মত-বিশ্লেষণ

বন-প্রকৃতি-পরিবেশ ধ্বংস পৃথিবীর জন্য অশনিসংকেত

সাধন সরকার: পৃথিবীর ‘ফুসফুস’-খ্যাত আমাজন বনের গুরুত্ব পৃথিবীব্যাপী। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আমাজন বনের আগুন লাগা নিয়ে শুধু ব্রাজিল নয়, সমগ্র পৃথিবী সরব হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর ‘ফুসফুস’ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে পৃথিবীতেও যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে না, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বড় বড় বনে আগুন লাগলে পৃথিবী নামক এই ছোট্ট গ্রহটির ঠিকই কান্না পায়। ‘আমাজন বন’ এ মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে! আর বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ‘বিষয়’ হলো জলবায়ু পরিবর্তন।
আমাজন বনের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কেননা বন-প্রকৃতি-পরিবেশ মিলেই সমগ্র জলবায়ু। প্রায় ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটারের এই বন থেকে পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেন আসে। এই বন প্রতিবছর ২০০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। এই বনের বুক চিরে বয়ে গেছে আমাজন নদী। আমাজন বনে প্রায় ৪০০-র অধিক গোত্রের আদিবাসীর বাস। সব মিলিয়ে এসব গোত্রের জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখেরও মতো। আমাজনে এমন বহু গহিন স্থান আছে যেখানে মানুষের পা এখনও পড়েনি। রহস্যময়তা ও রোমাঞ্চ আমাজনের অন্যতম রহস্য। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখা ক্রমেই এই চিরহরিৎ বনকে গ্রাস করেছে। তথ্যমতে, শুধু চলতি বছরই আমাজনে প্রায় ৭৩ হাজার বারের মতো দাবানলের ঘটনা ঘটেছে! তবে প্রায় এক মাস ধরে ঘটে যাওয়া দাবানল ছিল সবচেয়ে মারাত্মক। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই চিরহরিৎ বনাঞ্চল ব্রাজিলের ৯টি অঙ্গরাজ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার আরও আটটি দেশে বিস্তৃত। এখানে প্রায় ৩০ লাখ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে। এক পৃথিবী বিস্ময় নিয়ে এ বন দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, গরম আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার কারণে এ বনে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের বৈচিত্র্যময় সমাহার ঘটেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইকোসিস্টেম-সমৃদ্ধ আমাজনের বয়স কম করে হলেও প্রায় তিন হাজার বছর। আমাজনের বৃক্ষরাজি থেকে পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চিকিৎসা পথ্য আসে। এখানকার প্রাণিবৈচিত্র্য অসাধারণ। পৃথিবীর ‘ফুসফুস’-খ্যাত এ বন কোনো দেশের বা কারও একার সম্পদ নয়। এই বন সমগ্র পৃথিবীর সম্পদ! মূলত আগুন লাগার ফলে সৃষ্ট কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছাড়াও কার্বন-মনোক্সাইড নামক বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হওয়ার ফলে প্রাণী-উদ্ভিদের ক্ষতিটা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
জানা যায়, আমাজন মূলত বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে এখানকার আবাহাওয়া কিছুটা শুষ্ক হয়ে ওঠে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় গ্রামবাসী চাষের জন্য জমি বা খামার তৈরি করার অভিপ্রায়ে ইচ্ছাকৃতভাবে জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে দেয়! তবে মাঝে মাঝে উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার ফলেও আগুনের সূত্রপাত ঘটে। আবার গবাদি পশুর চারণভূমির জন্য বনের জায়গা পরিষ্কার করতে বনে আগুন লাগানো হয়। এ ছাড়া এই আমাজন অরণ্য খনিজ পদার্থের ভাণ্ডার হওয়ায় খনিজ পদার্থ আহরণে জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়! বনের ওপর এতসব অত্যাচার সত্ত্বেও যদি আবার দেশের কর্তৃপক্ষের মদত থাকে তাহলে তো কথাই নেই! তবে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিরহরিৎ এ বনাঞ্চল কার্বন জমা রেখে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করছে। শুধু আমাজন নয়, পুড়ছে ইন্দোনেশিয়ার চিরহরিৎ বনও। ইন্দোনেশিয়ার রিয়াও প্রদেশের বন এখন আমাজনের মতো পুড়ছে। আবার অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশের সৃষ্ট দাবানল ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে। অস্ট্রেলিয়াজুড়ে এখন দাবদাহ চলছে। অস্ট্রেলিয়াতে শুধু এ সময়ে নয়, মাঝে মাঝে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনার কথা শোনা যায়।
আমাজন বন কারও একার নয়, এটি বিশ্ববাসীর সম্পদ। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ বিভিন্ন কারণে সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকা তো বটেই, পৃথিবীর মানুষের বাসযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ প্রজšে§র জন্য সুন্দর পৃথিবীর নিশ্চয়তার জন্য আমাজন বনের গুরুত্ব অনেক। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, দেশে দেশে গাছ লাগানো হচ্ছে। অপরদিকে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ বনগুলোতে একের পর এক আগুন লাগছে বা লাগানো হচ্ছে! যে বন মানুষ তৈরি করতে পারে না, সে বন ধ্বংস করার অধিকার কি আমাদের আছে? বাড়ছে পৃথিবীর জনসংখ্যা, কমছে প্রকৃতি ও পরিবেশের আচ্ছাদন! ফলে যে বনজ সম্পদ আছে সেটুকুও যদি রক্ষা করা না যায়, তাহলে সমগ্র প্রাণিকুলের জন্য অশনিসংকেত অপেক্ষা করছে! প্রত্যেকটি দেশকে প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন অবশ্যই দরকার আছে, কিন্তু সেটা বন-প্রকৃতি-পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করে নয়। উন্নয়ন টেকসই করতে হলে প্রকৃতি-পরিবেশের গুরুত্ব দিতে হবে সবার আগে। উন্নয়নের ভেলায় ভাসতে ভাসতে আমরা যেন আবার প্রকৃতি-পরিবেশের ধ্বংসলীলা বয়ে না আনি, সেদিকে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশেও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা বসতির কারণে বন-প্রকৃতি-পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে এবং হচ্ছে। আবার বিভিন্ন সময় উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষাকে (ইআইএ) গুরুত্ব না দিয়ে শুধু উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়া হয়! কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ভুগতে থাকা দেশগুলোয় প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা করার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। উষ্ণায়ন মোকাবিলায় সব দেশকে প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা করার পাশাপাশি বনজ সম্পদ বৃদ্ধিতে আরও নজর দিতে হবে।

কলাম লেখক ও পরিবেশকর্মী
সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

[email protected]

সর্বশেষ..