বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রযুক্তি

অনিক চক্রবর্তী : বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াকরণ, পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) ও নিষ্কাশনের (ডিসপোজাল) সমন্বিত প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯১ লাখ ১ হাজার। এই বর্ধিত জনসংখ্যার ফল হিসেবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয় এবং প্রতিনিয়ত সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাও বেড়েছে। দেশে বর্জ্য উৎপাদন ক্রমেই বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৫ সালে দৈনিক ৪৭ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হবে। তখন বর্জ্য উৎপাদনের হার বেড়ে বছরে মাথাপিছু ২২০ কিলোগ্রাম হবে।

পরিবেশ দূষণ হ্রাস, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, মানুষকে বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা প্রভৃতির উদ্দেশ্য সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অতীব জরুরি। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। বর্জ্যরে পরিমাণ হ্রাস, বর্জ্য পদার্থ সংগ্রহ, উপযুক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্জ্য পদার্থের পুনর্ব্যবহার ও নতুন সম্পদ সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারই পারে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে। সমন্বিত এবং সম্পূর্ণ বর্জ্যব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনটি ‘আর’ নীতি প্রয়োগ করা হয়। এগুলো হলো জবফঁপব (কমানো), জব-ঁংব (পুনর্ব্যবহার) এবং জবপুপষব (পুনশ্চক্রীকরণ)। এই নীতিগুলোর বাস্তবায়নে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার পুরো প্রক্রিয়াটিকেই সহজ ও সাবলীল করে তোলে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর জাতিসংঘ ঘোষিত ‘বিশ্ব বসতি দিবস’ পালিত হয়। ২০১৯ সালে বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজিস অ্যাজ অ্যান ইনোভেটিভ টুল টু ট্রান্সফর্ম ওয়াস্ট টু ওয়েলথ। অর্থাৎ ‘বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার’। ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজিস বলতে বোঝানো হচ্ছে যথাক্রমে: ১. স্বয়ংক্রিয়তা (Automation); ২. রোবটিকস (Robotics); ৩. বিদ্যুচ্চালিত যান  (ElectricVehicles);; ৪. পুনঃনবায়নযোগ্য শক্তি প্রযুক্তি; ৫. জৈবপ্রযুক্তি; ৬. Artificial (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)।

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারই পারে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে এই প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আলোচ্য প্রতিপাদ্যের বিষয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় হতে সকল নির্মিতব্য ভবনে সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনার সংস্থান রেখে ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮ সালকে হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি আবাসন প্রকল্পসমূহে ‘সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট’ এবং ‘সলিড ওয়াস্ট ডাম্পিং প্লান্ট’ নির্মাণের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্মিত ভবনগুলোতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের সংস্থান করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সকল সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, এনজিও’র সঙ্গে সমন্বয় করে নগরের সৃষ্ট বর্জ্য রিসাইক্লিং করতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

বর্জ্য আমাদের জন্য বোঝা নয়, বর্জ্য আমাদের সম্পদ। এক্ষেত্রে দেশের জন্য রোলমডেল যশোরের ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। ২০১৮ সালে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্লান্টটি নির্মিত হয়। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৩৯ একর জমির ওপর এই প্লান্টটি নির্মিত হয়। প্লান্টটিতে প্রতিদিন ৪২ জন শ্রমিক কাজ করেন। যশোর শহর, উপশহর, ইউনিয়ন ও ক্যান্টনমেন্টের কিছু এলাকা থেকে ময়লা-আবর্জনা কম্পোস্ট প্লান্টে জমা হয়। প্লান্টের প্রবেশমুখে স্থাপিত ওয়েটিং ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রাক নেয়া হয়। এ ব্রিজ ময়লার পরিমাপ করে। ময়লা রাখা হয় সটিং প্ল্যাটফর্মে। এ প্ল্যাটফর্ম ট্রমেলের মাধ্যমে ময়লা বাছাই করে কম্পোস্ট বক্সে দেয়া হয়। বাছাইকৃত ময়লা-আবর্জনা ডিসাইক্লিন করে শুকানোর পর নেটিং করে একটি অংশ দিয়ে সার ও আরেকটি অংশ দিয়ে বায়োগ্যাস তৈরি করা হয়। এই ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড কম্পোজ প্লান্ট থেকে প্রতিদিন ৫ টন সার উৎপাদন হচ্ছে। অন্যদিকে এখানে উৎপাদিত বায়োগ্যাস দুটি জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হচ্ছে। রূপান্তরিত বিদ্যুৎ দিয়েই চলছে এ প্লান্ট। ফলে এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে অতিরিক্ত কোনো বিদ্যুৎ লাগছে না। উপরন্তু ময়লা থেকে উৎপাদিত সার কৃষিকাজে ব্যবহারের উপযোগী।

এছাড়া বিভিন্ন দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইনসিনারেশন প্লান্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইনসিনারেশন প্লান্ট ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত বর্জ্যরে পরিমাণ হ্রাস করতে পারে। এই প্লান্ট বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন করে, যা বিদ্যুৎ বা তাপ উৎপাদন করতে ব্যবহƒত হয়। তাই অনেক দেশই এখন বাষ্প টারবাইন ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বর্জ্য পদার্থগুলো থেকে উৎপাদিত তাপ এবং শক্তিকে একত্র করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেন ভাগাড়ে জ্বলন প্লান্ট পরিবেশকে দূষিত করার আশঙ্কা কম। উন্নত দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলো এবং পৌরসভাগুলো সক্রিয়ভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতির জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলোর ব্যবহার শুরু করেছে। সেখানে রুট অপ্টিমাইজেশনের সাহায্যে বর্জ্য সংগ্রহকারী ট্রাকগুলো প্রতিটি ডাম্পারের ট্র্যাশ স্তরটি পরীক্ষা করে। কারণ ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার ফলে সময় এবং অর্থ উভয়ের অপচয় হয় যেহেতু ট্রাকগুলো প্রায়ই এমন সব ডাম্পস্টারগুলোতে যান, যা খালি করার প্রয়োজন হয় না। এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে সেইসব দেশ সময় ও অর্থ উভয়ের অপচয় অনেকাংশেই রোধ করতে পারে।

এছাড়া আইওটি চালিত স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত দেশগুলোতে চোখে পড়ার মতো। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে সাধারণ আইওটি ব্যবহারের বিষযটি হলো রুট অপ্টিমাইজেশন, যা পুরো শহর জুড়ে ডাম্পস্টারগুলো খালি করার সময় জ্বালানি খরচ হ্রাস করে। সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং সম্ভাব্য স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এন্ডপয়েন্টস (সেন্সর), গেটওয়েস, আইওটি প্ল্যাটফর্ম এবং ওয়েব এবং মোবাইল অ্যাপগুলোর ব্যবহার হয় সবচেয়ে বেশি। একটি সেন্সর বর্জ্যরে ফিল লেভেল পরিমাপ করার জন্য একটি ডাম্পসটারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। সেন্সর থেকে ক্লাউডে ডেটা প্রেরণ, আইওটি প্ল্যাটফর্ম এবং সেন্সরের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতে গেটওয়ে সে ভূমিকা পালন করে। কিছু এজ-প্রসেসিং সক্ষম গেটওয়েগুলোরও প্রয়োজন। এই ডিভাইসগুলো মূল ডেটা প্রক্রিয়া করে। আইওটি প্ল্যাটফর্মটি মূল ডেটাগুলোকে তথ্যে রূপান্তরিত করার কাজ করে। বেশিরভাগ সময়, আইওটি প্ল্যাটফর্মগুলো ক্লাউডে হোস্ট করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করতে বিভিন্ন সেন্সর ব্যবহার করা যেতে পারে। স্মার্ট বর্জ্য পরিচালনার আইওটি সমাধানগুলোতে সর্বাধিক ব্যবহƒত সেন্সরগুলো হলো আল্ট্রাসোনিক লেভেল সেন্সর। অন্যান্য সেন্সরগুলোর মধ্যে অবস্থান, তাপমাত্রাসহ বিভিন্ন প্যারামিটার পর্যবেক্ষণ করতে মোশন সেন্সর, জিপিএস সেন্সর এবং ভাইব্রেশন সেন্সর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এই জাতীয সেন্সর এবং আইওটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহাররের বিভিন্ন সুবিধা রয়েছেÑযেমন:

সংগ্রহে খরচ কম: স্মার্ট ডাম্পস্টারগুলো তাদের রিয়েল-টাইম পূরণের স্তরের তথ্যগুলো বর্জ্য সংগ্রহকারীদের নিকট পাঠায়। আইওটি সমাধানটি ডেটা ব্যবহার করে এবং বর্জ্য সংগ্রহের ট্রাকগুলোর জন্য সর্বোত্তম রুটগুলো নির্বাচন করে। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যা জ্বালানি সাশ্রয় করার পাশাপাশি সময়ের অপচয় রোধ করে।

২. কোনো মিস পিকআপ নেই: গতানুগতিক বর্জ্য সংগ্রহের পদ্ধতির বিপরীতে, স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াটি আবর্জনার ডাম্পস্টারগুলো থেকে উপচে পড়া রোধ করে। যখন কোনো ট্র্যাশ বিন পূর্ণ হতে থাকে, তৎক্ষণাৎ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয় এবং বর্জ্য সংগ্রহের ট্রাকগুলো পূর্ব নির্ধারিত সময়ের আগেই পিকআপের জন্য নির্ধারিত জায়গায় যেতে পারে।

৩. বর্জ্য উৎপাদনের বিশ্লেষণ: স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেবল রুট অপ্টিমাইজেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বলা হয়, যে আইওটির আসল উপকারিতা ডেটা বিশ্লেষণের মধ্যে রয়েছে। বাজারে যেসব আইওটি সমাধান পাওয়া যায় অধিকাংশই ডেটা অ্যানালিটিক্স ফিচারের সঙ্গে সংযোজিত। ৪. কার্বন-ডাই অক্সাইড নির্গমন হ্রাস: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্ব্যবহারের সময় কার্বনের উপস্থিতি সম্পর্কে অনেক আলোচনা এবং বিতর্ক হয়েছে। রুট অপ্টিমাইজেশনের ফলে বর্জ্য সংগ্রহকারী যানবাহনগুলো শুধু নির্দিষ্ট ডাস্টবিন থেকেই বর্জ্য সংগ্রহ করে। ফলে যানবাহনগুলোর জ্বালানি গ্রহণের পরিমাণ অনেকাংশেই কমে যায়, যা কার্বন নিঃসরণ কমায় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াটিকে পরিবেশবান্ধব করে তোলে।

শিক্ষার্থী

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ..