প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বন্ধ পোশাক কারখানাগুলো চালু হোক শিগগির

শ্রমিক ধর্মঘটের জের ধরে রাজধানীর আশুলিয়ার বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকাল বন্ধের যে ঘোষণা মালিকপক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তা শুধু এ শিল্পের জন্য নয়Ñসামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও দুঃসংবাদ। এর প্রভাব গিয়ে পড়বে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত রফতানিতে। নিকট অতীতে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট নানা জটিলতা ও বাস্তবতায় চলতি অর্থবছরে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধানতম খাত প্রবাসী আয় আগের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে। এ অবস্থায় শ্রমিক ধর্মঘটের জেরে পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালা। পোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক ও মালিকপক্ষ ছাড়াও এ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সবাই যে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তাতে সন্দেহ নেই।
শ্রম প্রতিমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘এ কর্মবিরতির কারণ কী, অনেক শ্রমিকই তা জানেন না।’ তার কথায় সত্যতা কিছুটা থাকলেও উদ্ভূত বাস্তবতা অস্বীকারের উপায় নেই। এর মাধ্যমে শ্রমিকরা যে বার্তা দিতে চাচ্ছেন, তা কিন্তু স্পষ্ট। প্রধানত যে দাবিকে ঘিরে এ আন্দোলন শুরু হয়েছে, তাকে একেবারে অযৌক্তিক বলা যাবে না। এক্ষেত্রে ‘বহিরাগতদের উসকানির’ যে অভিযোগ মালিকপক্ষ থেকে তোলা হয়েছে, সেটার যথার্থতাও যাচাই করা দরকার। অভিযোগ সত্য হলে চিহ্নিত করা দরকার উসকানিদাতাদের। এ ঘটনায় পেছন থেকে কেউ মদত জোগাচ্ছেন কি না, সেটাও স্পষ্ট হতে হবে পোশাক শিল্পের স্বার্থে। মনে রাখা ভালো, পোশাক শিল্পে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতার সুফল পাবে এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা কারণে কিছু বিদেশি ক্রেতার এখান থেকে ফিরে যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে নিকট অতীতে। এ অবস্থায় এমন ‘পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা’ সৃষ্টির সুযোগ রাখা কি উচিত হবে?
আমরা মনে করি, এমন কর্মবিরতি বেশি সময় চলতে দেওয়া উচিত নয়। শ্রমিকদের দাবি আদায়ে যে বিধিবদ্ধ উপায় রয়েছে, সে ধারায়ই তারা অগ্রসর হোক। সরকার ও মালিকপক্ষকেও আমরা বলবো শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলো মেনে নিতে। এটা ঠিক, সাম্প্রতিককালে নানা বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে পোশাক শিল্প উদ্যোক্তাদের। দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও তাদের রাখতে হবে বিবেচনায়। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন খাতের কর্মীদের বেতন নিকট অতীতে যে হারে বাড়ানো হয়েছে এবং তার নেতিবাচক প্রভাব যেভাবে বাজারে পড়েছেÑপোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকরা তো এর আওতামুক্ত নন। ভোক্তা হিসেবে বাজারে তারা পরস্পরের প্রতিযোগী। একই বাজারে ক্রয় সক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে তাদেরও প্রয়োজন বাড়তি আয়। এ অবস্থায় আইন দেখিয়ে নতুন মজুরি কমিশন গঠনের জন্য শ্রমিকদের আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে বলা হলে সেটা মেনে নেওয়া তাদের জন্য কষ্টকর বৈকি। মালিকপক্ষের সামনে থাকা সংকটগুলোও বুঝতে হবে শ্রমিকদের। মনে রাখতে হবে, মানুষের জন্য আইন; আইনের জন্য মানুষ নয়। উদ্ভূত এ সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধানে আইনি কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংশোধনীও আমরা আনতে বলবো সরকারকে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমেই কেবল উভয়পক্ষের সংকট অনুধাবন ও একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। এ প্রক্রিয়া যাতে খুব দ্রুত শুরু ও বন্ধ পোশাক কারখানাগুলো শিগগির চালু হয়, সে ব্যাপারে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ আমরা প্রত্যাশা করি। বলা বাহুল্য, পোশাক শিল্পের ওপর ভর করে যেহেতু দেশের অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে এবং রফতানি খাত এখনও প্রধানত এর ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু এক্ষেত্রে অদূরদর্শিতা কাম্য নয়। আমরা চাই, যাদের অক্লান্ত শ্রমে পোশাক শিল্প তিলে তিলে গড়ে উঠেছে, তাদের দেওয়া হোক উপযুক্ত সম্মান। মানসম্পন্ন জীবনযাপনের জন্য বাজার বাস্তবতা অনুযায়ী যে মজুরি প্রয়োজন, সেটা প্রদানও এরই অংশ।