নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের পুঁজিবাজারে গত সপ্তাহজুড়ে যেখানে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে, সেখানে ব্যতিক্রম হিসেবে বড় দরপতনের শীর্ষে উঠে এসেছে রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় কোম্পানিটির শেয়ারে টানা দরপতন দেখা যাচ্ছে।
গত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে রিজেন্ট টেক্সটাইলের প্রতিটি শেয়ারের দর কমেছে ৩০ পয়সা বা ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এতে এক সপ্তাহেই বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। সপ্তাহ শেষে ডিএসইতে শেয়ারটির দর দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৫০ পয়সা, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৩ টাকা ৮০ পয়সা।
এই দরপতনের প্রবণতা শুরু হয় চলতি বছরের ৪ জানুয়ারির পর থেকে। ওই দিন কোম্পানিটির শেয়ারের দর ছিল ৪ টাকা ৪০ পয়সা। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে বর্তমানে ৩ টাকা ৫০ পয়সায় নেমে এসেছে।
তবে এর আগে রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ারে ছিল অস্বাভাবিক উত্থান। গত বছরের ১৬ নভেম্বর শেয়ারটির দর ছিল মাত্র ১ টাকা ৪০ পয়সা। সেখান থেকে দফায় দফায় বেড়ে ৪ টাকা ৪০ পয়সায় ওঠে, অর্থাৎ এক মাসের কিছু বেশি সময়ে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। সর্বশেষ গত ১১ ডিসেম্বর শেয়ারটির দাম ছিল ৩ টাকা ১০ পয়সা। সব মিলিয়ে এক পর্যায়ে শেয়ারটির দাম ২ দশমিক ২১ গুণ বেড়ে যায়।
অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। একই সঙ্গে প্রায় চার বছর ধরে কোম্পানিটি কোনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। ২০২০ সালের পর থেকে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশও দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ ২০২০ সালে ১ শতাংশ নগদ ও ১ শতাংশ বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছিল।
কোম্পানিটির মোট শেয়ারসংখ্যা ১২ কোটি ৮৬ লাখ ১২ হাজার ১৩৭টি। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে রয়েছে ৫৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে আছে ৪০ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ শেয়ার।
২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। ‘জেড’ ক্যাটেগরির এই কোম্পানিটি আলোচ্য হিসাববছরের বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। আগের হিসাববছরে ১ শতাংশ নগদ এবং ১ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছিল।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কর্মকর্তারা ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রিজেন্ট টেক্সটাইলের কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে কার্যক্রম বন্ধ দেখতে পান। সে তথ্য স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ডিএসইর তথ্যানুসারে, কোম্পানিটির কারখানা ২০২২ সালের জুলাই থেকে বন্ধ রয়েছে। সিকিউরিটিজ আইনানুসারে কারখানার কার্যক্রম বন্ধ থাকলে সে তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও স্টক এক্সচেঞ্জকে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানায়নি রিজেন্ট টেক্সটাইল।
শেয়ার কারসাজির বিষয়ে রিজেন্ট টেক্সটাইল লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. রাইজুল হক সিকদারকে ফোন করলে তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।
এদিকে দেশের পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের সঙ্গে লেনদেনেও খরা দেখা যাচ্ছে। সপ্তাহে একদিন কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও বাকি দিনগুলোতে সূচক ও লেনদেন কমছে। দীর্ঘদিনের মন্দায় অনেক কোম্পানির শেয়ারদর এখন অবমূল্যায়িত অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যেই কোনো মৌলভিত্তি ছাড়াই কিছু কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন বন্ধ, আর্থিক তথ্য অনুপস্থিত এবং লভ্যাংশ না থাকা সত্ত্বেও রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ারে এমন অস্বাভাবিক ওঠানামা স্পষ্টভাবে কারসাজির ইঙ্গিত দেয়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। বাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালামকে ফোন করলে তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। মেসেজ পাঠালেও কোনো উত্তর মেলেনি।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post