দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বন্ধ হয়ে গেছে সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ কার্যক্রম

সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৫২ সালে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। একসময় দপ্তরটি শিল্প বিভাগের অধীন ছিল। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমান অবস্থায় এলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও নৌযানের অভাবে ধুঁকছে সরকারি এ সংস্থাটি। দপ্তরটির নানা সমস্যা নিয়ে শেয়ার বিজের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ ছাপা হচ্ছে তৃতীয় পর্ব

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: দেড় দশক পর সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা ও জরিপ ২০১৬ সালে চালু হলেও বর্তমানে তা বন্ধ আছে। মৎস্য দপ্তর বলছে, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ। তাই সাময়িকভাবে বন্ধ আছে কার্যক্রম। নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হলে জরিপ কার্যক্রম চালু হবে। অপরদিকে সমাপ্ত জরিপে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগরে মাছের পরিমাণ আশঙ্কজনক হারে কমছে। নির্বিচারে সামুদ্রিক মাছ শিকার এবং অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে কিছু প্রজাতির মাছ নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করছেন গবেষকরা।

সূত্রমতে, বাংলাদেশের সাগরের সন্নিহিত এলাকায় মাছের মজুতের কোনো সঠিক হিসাব নেই। কী পরিমাণ মাছ ধরা যাবে, তারও সীমা নির্ধারিত নেই। কারণ সাগরে মৎস্যসম্পদের জরিপ-গবেষণা বন্ধ ছিল দেড় দশকের বেশি। ব্লু-ইকোনমি ও বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ জরিপকে গতিশীল করতে ২০১৬ সালে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি), মালয়েশিয়া সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে মালয়েশিয়া থেকে নতুন জাহাজ ‘আরভি মীন সন্ধানী’ কেনার পর জরিপ আবার শুরু হয়। তারপর ওই জাহাজ দিয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৪টি ক্রুজ পরিচালনা করা হয়। সাগরে ১০ থেকে ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মহীসোপান এলাকায় এই জরিপ কার্যক্রম চালানো হয়।

তিন বছরে আরভি মীন সন্ধানী ৪৫৭টি প্রজাতির সামুদ্রিক জীবের জৈবতাত্ত্বিক তত্ত্ব ও তথ্য সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ৩৯৪ মাছের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২১ প্রজাতির হাঙ্গর রয়েছে। এছাড়া ৪৯ প্রজাতির কঠিন আবরণযুক্ত জলজ প্রাণী পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ২১ প্রজাতির কাঁকড়া, তিন প্রজাতির গলদাচিংড়ি, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি ও এক প্রজাতির দীর্ঘপদ পতঙ্গ। পাশাপাশি ১৪ প্রজাতির শুঁড়ওয়ালা শামুক বা অক্টোপাস রয়েছে।

গত তিন বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সামুদ্রিক মাছ নিয়ে একটি প্রতিবেদন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের মেরিন ফিশারিজ সার্ভে ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরিফ উদ্দীন শেয়ার বিজকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘২০০০ সালের পর থেকে আমাদের ভেসেল-বেইসড যে গবেষণা, সেটা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্পের মাধ্যমে এটা আবার শুরু করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মূলত ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে এটা আমরা শুরু করেছি। তিন বছরের প্রাথমিক তথ্যে আমরা দেখছি, আমাদের সমুদ্রের সার্বিক মজুত ঠিক থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু মাছের মনে হচ্ছে অতিরিক্ত আহরণ হয়েছে।’

এদিকে একই দপ্তরের অন্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, বংশবিস্তারের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে যদি মাছ না রাখা হয়, তাহলে পরবর্তী সিজনে বংশবৃদ্ধি হবে না। পৃথিবীর অন্যান্য সমুদ্রের মধ্যে গালফ অব থাইল্যান্ড যেমন অনেকটা মৎস্যশূন্য হয়ে গেছে, সঠিক পদক্ষেপ না নিলে বে অব বেঙ্গল সেরকম মৎস্যশূন্য হয়ে যাবে।

সূত্রমতে, সামুদ্রিক মাছের মধ্যে লাক্ষা, সার্ডিন, পোয়া, লটিয়া, ফলি চান্দা, হরিণা চিংড়ি ও কাটা প্রজাতির মাছের মজুত এবং পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। গবেষকরা বলছেন, ‘অতিরিক্ত আহরণের কারণে যেকোনো মাছ বাণিজ্যিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা করা না হলে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। বিশেষ করে, লাক্ষা, তাইল্যা ও রূপচান্দা টাইপের বেশ কিছু মাছ এখন খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে।’

এদিকে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯৮০ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ‘আরভি অনুসন্ধানী’র মাধ্যমে ৮৪টি ক্রুজ পরিচালনা করা হয়। এই প্রকল্পে ১৯৮০-৮৩ সাল পর্যন্ত স্থানীয় গবেষকরা এবং ১৯৮৪-৮৭ মেয়াদে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যৌথভাবে জরিপ ও গবেষণা করা হয়। তারপর ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটি ‘সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ নামে স্থায়ীভাবে সরকারের রাজস্ব খাতভুক্ত হয়। তবে ওই সময়ের মধ্যে আরভি মাছরাঙ্গা নামের আরও একটি প্রকল্প চালু হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ২১টি ক্রুজ পরিচালনা করে ‘আরভি মাছরাঙ্গা’ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ গবেষণা জাহাজ দুটি মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়ায় জরিপ কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।

মূলত তার পর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জরিপ কার্যক্রম বন্ধ থাকে। এরপর আরভি মীন সন্ধানী ক্রয়ের পর ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে আবার জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর জরিপকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং নরওয়ে সরকারের সহায়তায় ২০১৭ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত ‘আরভি ড. ফ্রিজ্জফ নানসেন’ নামে আরেকটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। ওই জরিপে স্মল পেলাজিকস্ (সার্ডিন, মেকারেল) এবং মেসোপেলাজিকস্ (৩০০ মিটার গভীরতায় বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ) মাছের মজুত নির্ণয়ের লক্ষ্যে অ্যাকুস্টিক সার্ভে পরিচালনা করা হয়। ওই জরিপে প্রাথমিক ফলাফলে ১৬৯ প্রজাতির সামুদ্রিক জীবের জৈবতাত্ত্বিক তত্ত্ব ও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তবে এসব প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে কোনো ধরনের জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে যারা লংলাইনার ও পার্সেইনার লাইসেন্স পেয়েছে, তারাও বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে।

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মেরিন ফিশারিজ সার্ভে ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জরিপ ব্যবস্থাপনার প্রধান মো. শরিফ উদ্দীন বলেন, ‘জরিপ কার্যক্রম বন্ধ আছে, সেটা পুরোপুরি বলা যাবে না। কারণ সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্টের মধ্যে জরিপ ব্যবস্থাপনাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটির কাজ শুরু হলে জরিপ কার্যক্রম চালু হবে।’ 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..