউ চলাফেরা করতে পারেনি। ফলে যে অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে আসত তা অফিশিয়ালি আসতে শুরু করে। হুন্ডি ব্যবসা বন্ধ করার জন্য আমাদের দেশসহ আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এখন দুই দেশ নিজেদের মধ্যে কো-অপারেশন করে। আগে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ রেমিট্যান্স অফিশিয়াল চ্যানেলে আসত না, এখন আসছে, যার জন্য রেমিট্যান্স বেড়েছে। দ্বিতীয়ত কারণ হচ্ছে, আমেরিকা-ইউরোপের মতো বড় বড় দেশে যারা আছেন, যারা ভালো অবস্থানে রয়েছেন, তারা এই সময়ে স্বজনদের জন্য বেশি করে টাকা পাঠিয়েছেন। যারা কম পাঠাতেন তারা অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। যারা টাকা একদমও পাঠাতেন না, তারাও পাঠিয়েছেন। এসব কারণে রেমিট্যান্স বেড়েছে। রপ্তানিতে বিশেষ করে পোশাক কারখানা এত দিন বন্ধ ছিল। তারপর যে চাহিদাগুলো এসেছে, তা আমরা পূরণ করতে পেরেছি। এটা ভালো খবর।

শেয়ার বিজ: বর্তমানে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশোধ না করলেও ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা খেলাপি হচ্ছেন না কারণে ব্যাংকও খারাপ ঋণের স্থিতি কৃত্রিম দেখাচ্ছে সুবিধা ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার পর জানুয়ারি থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে এসব নিয়ে আপনার সরকারের চিন্তাভাবনা কী?

সালমান এফ রহমান: খেলাপি ঋণ জানুয়ারিতে বাড়বে না। এটা বাড়লে মার্চ থেকে বাড়বে। এটা চিন্তার বিষয়। আমরা সবাই এটা নিয়ে চিন্তা করছি। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি দেখছে। আমার জানামতে, গভর্নর এটা নিয়ে কাজ করছেন। আমাদের তথ্য নিতে হবে। সমস্যা সমাধান করার আগে এর প্রেক্ষাপট জানতে হবে। ডিসেম্বর শেষ হোক। যদি আর সময় বাড়ানো হয় তা কীভাবে হবে, কারা এর সুবিধা পাবে, তা ঠিক করতে হবে। তবে সবাই কিন্তু এ সুবিধা নেননি। অনেকেই টাকা ফেরত দিয়েছেন। কারণ এক বছর টাকা না দিতে হলেও সুদ তো দিতে হচ্ছে। এটা তো মাফ হয়নি।

আমার মনে হয়, করোনায় সবাই সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এখন কাদের এই সুবিধা দরকার তাদের জন্য ভাবতে হবে। একটি গবেষণা প্রয়োজন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের প্রয়োজনে আরও সুবিধা দিতে হবে। যেমন রেস্টুরেন্ট, ট্রাভেল এজেন্ট, রিসোর্ট প্রভৃতি ক্ষেত্রে যাদের ব্যবসা হয়নি, তাদের তো দেখতে হবে। বিশেষ কিছু সুবিধা দিতে হবে। এ ধরনের একটি বিষয় চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে, দেখা যাক।

অন্যদিকে করোনার সেকেন্ড ওয়েভের পর কী হবে, তা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। সে বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ চলছে। আমার জানামতে, গার্মেন্টগুলোয় ইউরোপ থেকে যেসব অর্ডার এসেছিল তারা ক্যানসেল করাচ্ছেন না, তারা আরও অপেক্ষা করতে বলেছেন। হোল্ড করতে বলেছেন। সেকেন্ড ওয়েভে যদি অবস্থা খারাপ হয়, তবে এসব অর্ডার বাতিল হতে পারে। এটা তো বলা যায় না।

শেয়ার বিজ: সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে আপনি বলেছেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চোখের সামনে দিয়ে ম্যানিপুলেশন হচ্ছে বিষয়টি যদি ব্যাখ্যা করেন

সালমান এফ রহমান: আমি আসলে ঢালাওভাবে কোনো মন্তব্য করিনি। বলেছিলাম বন্ধ থাকা কোম্পানির কথা, যে কোম্পানিগুলো বহুদিন থেকে তাদের কার্যক্রম করতে পারছে না। কিছু কোম্পানি রয়েছে যারা উৎপাদনে নেই বা বন্ধ রয়েছে, যদিও এ ধরনের কোম্পানির সংখ্যা কম। কিছু চিহ্নিত কোম্পানি আছে, যেসব কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিক হারে হ্রাস-বৃদ্ধি পায়, অথচ এ

ধরনের কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো যুক্তি নেই। ফলে এসব শেয়ারদর বাড়ার কথা নয়। একইভাবে এ ধরনের কোম্পানির শেয়ারের মূল্য আয় অনুপাতও বেশি (হাই পি-ই) হওয়ার কথা না।

তারপর দেখা যায় মাঝেমধ্যে এসব শেয়ারদর অস্বাভাবিকহারে বাড়ে। দর বৃদ্ধির কোনো কারণও তারা বলতে পারে না। এভাবে দর বাড়তে বাড়তে একটা পর্যায়ে গিয়ে আবার দর কমে যেতে দেখা যায়। পরে দেখা যায় দু-তিন মাস বিরতি দিয়ে ওই কোম্পানির শেয়ারদর আবার বৃদ্ধি পায়। আমার কথা হচ্ছে, শেয়ার কেনাবেচা করতে হয় একজন ব্রোকারের মাধ্যমে। যেহেতু তাদের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচা করা হয়, ফলে তারা সব তথ্যই জানেন। কে কোন শেয়ার কিনছেন কিংবা কে কোন শেয়ার বিক্রি করছেন, ব্রোকারদের এর সবই জানা থাকে। আমার কথা হচ্ছে, যখন কোনো বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ার অস্বাভাবিকভাবে কেনাবেচা হয়, যখন একজন গ্রাহক আজ ১০ টাকা, কাল ১২ টাকা, পরের দিন ১৫ টাকায় শেয়ার কিনছেন, তখন কি তাদের মনে প্রশ্ন আসে না কেন বাড়ছে এ শেয়ারদর, কিংবা কেন কমছে? তাছাড়া কারা দর বাড়লে শেয়ার বিক্রি করেছিল, আবার কমলে কিনছে, এমন সব তথ্যই ব্রোকারদের কাছে থাকে। যদিও এটা ধরার কথা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের। কিন্তু এর সবকিছু তো ডিএসইর সামনে তাদের নাকের নিচ দিয়ে হচ্ছে, তাই বলেছি। আমি বলতে চেয়েছি ব্রোকারদের দায়িত্বের কথা। বন্ধ থাকা কোম্পানির কথা বলেছি। সাধারণত এমন কর্মকাণ্ড ঘটে স্বল্পমূলধনি এবং ‘জেড’ ক্যাটেগরির কোম্পানি নিয়ে। এসব কোম্পানির শেয়ার নিয়ে ম্যানিপুলেশন হয়। এসব কোম্পানি থেকে শেয়ারহোল্ডাররা কোনো ধরনের লভ্যাংশ পায় না। পাশাপাশি এ ধরনের কোম্পানিগুলো তাদের আর্থিক প্রতিবেদনও দাখিল করে না। আমি আসলে এসব কোম্পানির কথা বলেছি। ঢালাওভাবে কিছু বলেনি। কথা বলার সময় আমি খুব সতর্ক থাকি। আমার বক্তব্যটা অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখন সবাই ভাবছে আমি ঢালাওভাবে বলেছি, আসলে বিষয়টি কিন্তু তা নয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..