নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ এবং চার বছর ধরে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে না রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। অথচ এই কোম্পানির শেয়ারদরে অস্বাভাবিক উত্থান দেখা গেছে। অনিশ্চয়তা ও মৌলভিত্তির ঘাটতির মধ্যেই গত এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করছে।
টানা দরপতনের সঙ্গে লেনদেনে খরা দেখা দিয়েছে দেশের পুঁজিবাজারে। লেনদেন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও টাকার পরিমাণ কমছে। সপ্তাহে এক দিন কিছুটা উন্নতি হলে পরের চার দিন টানা দরপতন হচ্ছে। এমন অবস্থা গত নভেম্বর মাসজুড়েই ছিল পুঁজিবাজারে। বছরের বেশিরভাগ মন্দা থাকায় অবমূল্যায়িত অবস্থায় রয়েছে অনেক কোম্পানির শেয়ারদর। এমনকি সার্বিক বাজারও একপ্রকার অবমূল্যায়িত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এরই মধ্যে মাঝে মাঝেই কোনো কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক দর বাড়ে কিছু কোম্পানির। এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
জানা গেছে, গত ১৬ নভেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ারদর ছিল ১ টাকা ৪০ পয়সা। এর পর থেকেই কোম্পানিটির শেয়ারদর ঊর্ধ্বমুখী। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) কোম্পানিটির শেয়ারদর দাঁড়ায় ৩ টাকা ১০ পয়সায়। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ২ দশমিক ২১ গুণ।
ডিএসইর কর্মকর্তারা ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রিজেন্ট টেক্সটাইলের কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে কার্যক্রম বন্ধ দেখতে পান। সে তথ্য স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ডিএসইর তথ্যানুসারে, কোম্পানিটির কারখানা ২০২২ সালের জুলাই থেকে বন্ধ রয়েছে। সিকিউরিটিজ আইনানুসারে কারখানার কার্যক্রম বন্ধ থাকলে সে তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও স্টক এক্সচেঞ্জকে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানায়নি রিজেন্ট টেক্সটাইল।
সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে নিরীক্ষিত আর্থিক তথ্য প্রকাশ করেছে রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস। এর পর থেকে কোম্পানিটি কোনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না। ফলে কোম্পানিটির প্রকৃত আর্থিক ও ব্যবসায়িক তথ্য জানতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। আলোচ্য অর্থবছরে রিজেন্ট টেক্সটাইলের আয় হয়েছিল ১১০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৮৬ কোটি টাকা। আলোচ্য বছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ২০ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি, আগের হিসাববছরের লোকসান ছিল প্রায় ৪ কোটি টাকা।
২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১ টাকা ৬২ পয়সা, আগের হিসাববছরে যা ছিল ৩১ পয়সা। ৩০ জুন ২০২১ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ২৬ টাকা ৫২ পয়সায়। আলোচ্য অর্থবছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি রিজেন্ট টেক্সটাইল কর্তৃপক্ষ। আগের অর্থবছরে ১ শতাংশ নগদ ও ১ শতাংশ স্টক লভ্যংশ দিয়েছিল।
এর আগে চলতি বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডকে ৯০ কোটি টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। কোম্পানিটি আইপিও সম্মতিপত্রের শর্ত ভঙ্গ করে বিধিবহির্ভূত বিনিয়োগ করেছে বলে অভিযোগ ওঠায় এ ব্যবস্থা নিয়েছিল বিএসইসি।
বিএসইসির ৯৬৪তম কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। তখন বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালামের স্বাক্ষরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল।
তখন বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রিজেন্ট টেক্সটাইল আইপিও অনুমোদনের শর্ত লঙ্ঘন করে ৮০ কোটি ১১ লাখ টাকা সুদসহ ব্যবহার করেছে। এই অর্থ কোম্পানিটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান লেগ্যাসি ফ্যাশন লিমিটেডের ৯৯ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণে কাজে লাগানো হয়েছে। যেহেতু এই বিনিয়োগ আইপিও প্রস্তাবে উল্লেখ ছিল না, তাই এটি সরাসরি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের পরিপন্থি বলে বিবেচিত হয়েছে।
এই অনিয়মের কারণে রিজেন্ট টেক্সটাইলকে ৩০ দিনের মধ্যে ৯০ কোটি টাকা কোম্পানিতে ফেরত দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে অর্থ ফেরত না দিলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ পাঁচ পরিচালকের বিরুদ্ধে অর্থ জরিমানা আরোপ করা হবে।
এ বিষয়ে রিজেন্ট টেক্সটাইলের কোম্পানি লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. রাইজুল হক সিকদার এফসিএসকে ফোন করলে তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা কিছু অসাধু বিনিয়োগকারী যারা নৈতিকতার ধার ধারেন না। শুধু মুনাফা লুটে নেওয়াই তাদের লক্ষ থাকে। তবে তারা মনে করেন, সব পুঁজিবাজারেই এ ধরনের কিছু মানুষ যুক্ত থাকে। কিন্তু আমাদের বাজারে এরাই আধিপত্য বিস্তার করে আছে। তাই সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারের লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে এগিয়ে থাকা কোম্পানিগুলোর দিকে তাকালে এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাজারের ওপর এদের দৌরাত্ম্য কতটা। যেখানে টানা দরপতনের শিকার হচ্ছে তালিকাভুক্ত ভালো কোম্পানিগুলো, সেখানে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দর বাড়ছে এসব দুর্বল কোম্পানির। যত দিন এদের থামানো যাবে না, তত দিন যত চেষ্টাই করা হোক পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক আচরণ আশা করা যাবে না।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। ‘জেড’ ক্যাটেগরির এই কোম্পানিটি আলোচ্য অর্থবছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। আগের অর্থবছরে ১ শতাংশ নগদ এবং ১ শতাংশ স্টক লভ্যংশ দিয়েছিল।
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post